ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার প্রভাব এখন সরাসরি অনুভূত হতে শুরু করেছে, তা আপনি পৃথিবীর যেখানেই বাস করুন না কেন। যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রফতানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এবং তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো উৎপাদন কমিয়ে দেয়ায়, সরবরাহের যে ঘাটতি তা তেলের দামকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে।
তেলের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১২০ ডলারে গিয়ে উঠেছিল। যদিও পরে দাম কিছুটা কমেছে, তবুও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখনো অনেক বেশি দামে তেল কেনাবেচা হচ্ছে।
এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, দেশে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি তেলের সরবরাহে সঙ্কট
এ যুদ্ধ যেন বিশ্বকে আবারো মনে করিয়ে দিয়েছে যে শক্তির উৎসের জন্য পৃথিবী এখনো মধ্যপ্রাচ্যের ওপর কতটা নির্ভরশীল। এ যেন ১৯৫০ এবং ১৯৭০-এর দশকের তেল সরবরাহ সঙ্কটের স্মৃতিকে ফিরিয়ে এনেছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের প্রভাব আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক হবে।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়, যেখানে যুদ্ধের কারণে বর্তমানে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ অঞ্চলের বাইরের তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলো, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও নরওয়ে- তাদের উৎপাদন দ্রুত বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার যথেষ্ঠ ক্ষমতা নেই।
যদিও স্থানীয় তেল পাইপলাইনগুলোর বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করার কিছু সক্ষমতা রয়েছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
ফলে এ অঞ্চলের উৎপাদনকারী দেশসমূহ উৎপাদন কমিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের তথ্য বলছে, ইরাকে উৎপাদন ৬০ শতাংশের বেশি কমেছে, পাশাপাশি কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।
জ্বালানির এই টানাপোড়েন শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ নয়।
কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সামরিক হামলার কারণ দেখিয়ে উৎপাদন স্থগিত করার পর বিশ্বের প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
এই ঘাটতি পূরণের কোনো সহজ উপায় না থাকায় জেপি মরগানের বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এশিয়া ও ইউরোপে ‘দৃশ্যমান ঘাটতি’ দেখা দিতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
এশিয়ায় যারা বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, সেসব দেশের কিছু সরকার ইতোমধ্যে দামের ঊর্ধ্বসীমা এবং বিতরণে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে।
যুক্তরাজ্যে চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস একটি বড় মুল্যস্ফীতির ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
আবার কিছু দেশ এই সঙ্কট লাঘবের চেষ্টায় তাদের সংরক্ষিত তেল বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছে, তবে এ ধরনের পদক্ষেপের ফলাফল কতটাইতিবাচক হবে তা অনিশ্চিত।
র্যাপিড এনার্জি গ্রুপের সিনিয়র ম্যাক্রো এনার্জি অ্যানালিস্ট হান্টার কর্নফেইন্ড বলেন, চাহিদার তুলনায় এই তেলের পরিমাণ হবে অত্যন্ত সামান্য অর্থাৎ ‘পিনাটস’ বা বাদামের দানার মত ক্ষুদ্র।
কর্নফেইন্ড আরো বলেন, ‘এটি মূলত বর্তমান সময়ের বিশ্ব বাজারে তেলের দামের ইতিহাসে হতে পারে সবচেয়ে বড় সরবরাহ সঙ্কট। প্রয়োজনের তুলনায় এ পদক্ষেপের তুলনা করা আর আপেলের সাথে কমলার তুলনা করা একই কথা অর্থাৎ কোনোভাবেই এটি তুলনীয় নয়।’
জ্বালানির উচ্চমূল্য
আপাতত এই সঙ্কটের অর্থ হলো জ্বালানির উচ্চমূল্য। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুড এবং মার্কিন বেঞ্চমার্ক ‘ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট’- উভয়ের দামই বৃদ্ধি পেয়েছে।
সোমবার এক পর্যায়ে প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল, যদিও পরে তা কমে প্রতি ব্যারেল ৮৫ ডলারের নিচে নেমে আসে।
এর প্রভাব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ গৃহস্থালির ব্যয়ের ওপর পড়ছে।
যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপে, ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের তুলনায় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও, যারা প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী হিসেবে বিশ্ববাজারের দামের ওঠানামা থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকে, সেখানেও পাম্পে তেলের দাম প্রতি গ্যালন সাড়ে তিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এক মাস আগে যা ছিল দুই দশমিক ৯০ ডলার, যা সর্বশেষ ২০২৪ সালে দেখা গিয়েছিল।
গত সপ্তাহে গোল্ডম্যান স্যাকস প্রাক্কলন করেছে যে তেলের দাম সাময়িকভাবে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারে উঠলে তা বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক চার শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মাস শেষ হওয়ার আগে যদি এই সঙ্ঘাতের সমাধান না হয়, তবে এটি বিশ্ববাজারে তেলের দামকে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পরে যে ব্যাপক বৃদ্ধি হয়েছিল তাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কাও রয়েছে।
কর্নফেইন্ড বলেন, ওই পর্যায়ে অর্থনীতির ওপর এর বিরূপ প্রভাব হবে বেশ মারাত্মক, কারণ উচ্চ ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবার এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তখন অন্য খরচ কমাতে বাধ্য হবে এবং তার ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি ধীর হয়ে পড়বে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব: প্রযুক্তি থেকে কৃষি
জ্বালানি সঙ্কটের কারণে চিপ উৎপাদন কমে যাবে কি না, বিশ্লেষকরা এখন সতর্কতার সাথে তা পর্যবেক্ষণ করছেন।
গাড়ি থেকে শুরু করে স্মার্টফোন- সব খাতের ওপরই এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ চিপ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র তাইওয়ান জ্বালানি আমদানির ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল।
যুক্তরাষ্ট্রে অনেকে এ উদ্বেগও প্রকাশ করছেন যে, জ্বালানির উচ্চমূল্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো তৈরিতে নিয়োজিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম মূল চালিকাশক্তিকে বাধাগ্রস্ত করবে।
তবে প্রভাব শুধু জ্বালানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
মধ্যপ্রাচ্য অ্যালুমিনিয়াম এবং সালফারের, যা তামা বা কপারের মতো ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত হয়, একটি প্রধান উৎস।
পাশাপাশি সারের অন্যতম উপাদান ইউরিয়াও আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
এই পণ্যগুলোর দাম বাড়তে শুরু করলে তার প্রভাব খাদ্যদ্রব্য এবং উৎপাদিত পণ্যের মূল্যের ওপর গিয়ে পড়তে পারে।
মার্কিন প্রতিষ্ঠান ব্যুরো ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে চাষাবাদের মৌসুম শুরু হওয়ার ঠিক আগে মার্চ ও এপ্রিল মাসে প্রায় ২৫ শতাংশ সার আমদানি করা হয়।
সাউথ ক্যারোলাইনার তুলা, ভুট্টা ও সয়াবিন চাষি হ্যারি অট বলেন, ‘এই সঙ্কটের আসার জন্য এর চেয়ে খারাপ সময় আর হয় না।’
গত সপ্তাহে তিনি জমিতে সার দেয়ার জন্য তার সরবরাহকারীকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু তাকে জানানো হয় যে যুদ্ধের প্রভাব পুরোপুরি না বোঝা পর্যন্ত তারা সার বিক্রি ও সরবরাহ স্থগিত রাখছে।
পরবর্তীতে ওই প্রতিষ্ঠান সারের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়।
অট আশঙ্কা করছেন, এতে তার প্রতি একর জমিতে সারের খরচ প্রায় ১০০ ডলার বেড়ে যাবে এবং চলতি বছরের ফসল থেকে মুনাফা করার কোনো সুযোগই থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাতের প্রতিষ্ঠান ফার্ম ব্যুরো আয়োজিত সাংবাদিকদের এক ব্রিফিংয়ে অট বলেন, ‘এটা খুবই কঠিন সময় এবং সারের ব্যাপারে এখন যা ঘটছে তা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। এ বাড়তি খরচ সামাল দেয়ার মতো ক্ষমতা কারোই নেই।’
রাজনৈতিক চাপ
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অর্থনৈতিক ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এশিয়া ও ইউরোপে, কারণ তারা জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যার প্রতিফলন শেয়ারবাজারেও দেখা গেছে।
উদাহরণস্বরূপ, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারে সূচক যথাক্রমে ১০ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ পড়ে গেছে।
অন্যদিকে, জার্মানির ডিএএক্স সূচক নেমে গেছে সাত শতাংশের বেশি। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি-৫০০ সূচক মাত্র এক দশমিক দুই শতাংশ কমেছে।
তবে সামনে নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের কারণে এই পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক সঙ্কটের তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশেষ করে যদি দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়তে শুরু করে।
হোয়াইট হাউস এ অঞ্চলে তাদের পরিকল্পনা নিয়ে পরস্পরবিরোধী সংকেত দিচ্ছে, যা প্রেসিডেন্ট দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের মানসিক প্রস্তুতিতে আছেন কি-না তা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্যানকি রিসার্চের পল স্যানকি সতর্ক করে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের অভিযান শেষ বলে ঘোষণা করলেও ইরান বিষয়টিকে সেভাবে নাও দেখতে পারে। এর অর্থ হতে পারে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ সমাপ্তির ঘোষণার পরও এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে পারে।’
সূত্র : বিবিসি



