যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে বাড়ছে ক্ষুধার ব্যবহার, ক্রমবর্ধমান ‘খাদ্য-সম্পর্কিত সহিংসতা’য় উদ্বেগ

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গাজা, সুদান, লেবানন ও হাইতিসহ বিভিন্ন দেশে যেসব আগ্রাসন হয়েছে, তার সবকটিতে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করে বেসামরিক মানুষকে অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার এক পৈশাচিক খেলায় মেতে ওঠে হামলাকারী প্রতিপক্ষ। এসব ক্ষেত্রে ক্ষুধাকে যুদ্ধের অমোঘ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
একটি খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের কাছে ত্রাণবাহী ট্রাক থেকে ময়দার বস্তা সংগ্রহের জন্য হুড়োহুড়ি করছেন ফিলিস্তিনিরা
একটি খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের কাছে ত্রাণবাহী ট্রাক থেকে ময়দার বস্তা সংগ্রহের জন্য হুড়োহুড়ি করছেন ফিলিস্তিনিরা |ইন্টারনেট

যুদ্ধ ও সংঘাতে ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে বলে নতুন এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। গত আট বছরে বিশ্বজুড়ে ২০ হাজারেরও বেশি ‘খাদ্য-সম্পর্কিত সহিংসতার’ ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দৈনন্দিন খাদ্য সংগ্রহে মানুষ যেসব বাজার ব্যবহার করে, সেখানে এক হাজার ২৬১টি হামলা হয়েছে। পাশাপাশি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা ও মানবিক সহায়তা কর্মীদের লক্ষ্য করে ৮৬৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে বহু কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।

জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২০১৮ সালের ২৪১৭ নম্বর প্রস্তাবের পরবর্তী সময়কাল বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। ওই প্রস্তাবে বেসামরিক নাগরিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য থেকে বঞ্চিত করাকে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ব্যবহারের নিন্দা জানানো হয়।

প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর থেকে পরবর্তী সময়ের ওপর এ বিশ্লেষণটি চালানো হয়। এতে দেখা গেছে, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে খাদ্য সঙ্কটকে ক্রমেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে; যার অংশ হিসেবে গাজা, সুদান, লেবানন এবং হাইতিসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়মিতভাবে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গাজা, সুদান, লেবানন ও হাইতিসহ বিভিন্ন দেশে যেসব আগ্রাসন হয়েছে, তার সবকটিতে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করে বেসামরিক মানুষকে অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার এক পৈশাচিক খেলায় মেতে ওঠে হামলাকারী প্রতিপক্ষ। এসব ক্ষেত্রে ক্ষুধাকে যুদ্ধের অমোঘ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

‘ইনসিকিউরিটি ইনসাইট’ নামের একটি সংস্থার সংকলিত উপাত্তে দেখা গেছে, ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৫টি দেশে ২১ হাজার ৪০৩টি ঘটনায় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। অথচ ওই বছরই জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে মানবিক সহায়তা প্রদানে বেআইনি বাধা সৃষ্টির তীব্র নিন্দা জানিয়ে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করেছিল।

গবেষকরা আরো জানিয়েছেন, এই সময়ে কৃষিজমিতে এক হাজার ৯০৯টি এবং ফসলের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পানি অবকাঠামোতে ৫৬৩টি সামরিক হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলার কারণে বিশ্বের ৪২টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড; সেখানে নয় হাজার ১৩টি হামলা চালানো হয়েছে। এরপরই ইয়েমেনে এক হাজার ৮৬৩টি এবং সুদানে এক হাজার ৬০৫টি হামলা নথিভুক্ত হয়েছে।

সুদানে সর্বশেষ বড় হামলাগুলোর একটি ঘটে মঙ্গলবার, যেখানে একটি ব্যস্ত বাজারে ড্রোন হামলায় ২৮ জন নিহত হন বলে জানানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পশ্চিম কর্দোফানের ঘুবায়েশ শহরের প্রধান বাজারে হামলাটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছিল।

খাদ্য সরবরাহের ওপর বারবার হামলার ঘটনা ঘটেছে এমন অন্যান্য দেশের মধ্যে রয়েছে সিরিয়া (১ হাজার ৫৩৮টি ঘটনা), যার বেশিরভাগই আসাদ সরকারের পতনের আগে দেশটির সরকারি বাহিনী বা রুশ সামরিক বাহিনীর দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। এছাড়া পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে এক হাজার ৪১৫টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে ক্ষমতাসীন জান্তা সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে মরিয়া হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

জাতিসঙ্ঘের ওই প্রস্তাব পাসের বর্ষপূর্তির সাথে সঙ্গতি রেখে আজ সোমবার (২৫ মে) এই গবেষণা প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হওয়ার কথা। এতে বাজার, কৃষিজমি এবং খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার ওপর হামলার ঘটনা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি’ পাওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা অ্যাকশন অ্যাগেনস্ট হাঙ্গারের সংঘাত ও ক্ষুধা বিষয়ক অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার জুলিয়া কন্তো বলেছেন, ‘গত দুই বছরে গাজা এবং সুদানের দুর্ভিক্ষ বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। কিন্তু সংঘাতের কারণে সৃষ্ট বেশিরভাগ ক্ষুধার খবর আড়ালেই থেকে যায়।’

তিনি বলেন, ‘টিকে থাকার জন্য যেসব ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষ নির্ভরশীল, সেগুলোর ওপর প্রতিনিয়ত হামলা চালানো হচ্ছে। গবাদি পশু লুট করা হচ্ছে, বাজারে বোমা মারা হচ্ছে এবং ত্রাণবাহী গাড়িবহর আটকে দেয়া হচ্ছে।’

গবেষকরা আরো জানান, খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টাকালে বেসামরিক নাগরিকরা প্রায়ই হামলার শিকার হন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ পর্যন্ত ত্রাণ নেয়ার চেষ্টাকালে ১০ হাজার ৩০০-রও বেশি মানুষ হতাহত হয়েছেন।

ইনসিকিউরিটি ইনসাইটের পরিচালক ক্রিস্টিনা উইলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এর দায়বদ্ধতা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে।

ইনসিকিউরিটি ইনসাইটের পরিচালক ক্রিস্টিনা উইলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে বলেছেন, ‘এ ধরনের অমানবিক কাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব বিশ্ব সম্প্রদায়ের।’

তিনি বলেন, ‘২৪১৭ নম্বর প্রস্তাবটি ব্যর্থ হয়েছে- বিষয়টি এমন নয়; বরং সদস্য রাষ্ট্রগুলো এটি কার্যকর করতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মুখে যেসব কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে, সত্যিকার অর্থে তা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।’

ক্ষুধার এই অস্ত্রায়নের ফলে নারীরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্য ও সঙ্কটের মুখোমুখি হচ্ছেন বলে মনে করেন উইলে।

এ বিষয়ে তার ভাষ্য, ‘এমন পরিস্থিতিতে নারীদের সবচেয়ে কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। খাবারের অনিশ্চিত জোগানের কারণে তাদের অনেক দূর পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, যা সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাদের নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।’

তিনি বলেন, ‘যেসব নারী মূলত পরিবারের দেখভাল করেন, তারা এখন বাধ্য হয়ে পরিবারের উপর্জনক্ষম ব্যক্তিতে পরিণত হচ্ছেন। এমনকি পরিবারের সদস্যদের মুখে অন্ন তুলে দিতে তারা নিজেরা খাবার খাওয়া কমিয়ে দিচ্ছেন।

‘পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাবে শিশুরা খেলাধুলা, পড়াশোনা বা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে তাদের ভবিষ্যতের ওপর।’

বিশ্বে তীব্র ক্ষুধার শিকার মানুষের অর্ধেকেরও বেশির জন্য সংঘাতই প্রধান কারণ।

গত মাসে জাতিসঙ্ঘের সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, বৈশ্বিক ক্ষুধার একটি বড় অংশ এখন সীমিত কিছু সংঘাতপ্রবণ দেশে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের দুই-তৃতীয়াংশই বর্তমানে মাত্র ১০টি দেশে অবস্থান করছে।