পৃথিবীর সবচেয়ে গরম শহর এখন ইরানে

আবাদানে আগুন নেমেছে আকাশ থেকে, পৃথিবীর উষ্ণতম শহরের খেতাব পেল টানা তিনবার

খুজেস্তান প্রদেশে অবস্থিত আবাদান যেন এবার মরুভূমিকেও হার মানাচ্ছে। এমনকি সূর্যকেও যেন বলতে চাইছে, ‘তুমি যতই আগুন ছড়াও, আমি সহ্য করে নেব।’

সৈয়দ মূসা রেজা
সংগৃহীত

প্রচণ্ড গরমে যখন শহরগুলো হাঁসফাঁস করছে, তখন ইরানের এক শহর যেন রোদকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে! হ্যাঁ, কথাটা একেবারে আক্ষরিক অর্থেই বলা হচ্ছে। টানা তৃতীয় দিনের মতো আবাদান নামের এই ইরানি শহরটি জিতে নিয়েছে বিশ্বের ‘সর্বাধিক উষ্ণ শহরে’র উপাধি।

ইরানের খুজেস্তান প্রদেশ তেলের রাজ্য, রোদের জনপদ। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে এক প্রাচীন ভূমি, যার নাম খুজেস্তান। এক সময়ের এলাম সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ছিল এই অঞ্চল। এখানে মাটির নিচে আছে তেলের বিশাল ভাণ্ডার, আর ওপরে আছে তপ্ত সূর্যের রাজত্ব। দজলা-ফোরাতের শাখা নদী কারুন এখানকার জীবনরেখা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই নদীও যেন রোদের কাছে হার মেনেছে।

আবাদান যেন এক আগুনের শহরে জীবনের গল্প হয়ে উঠেছে।

এই খুজেস্তানের বুকে গড়ে ওঠা শহর আবাদান। এক সময় ইরানের সবচেয়ে বড় তেল পরিশোধনাগার ছিল এখানে। ব্রিটিশরা বসতি গড়েছিল সেই তেলের লোভে। যুদ্ধ, অর্থনীতি আর ইতিহাসে বারবার আলোচনায় এসেছে আবাদান। কিন্তু এখন এই শহর আলোচনায় আসে অন্য কারণে- আর তা হলো তাপমাত্রা।

এখানে রোদ যেন আগুনের ঝড়, তাপের সরোদ। তবুও আবাদানের মানুষ বাঁচে। দোকান খোলে, স্কুল চলে, রুটি সেঁকে কেউ বলেন, ‘এ তো আমাদের অভ্যেস।’

আবাদান শুধু একটা শহরের নাম নয়, সেটা যেন রোদের সাথে লড়াই করে টিকে থাকা এক সাহসী জনগোষ্ঠীর প্রতীক।

ইরানের অন্যতম জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম হামশাহরি অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) এই শহরের পারদ চড়ে পৌঁছে গিয়েছে ৫১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ঠিক তার আগের দিন বুধবার আবাদানের তাপমাত্রা ছিল ৫০ ডিগ্রি। অর্থাৎ এই শহরের জন্য ৫০ ডিগ্রি এখন যেন নিত্যদিনের ব্যাপার। খুজেস্তান প্রদেশে অবস্থিত আবাদান যেন এবার মরুভূমিকেও হার মানাচ্ছে। এমনকি সূর্যকেও যেন বলতে চাইছে, ‘তুমি যতই আগুন ছড়াও, আমি সহ্য করে নেব।’

তবে শুধু আবাদান নয়, খুজেস্তানের আরো কিছু শহরও যেন এই রেকর্ড ভাঙা উত্তাপে অংশ নিচ্ছে। একইদিনে, ওমিদিয়েহ নামের শহরটি ছিল বিশ্বের তৃতীয় উষ্ণতম শহর, আর আহভাজ ছিল চতুর্থ, যেখানে পারদ চড়েছিল ৫০.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

অন্যদিকে, খুজেস্তানের আরেকটি শহর দেজফুলের সাফিয়াবাদে সেই দিন ছিল বিশ্বের বারোতম উষ্ণতম শহর। আর তাপমাত্রা ছিল ৪৯.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এই গরম কেবল সংখ্যার খেলা নয়। বরং এই তাপপ্রবাহের ভেতর বাস করা প্রতিটি মানুষের জন্য এক ধরনের প্রতিদিনের সংগ্রাম। পানি, বিদ্যুৎ, ছায়া হয়ে ওঠে জীবনযুদ্ধের হাতিয়ার। আবাদানের বাসিন্দাদের কাছে এখন গ্রীষ্ম মানেই যেন একটা ভয়ানক যুদ্ধ। দিনের বেলায় বাইরে বেরোনো একপ্রকার দুঃসাহস। ছায়া খুঁজে পাওয়াই আশীর্বাদ।

প্রাকৃতিক এই উত্তাপের ঢেউ শুধু ইরান নয়, পুরো বিশ্বেই এক ভয়ানক সতর্কতা হয়ে দেখা দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে কতটা বাস্তব, তা এই শহরগুলোতে গিয়ে বুঝতে বাকি থাকে না।

আবাদানের এই উত্তপ্ত রেকর্ড কেবল তাপমাত্রার রেকর্ড নয়, এটা আমাদের ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। আমরা যদি এখনই কিছু না করি, তবে এই আমাদের শহরই আবাদানে রূপ নিতে পারে খুব শিগগির।

আবাদানের এই রোদ্দুর-জয়ী গল্প আমাদের শুধু তাপমাত্রার তথ্য দেয় না, এটা ভবিষ্যতের জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতা বুঝিয়ে দেয়। প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারালে শহরগুলো কিভাবে রোদের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে, তার এক জীবন্ত উদাহরণ এখন ইরানের খুজেস্তানে।

বিশ্বের সবচেয়ে গরম শহরের মুকুট আপাতত আবাদানের মাথায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো- পরবর্তীটা কে? আমাদের নগরী ঢাকাও কি একদিন এই তালিকায় উঠবে?