আন্তর্জাতিক সাইবার হামলার শিকার বহু বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলে সাইবার হামলা হয়েছে। এর ফলে বছরের শেষের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সময়ে এসে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা, বিভ্রান্তি এবং বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলে সাইবার হামলা হয়েছে। এর ফলে বছরের শেষের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সময়ে এসে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা, বিভ্রান্তি এবং বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে।

হ্যাকিং গ্রুপ শাইনি হান্টার এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। তাদের এই হামলার ফলে হাজার হাজার স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহৃত অ্যাকাডেমিক সফটওয়্যার ক্যানভাস এই সপ্তাহে অচল হয়ে পড়ে।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) ক্যানভাসের মালিক প্রতিষ্ঠান ইন্সট্রাকচার তাদের ওয়েবসাইটে জানায় যে, ‘অধিকাংশ ব্যবহারকারীর জন্য ক্যানভাস আবার চালু হয়েছে’। তবে শুক্রবারও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় সেবা বিঘ্নের অভিযোগ জানিয়েছে।

এই সাইবার হামলা বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল, যার প্রভাবে আনুমানিক নয় হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের হারিয়ে যাওয়া কাজ পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিতে শুক্রবারের ফাইনাল পরীক্ষা স্থগিত করার কথা জানিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী অবরে পালমার জানান, তার স্ক্রিনে যখন মুক্তিপণের বার্তা ভাসে, তখন তিনি মাত্রই দুই হাজার ৯০০ শব্দের একটি পরীক্ষার প্রবন্ধ শেষ করেছিলেন।

বার্তাটিতে লেখা ছিল, ‘শাইনি হান্টারস আবারো ইন্সট্রাকচারের নিরাপত্তা ভেঙে ঢুকেছে।’

এতে হুমকি দেয়া হয় যে, ক্যানভাস বা ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিটকয়েনে মুক্তিপণ না দিলে চুরি করা তথ্য প্রকাশ করে দেয়া হবে।

পালমার বলেন, ‘আমি প্রথমে ভেবেছিলাম যে আমাকেই হ্যাক করা হয়েছে, কারণ ব্যাপারটা ঠিক সেরকমই দেখাচ্ছিল। কিন্তু পরে মুক্তিপণের নোটটি পড়ে বুঝলাম ক্যানভাসই হ্যাক হয়েছে।’

তিনি আরো জানান, তিনি তখন তার অধ্যাপক এবং আরো কয়েক ডজন শিক্ষার্থীর সাথে ছিলেন। সবাই চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারেন যে, একই বার্তা তারা সবাই পেয়েছেন।

প্রথমদিকে তাদের কাজ সেভ হয়েছে কি-না, তা স্পষ্ট ছিল না। এ সময় খুব দ্রুতই শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে এবং পালমার বলেন, তিনি ‘আবার পরীক্ষার লেখা লিখতে হতে পারে- এই চিন্তায় খুবই ক্ষুব্ধ’ ছিলেন।

এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি ইমেইলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত আপডেট দিচ্ছে, পরীক্ষার নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করছে এবং এ ধরনের ‘দেশব্যাপী নিরাপত্তা ঘটনার’ জেরে সন্দেহজনক বার্তা উপেক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছে।

ইউনিভার্সিটি অফ সিডনি শুক্রবার তাদের শিক্ষার্থীদের জানায় যে, ‘ক্যানভাস ব্যবহার করা যাচ্ছে না’ এবং তারা শিক্ষার্থীদের লগইন করার চেষ্টা না করতে নির্দেশ দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের ওয়েবসাইটে লিখেছে, ‘বিশ্বজুড়ে প্রায় নয় হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমরাও এই বিভ্রাটের শিকার এবং আমরা এখনো ইন্সট্রাকচারের পরামর্শের অপেক্ষায় আছি।’

বিশ্ববিদ্যালয়টি জানায়, এই বিভ্রাট শিক্ষার্থীদের কোর্সওয়ার্ক ও পরীক্ষায় প্রভাব ফেলেছে এবং তারা ‘সেমিস্টারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসে এটিকে অত্যন্ত বিঘ্ন সৃষ্টিকারী’ হিসেবে স্বীকার করেছে।

বৃহস্পতিবার ইদাহো স্টেট ইউনিভার্সিটি জানায় যে, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার পর নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো বাতিল করা হয়েছে।

পেন স্টেট ইউনিভার্সিটি বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের পাঠানো এক বার্তায় জানায় যে, ‘কেউই ক্যানভাসে প্রবেশ করতে পারছে না’ এবং পরবর্তী ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান আসার সম্ভাবনা কম’। বিশ্ববিদ্যালয়টি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের কিছু পরীক্ষা বাতিল করে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত এক আপডেটে ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলাম্বিয়া শিক্ষার্থীদের জানায়, ক্যানভাসের মূল কোম্পানি ইন্সট্রাকচারের ‘সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের কারণে অচল’ এবং তাদের দ্রুত লগ আউট করার পরামর্শ দেয়।

ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টো জানায় যে, তারাও এই সাইবার হামলার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তারা এও জানায় যে ‘একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় এতে আক্রান্ত হয়েছে’।

অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি ক্যালিফোর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলসের শিক্ষার্থীরা ক্যানভাস প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনলাইনে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে সমস্যায় পড়েন।

আর ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো জানায়, তাদের ক্যানভাস পেজ লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এমন রিপোর্ট পাওয়ার পর সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

দ্যা শিকাগো ম্যারুনের প্রকাশ করা একটি স্ক্রিনশটে দেখা যায়, শাইনি হান্টারস মুক্তিপণ দাবি করে একটি বার্তা পাঠিয়েছে।

বার্তাটিতে বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যক্তিগতভাবে হ্যাকিং গ্রুপটির সাথে যোগাযোগ করে সমঝোতার জন্য আলোচনার আহ্বান জানানো হয় এবং ‘তাদের তথ্য প্রকাশ’ না করার জন্য সতর্ক করে দেয়া হয়।

একই ধরনের বার্তা পেয়েছিলেন নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির মাস্টার্স শিক্ষার্থী জ্যাকুয়াস আবো-রিজক। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রশাসকের পাঠানো বলে মনে হওয়া একটি ইমেইলের লিংকে ক্লিক করার পর তিনি এই বার্তা দেখতে পান।

আবো-রিজক বলেন, ‘আমি বুঝতেই পারছিলাম না কী ঘটছে। এমন একটি বার্তা পাওয়া সত্যিই ভয়ের ব্যাপার।’

তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়টি এ বিষয়ে একটি সাধারণ ইমেইল পাঠায়, যা বিবিসি দেখেছে। সেখানে বলা হয়েছিল, নর্থওয়েস্টার্ন ‘একটি বিষয়ের ওপর নজর রাখছে’।

ই-মেইলে আরো বলা হয়, ক্যানভাস পুনরায় চালুর নির্দিষ্ট সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের জানা নেই এবং অন্য আইটি অবকাঠামোগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

আবু-রিজক জানান, শুক্রবারও তিনি ক্যানভাসে প্রবেশ করতে পারেননি এবং এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আর কোনো বার্তা পাননি।

তিনি বলেন, ‘শুধু আমার নিজের কাজ শেষ করা বা ক্যানভাসের প্রয়োজনীয় সাইটগুলোতে প্রবেশ করতে না পারা নিয়েই নয়, বরং আসল হুমকিটা কী এবং এটি কিভাবে আমাকে প্রভাবিত করতে পারে- এ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘কোন তথ্য প্রকাশ করা হবে আমি জানি না, আর সেটাই আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে।’

বিবিসি এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সাথে যোগাযোগ করেছে।

শাইনি হান্টারস অতীতেও একাধিক আলোচিত সাইবার হামলার সাথে জড়িত ছিল। এরমধ্যে গত বছর জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের ওপর চালানো বড় এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হ্যাকটি ছিল অন্যতম।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এমিসফটের বিশ্লেষক লুক কনলি সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, স্ক্রিনশট অনুযায়ী এই গোষ্ঠীর লক্ষ্যভিত্তিক হুমকি রোববার থেকে শুরু হয় এবং বৃহস্পতিবার ও ১২ মে পর্যন্ত সময়সীমা দেয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, মুক্তিপণ নিয়ে আলোচনা এখনো চলতে পারে।

সাম্প্রতিক হামলায় তারা যে তথ্য চুরি করেছে বলে দাবি করছে, তা নিয়ে ভবিষ্যতে কী করবে- সে বিষয়ে গোষ্ঠীটি এখনো কিছু জানায়নি।

বৃহস্পতিবারের এই সাইবার হামলাগুলো এমন এক সময়ে ঘটে, যেদিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার দ্রুত বিকাশমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সাইবার ঝুঁকির বিরুদ্ধে আরো শক্তিশালী প্রতিরক্ষার আহ্বান জানিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে একটি চিঠি পাঠান।

তিনি লিখেছেন, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে অবিলম্বে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ‘আমেরিকানরা এমন বিভ্রাট, বিঘ্ন এবং মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, এমন হামলার শিকার হওয়ার আগেই পদক্ষেপ নিতে হবে।’

সূত্র: বিবিসি