সংস্কারের পর ’মির জুমলার ঢাকা গেট‘ নিয়ে বেড়েছে আগ্রহ

মোগল আমলে বুড়িগঙ্গা নদী হয়ে ঢাকায় ঢোকার ‘প্রবেশমুখ’ ছিল এ তোরণ। পরে কখনো ‘ময়মনসিংহ গেট’, কখনো ‘ঢাকা গেট’, আবার কখনো ‘রমনা গেট’ নাম ছিল এটির।

মির জুমলার ঢাকা গেট ও বিবি মরিয়ম
মির জুমলার ঢাকা গেট ও বিবি মরিয়ম |নয়া দিগন্ত

ইব্রাহীম খলিল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ছাড়িয়ে বাংলা একাডেমি। সেটা পেরিয়ে দোয়েল চত্বরের পথে একটু এগোতেই চোখে পড়বে ৩৬৫ বছরের স্মৃতি বিজড়িত মীর জুমলার ফটক বা ঢাকা গেট। বাংলার সুবেদার মীর জুমলার শাসনামলে নির্মিত এই ফটক ঢাকার নিরাপত্তার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ইসলাম খাঁর আমলে রমনা অঞ্চলে ছিল ’বাগে বাদশাহি‘ নামক মোগল উদ্যান। বাগে বাদশাহির প্রবেশপথে দুটি স্তম্ভ ছিল। পরে গেটটি পুনর্নির্মাণ করে নামকরণ করা হয় ‘ঢাকা গেট’। মোগল আমলে বুড়িগঙ্গা নদী হয়ে ঢাকায় ঢোকার ‘প্রবেশমুখ’ ছিল এ তোরণ। পরে কখনো ‘ময়মনসিংহ গেট’, কখনো ‘ঢাকা গেট’, আবার কখনো ‘রমনা গেট’ নাম ছিল এটির।

কালের পরিক্রমায় স্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে বসেছিল মোগল আমলের এই নান্দনিক স্থাপত্য। সেই স্থাপনাই নতুন রূপে ফিরিয়ে এনেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ফটকটিকে আরো নান্দনিক করতে সাথে স্থাপন করা হয়েছে মীর জুমলার কামানটিও, যা বিবি মরিয়ম নামে পরিচিত।

অনেক ঐতিহাসিকের মতে, দস্যু ও শত্রুদের মোকাবেলায় এটি তৈরি করেন বাংলার সেনাপতি মীর জুমলা। ৬৪ হাজার ৮১৫ পাউন্ড ওজনের কামানটি ১৭ শতকের মাঝামাঝিতে আসাম অভিযানের পর বাংলার সুবেদার রাজধানী ঢাকার বড় কাটরার সামনে সোয়ারীঘাটে স্থাপন করেন। এক সময় কামানটি অর্ধেক বালির নিচে তলিয়ে গেলে ১৮৪০ সালে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াল্টার্স সেটিকে চকবাজার এলাকায় স্থাপন করেন। এরপর আরো কয়েকবার স্থানবদল হয়। ঢাকা জাদুঘরের পরিচালক নলিনীকান্ত ভট্টশালীর উৎসাহে ১৯২৫ সালে কামানটিকে সদরঘাটে স্থাপন করা হয়। ১৯৫৭ সালে ডিআইটির সভাপতি জি এ মাদানী তৎকালীন ডিআইটি অ্যাভিনিউ তথা গুলিস্থানে স্থানান্তর করেন। সেখানে তিন যুগ অবস্থানের পর ১৯৮৩ সালে ওসমানী উদ্যানে স্থানান্তর হয়। আর সর্বশেষ সদ্য সংস্কারকৃত ঢাকা গেটের পাশে স্থাপিত হয়েছে কামানটি। সে হিসেবে এ কামানও নিছক যুদ্ধের সরঞ্জাম হয়ে থাকেনি, হয়েছে ঢাকার ঐতিহাসিক বাঁক বদলের সাক্ষী।

২০২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি বিকেল ৪টায় সংস্কার প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ঢাকা গেট জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ঢাকা শহরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ঢাকা গেট সংস্কারের কাজটি শুরু করে ২০২৩ সালের মে মাসে। ২০২২ সালে ডিএসসিসি এটি সংস্কার করার উদ্যোগ নেয়ার আগ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দোয়েল চত্বরের কাছে অবস্থিত জরাজীর্ণ কাঠামোটি সকলের অগোচরে থেকে যায়। ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের শিক্ষক স্থপতি ড. আবু সাঈদের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ দল গেটটির নতুন এই রূপ দিয়েছেন।

এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত ঢাকার এনসাইক্লোপিডিয়া অনুসারে, ঢাকা গেটটি ১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ সালের মধ্যে মীর জুমলা দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। যিনি মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাংলার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এটি শহরের প্রবেশদ্বার এবং এর সীমানা চিহ্নিতকারী হিসেবে কাজ করেছিল। শত্রুর আক্রমণ থেকে ঢাকাকে রক্ষা করার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা কাজেও এই গেট ব্যবহার করা হতো। এটি ১৮২৫ সালে ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডাউস দ্বারা পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং তৎকালীন সময় এটিকে ’রমনা গেট‘ নামকরণ করা হয়। ব্রিটিশ শাসনের পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক শাসনের সময় গেটটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সংস্কারের পর গেটের অংশগুলো আগের রূপে ফিরিয়ে সেখানে নান্দনিক চত্বর করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে বসার স্থান। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কয়েকজন দর্শনার্থীকে চোখে পড়লো। তারা ঐতিহাসিক এই স্থাপত্যকর্মের ছবি তুলছিলেন। ঘুরে ঘুরে স্থাপত্যকর্ম দেখছিলেন। মীর জুমলার কামানটি নিয়েও দর্শনার্থীদের আগ্রহ চোখে পড়লো। 

স্থাপনা দেখতে আসা দর্শনার্থী রবিউল ইসলাম জানান, ‘ঢাকা গেটের কথা জেনেছি ইতিহাস থেকে। সাড়ে তিন শ’ বছরের সেই স্থাপনা দেখার জন্য তাই পরিবার নিয়ে ছুটে আসা। আমাদের মতো অনেকে জায়গাটিতে ছবি তুলতে আসছেন নিয়মিত। এখানে এসে খুবই ভালো লাগছে।‘