- তামান্না আক্তার
আহসান মঞ্জিল (গোলাপি প্রাসাদ) বাংলার গৌরবময় ইতিহাস, নবাবদের আভিজাত্য এবং ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন। বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে পুরান ঢাকার ইসলামপুরের কুমারটুলিতে অবস্থিত এই সুরম্য ভবনটি একসময় ছিল ঢাকার নবাব পরিবারের বাসভবন ও সদর কাচারি।
ঢাকায় অবস্থিত পুরনো স্থাপনাগুলোর মধ্যে আহসান মঞ্জিল সবচেয়ে পুরনো এবং ইট–পাথরের তৈরি প্রথম স্থাপনা। এটি ছিল ঢাকার নবাবদের আবাসিক প্রাসাদ ও জমিদারীর সদর কাচারি। বর্তমানে এটি জাদুঘর হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জালালপুর পরগনার জমিদার শেখ ইনায়েতউল্লাহ আহসান মঞ্জিলের বর্তমান স্থানে রংমহল নামে একটি ভবন নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে তার পুত্র শেখ মতিউল্লাহ রংমহলটি ফরাসি বণিকদের কাছে বিক্রি করে দেন। ফরাসিরা এটি বাণিজ্য কুঠি হিসাবে ব্যবহার করতেন। এরপরে ১৮৩০ সালে নওয়াব আবদুল গনির পিতা খাজা আলীমুল্লাহ এটি ক্রয় করে বসবাস শুরু করেন। ১৮৫৯ সালে নওয়াব আবদুল গনি এই বাসভবনে একটি প্রাসাদ নির্মাণ শুরু করেন যা ১৮৭২ সালে সমাপ্ত হয়। পরে তিনি তার প্রিয় পুত্র খাজা আহসানুল্লাহর নামানুসারে এর নামকরণ করেন ‘আহসান মঞ্জিল’। ওই সময়ে নবনির্মিত প্রাসাদ ভবনটি রংমহল ও পুরাতন ভবনটি অন্দরমহল নামে পরিচিত ছিল।প

১৮৮৮ সালের প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পুরো আহসান মঞ্জিলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত আহসান মঞ্জিল পুনর্নির্মাণের সময় বর্তমান উঁচু গম্বুজটি সংযোজন করা হয়। সে আমলে ঢাকা শহরে আহসান মঞ্জিলের মতো এতো জাঁকালো ভবন আর ছিল না। এর প্রাসাদোপরি গম্বুজটি শহরের অন্যতম উঁচু চূড়া হওয়ায় তা বহুদূর থেকেও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করত। প্রাসাদের সামনে দোতলার বারান্দা ঘেঁষে একটি প্রসস্থ সিঁড়ি রয়েছে। বলা হয়ে থাকে নবাবগণ এখানে দাঁড়িয়েই প্রজাদের কথা শুনতেন এবং নির্দেশনা প্রদান করতেন। এই প্রাসাদ শুধু তার সৌন্দর্যের জন্যই নয় বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সভা, বিচারকার্য, সামাজিক ও রাজনৈতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হতো। বিশেষত, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ আহসান মঞ্জিল থেকেই নেওয়া হয়, যা উপমহাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় নওয়াব আবদুল গণি ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিদের নিয়ে এই প্রাসাদেই সভা ডাকেন।

১৯০১ সালে খাজা আহসানউল্লাহর মৃত্যুর পর আহসান মঞ্জিলের গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। তার উত্তরসূরিরা পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে আহসান মঞ্জিলের গৌরবকে ধরে রাখতে পারেননি। তারা প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ ভাড়াটিয়াদের কাছে ভাড়া দেন এবং এর ফলে প্রাসাদটি বস্তিতে রুপান্তরিত হয়। ১৯৫২ সালে জমিদারী উচ্ছেদ আইনের আওতায় ঢাকার নবাব এস্টেট সরকার অধিগ্রহণ করে। নবাব পরিবারের সম্পত্তির মধ্যে অধিগ্রহণ বহির্ভূত ছিল আহসান মঞ্জিল ও তৎসংলগ্ন আঙিনা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে নবাব পরিবারের উত্তরসূরীরা আহসান মঞ্জিল নিলামে বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। ভবনটির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে তৎকালীন সরকার প্রাসাদ ভবনটি নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন।

১৯৮৫ সালে আহসান মঞ্জিল প্রাসাদ ও তৎসংলগ্ন চত্বর সরকার অধিগ্রহণ করে সেখানে জাদুঘর স্থাপনের কাজ শুরু করে। ১৯৯২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এখন প্রায় প্রতিনিয়তই দূর-দূরান্ত থেকে এমনকি ভিনদেশ থেকেও পর্যটকরা আসে এই আহসান মঞ্জিল পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে।
আহসান মঞ্জিল ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ জাদুঘরের সংগ্রহশালা। মোট ৪ হাজার ৭৭ টি নিদর্শন আহসান মঞ্জিলের ২৩টি কক্ষে প্রদর্শনীর জন্য উন্মুক্ত করা আছে। নয়টি কক্ষ সেই নবাবী আমলের মতো করেই সাজানো রয়েছে। প্রতিটি কক্ষ সেই নবাবী আমলের ইতিহাসের কাছে নিয়ে যায়। জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য আছে আহসান মঞ্জিলের ইতিহাস, নওয়াবদের পরিচিতি ও বংশ তালিকা।

নওয়াবদের ব্যবহৃত বড় বড় আয়না, বৃহদাকার লোহার সিন্দুক, কাঠের আলমারী, ডাইনিং রুম, ড্রয়িং রুম, কাচ ও চিনামাটির থালা-বাসন, হাতির মাথার কঙ্কাল, ঢাল ও তরবারি। নওয়াব আমলের বিভিন্ন ধরনের অলংকৃত রুপা, ক্রিস্টালের তৈরি চেয়ার-টেবিল, সিংহাসন, বিভিন্ন ধরনের তৈলচিত্র, ফুলদানি, হিন্দুস্থানী রুম, রাজকীয় অতিথিদের বেডরুম ও নাচঘর। আরও আছে সমসাময়িককালের বিখ্যাত ব্যাক্তিদের প্রতিকৃতি ও নওয়াবদের বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের নিদর্শন।
লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।



