- রহিমা খাতুন
বুড়িগঙ্গার তীর ঘেসে সকালের সোনালী আলোতে ওয়াইজঘাটে যে পুরোনো লাল দালানটি চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছে সেটি হলো পুরান ঢাকার লালকুঠি। পাখির কলতান, নদীর ঢেউয়ের মৃদু শব্দ আর সূর্যের লাল আভায় মোড়া স্থাপনাটি দূর থেকেই নজর কাড়ে। মনে হয়, লাল শাড়ি পরে নববধূর সাজে দাঁড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার শতবর্ষী এক স্মৃতিচিহ্ন।—যার প্রতিটি ইট, প্রতিটি খিলান আর প্রতিটি অলিন্দে লুকিয়ে আছে বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গল্প।
দীর্ঘদিনের অবহেলা, জরাজীর্ণতা ও দখলদারিত্বের অন্ধকার কাটিয়ে আজ আবারও নতুন রূপে ফিরেছে লালকুঠি। সংস্কারের পর এটি এখন পুরান ঢাকার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। বিকেল হলেই ইতিহাসপ্রেমী, ভ্রমণপিপাসু, শিক্ষার্থী, পরিবার ও তরুণ-তরুণীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। অতীতের গৌরব আর বর্তমানের প্রাণচাঞ্চল্য যেন একই সুতোয় গেঁথে দিয়েছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে।

১৮৭৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুক ঢাকা সফরে এলে সেই সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে তৎকালীন জমিদার ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা একটি টাউন হল নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সেই উদ্যোগের ফলই নর্থব্রুক হল, যা পরবর্তীতে লাল রঙের জন্য লোকমুখে 'লালকুঠি' নামে পরিচিতি পায়। ১৮৭৪ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ১৮৮০ সালে এর কাজ সম্পন্ন হয়।
একসময় লালকুঠি ছিল পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। এখানে নিয়মিত নাট্যচর্চা, গান, সাহিত্যসভা, বনেদি সমাজের আড্ডা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সরকারি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো। বিখ্যাত অভিনেতা প্রবীর মিত্রের অভিনয়জীবনের হাতেখড়িও হয়েছিল এই লালকুঠিতেই।
১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি এই ভবনেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঢাকা পৌরসভা ও পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ভবনটি বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৪৮ সালে এটি একটি গ্রন্থাগার হিসেবে চালু হয়, যেখানে প্রায় ১০ হাজার বইয়ের সংগ্রহ ছিল। পরে ১৯৫০ সালে ভবনটি টেলিগ্রাম অফিস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

স্থাপত্যটি ইউরোপীয় ও মোঘল স্থাপত্যের মেলবন্ধন। সেই রীতিতেই তৈরি করা হয়েছে। উত্তরদিকে রয়েছে চমৎকার প্রবেশ-দ্বার, কারুকাজে খচিত খিলান, সেমি সার্কুলার জানালা। ভবনের ভিতরে রয়েছে বিশাল হলরুম যা একসময় নাচঘর এবং থিয়েটার হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় অবহেলা ও অযত্নে ভবনটির জৌলুস হারিয়ে যেতে থাকে। দখলদারিত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছিল পুরান ঢাকার এই ঐতিহাসিক নিদর্শন।
তবে সময়ের সঙ্গে বদল এসেছে সেই চিত্র। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে লালকুঠির সংস্কারকাজ চলছে। নতুন করে লাল-সাদা রঙে সেজে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে পুরান ঢাকার এই ঐতিহাসিক ভবন। ঢাকা দক্ষিণ সিটির সূত্রে জানা যায়, "বিশ্বব্যাংক ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়নে কাজ চলছে লালকুঠির।"
লালকুঠির নতুন সাজে মুগ্ধ স্থানীয় বাসিন্দারাও।
নূরুল ইসলাম বলেন, “আমরা ছোটবেলায় লালকুঠির মাঠে খেলতাম। অনেক বছর দখলদারিত্বের কারণে এখানে আসাই হতো না। এখন সংস্কার হওয়ায় খুব ভালো লাগছে।”

একজন ভ্রমণপিপাসু দর্শনার্থী বলেন, “লালকুঠির ইতিহাস অনেক পড়েছি। এর বেহাল অবস্থার কথাও শুনেছিলাম। সংস্কার হওয়ায় এখন নিজের চোখে ইতিহাসকে নতুনভাবে দেখতে পারছি।”
বর্তমানে লালকুঠিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রাণবন্ত পরিবেশ। প্রতিদিন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে ঘুরতে আসছেন। আশপাশে গড়ে উঠেছে ভ্রাম্যমাণ দোকান, বেড়েছে পর্যটকদের আনাগোনা। নতুন প্রজন্মও জানতে পারছে নিজেদের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের কথা।

লালকুঠির এই পুনর্জন্ম শুধু একটি ভবনের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার গল্প নয়; এটি আমাদের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এমন অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা যদি একইভাবে সংরক্ষণ ও সংস্কার করা যায়, তবে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধভাবে বেঁচে থাকবে আগামী প্রজন্মের কাছে।
লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।



