বালিয়াটি জমিদার বাড়ি

কালের সাক্ষী এক জমিদারি স্থাপত্যের রাজকীয় ইতিহাস

নয়া দিগন্ত ডিজিটাল
  • মো: রবিন শেখ

রাজকীয় স্থাপত্যের জৌলুশ হারাচ্ছে, দেয়ালে বয়সের ছাপ। কোথাও খসে পড়ছে পলেস্তারা, কোথাও দেখা দিচ্ছে শ্যাওলা ও স্যাঁতসেঁতে ভাব। সময়ের ক্ষত স্পষ্ট হয়ে উঠছে বালিয়াটি জমিদার বাড়ির শরীরে। অথচ এই স্থাপনাই একসময় ছিল জমিদারি আভিজাত্য ও ক্ষমতার প্রতীক। সংরক্ষণে নানা সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং দর্শনার্থীদের চাপের কারণে ঐতিহাসিক এই স্থাপত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা জমিদার বাড়িটি শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি বাংলার জমিদারি আমলের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। বিশাল প্রাসাদ, নান্দনিক কারুকাজ, উঁচু স্তম্ভ, খিলান ও প্রশস্ত বারান্দা আজও এর অতীতের রাজকীয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে সেই জৌলুশের আড়ালে এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে বয়স ও অবহেলার চিহ্ন।

বালিয়াটি প্রসাদ ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত মানিকগঞ্জ জেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে সাটুরিয়া উপজেলায় এ প্রসাদের অবস্থান। খ্রিস্টীয় উনিশ শতকের দিকে এই বাড়ি নির্মিত হয়। চুন শুরকি দিয়ে প্রায় ৫.৮৮ একর জমির উপর গড়ে ওঠা এই জমিদার বাড়ি একটি পরিখা ও প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, যার ভেতরে রয়েছে সাতটি পৃথক প্রাসাদ ভবন এবং প্রায় দুইশতাধিক কক্ষ। প্রাসাদের পেছনের দিকে রয়েছে একটি বড় দিঘি, যা এখনো এলাকার সৌন্দর্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

একটি নিম্নবিত্ত সাহা পরিবার থেকেই বালিয়াটি জমিদার বংশের উদ্ভব। বালিয়াটির জমিদারদের পূর্বপুরুষ গোবিন্দ রায় সাহা ছিলেন একজন ধনাঢ্য লবণ ব্যবসায়ী।

এই বাড়ির উত্তর-পশ্চিম অংশে লবণের একটা বড় গোলাবাড়ি ছিল। এই কারণে এই বাড়ির নাম রাখা হয়েছিল গোলাবাড়ি। সেকালে গোলাবাড়ির চত্বরে বারুনির মেলা বসত এবং এর পশ্চিম দিকে তাল পুকুরের ধারে আয়োজন করা হতো রথ উৎসব। বসত রথের মেলা। তবে পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে বর্তমানে এই স্থানে রথের মেলা না হয়ে হয় বালিয়াটি গ্রামের পুরান বাজারের কালী মন্দিরের পাশে।

গোবিন্দ রায়ের পরবর্তী বংশধর দাধী রাম, পণ্ডিত রাম, আনন্দ রাম ও গোলাপ রাম। এই পরিবারে স্মরণীয় অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন নিত্যানন্দ রায় চৌধুরী, বৃন্দাবন চন্দ্র, জগন্নাথ রায়, কানাই লাল, কিশোরি লাল, যশোর্ধ লাল, হীরা লাল রায় চৌধুরী, ঈশ্বর চন্দ্র রায় চৌধুরী, হরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী প্রমুখ। ঢাকার জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাদেরই বংশধর বাবু কিশোরীলাল রায়। আনুমানিক ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে বালিয়াটি জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন হয়।

১৩০০ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ এই বাড়ির জমিদাররা গৃহপ্রবেশ করেন বলে জানা যায়। জমিদার বাড়ির সামনেই রয়েছে একটি বড় পুকুর। বর্তমানে এই পুকুরের ঘাটগুলো জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। বাড়িটির সামনের ভাগে চারটি সুবিন্যস্ত সিংহদ্বার সমৃদ্ধ চারটি বিশাল প্রাসাদ পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত এমন সুদৃশ্যভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখানে সাতটি প্রাসাদতুল্য ইমারতে মোট ২০০টি কক্ষ আছে। এ ছাড়াও রয়েছে পথের দুপাশে ফুলের বাগান। বাড়ির ভিতরে কয়েকটি স্বচ্ছ পানির কূপও রয়েছে।

বালিয়াটি প্রাসাদের প্রতিটি প্রবেশ পথের চূড়ায় রয়েছে পাথরের তৈরি চারটি সিংহমূর্তি। যাকে বলে সিংহ দরজা। ছোট ছোট ফুল সমৃদ্ধ এমন প্রাচীন সৌন্দর্য যেন দৃষ্টি নন্দিত।

স্থানীয়দের মতে, এর মূল প্রবেশদ্বার কাঠের তৈরি ছিল। এখানে পূর্ববাড়ি, পশ্চিমবাড়ি, উত্তরবাড়ি, মধ্যবাড়ি এবং গোলাবাড়ি নামে বড় আকারের পাঁচটি ভবন। জমিদারবাড়ির এই বিভিন্ন অংশ বালিয়াটি জমিদার পরিবারের উত্তরাধিকারীরাই তৈরি করেন বলে জানা যায়। এই রাজবাড়ির প্রথম সারিতে চারটি প্রাসাদ রয়েছে। এগুলোর নির্মাণশৈলী মোটামুটি একই রকম। চার-চারটা জমিদার বাড়ি, প্রায় ৫০ ফিট উঁচু এক একটা প্রাসাদ এতই কারুকাজে পূর্ণ যে প্রতি মুহূর্তেই বিস্মিত হয় দর্শনার্থীরা। আট ইঞ্চি করে সিঁড়ির উত্থান আর বিশাল বিশাল স্তম্ভগুলো চুন-সুরকি আর ইট দিয়ে তৈরি। প্রতিটা স্তম্ভের স্তম্ভমূল ছয় ফুটেরও বেশি।

গ্রিক স্থাপত্যের মতোই কারুকাজমণ্ডিত স্তম্ভের ওপরের দিকটা প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে। ফ্লোরাল টপসহ কোরেন্থিয়ান ধাঁচের পিলার আছে চার প্রাসাদেই। এর মাঝখানের দুটি প্রাসাদ দুই তলা এবং দুই পার্শ্বের দুটো প্রাসাদ তিন তলা। এর মধ্যে ১টি প্রাসাদে আগে কলেজ ছিল, বর্তমানে তা পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে বলে জানা গেছে।

২ নম্বর প্রাসাদের ভেতরেই বর্তমান জাদুঘর। এর দ্বিতীয় তলায় একটি রংমহল রয়েছে। এখানে জমিদারদের ব্যবহৃত নিদর্শনাদি দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে। নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে জমিদারদের ব্যবহৃত অসংখ্য সিন্দুক, ছোট-বড় আয়না, ঝাড়বাতি, লণ্ঠন, শ্বেত পাথরের ষাঁড়, শ্বেত পাথরের টেবিল, পালঙ্ক, আলনা, কাঠ এবং বেতের চেয়ারসহ আরো অনেক নিদর্শন। মজলিস কক্ষে মূল্যবান ঝাড়বাতি রয়েছে। মজলিস কক্ষটির দেয়ালে হাতে আঁকা ছবি আছে। এর অন্দর মহলে রয়েছে তিনটি অট্টালিকা। এখানে ছিল অতিথিদের থাকার জায়গা, রন্ধনশালা, সহিস আর পরিচারকদের থাকার ঘর। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ল্যাম্পগুলো।

গ্রিক স্থাপত্যের মতোই কারুকাজমণ্ডিত স্তম্ভের ওপরের দিকটা প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে। ফ্লোরাল টপসহ কোরেন্থিয়ান ধাঁচের পিলার আছে চার প্রাসাদেই। এর মাঝখানের দুটি প্রাসাদ দুই তলা এবং দুই পার্শ্বের দুটো প্রাসাদ তিন তলা।

২ নম্বর প্রাসাদের ভেতরেই বর্তমান জাদুঘর। এর দ্বিতীয় তলায় একটি রংমহল রয়েছে। এখানে জমিদারদের ব্যবহৃত নিদর্শনাদি দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে। নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে জমিদারদের ব্যবহৃত অসংখ্য সিন্দুক, ছোট-বড় আয়না, ঝাড়বাতি, লণ্ঠন, শ্বেত পাথরের ষাঁড়, শ্বেত পাথরের টেবিল, পালঙ্ক, আলনা, কাঠ এবং বেতের চেয়ারসহ আরো অনেক নিদর্শন। মজলিস কক্ষে মূল্যবান ঝাড়বাতি রয়েছে। মজলিস কক্ষটির দেয়ালে হাতে আঁকা ছবি আছে। এর অন্দর মহলে রয়েছে তিনটি অট্টালিকা। এখানে ছিল অতিথিদের থাকার জায়গা, রন্ধনশালা, সহিস আর পরিচারকদের থাকার ঘর। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ল্যাম্পগুলো।

৩ নম্বর প্রাসাদেরও দরজা বন্ধ। হাঁটা শুরু করলাম ২ ও ৩ নম্বর অন্দরমহলের মাঝখানের দুই ফিটের সরু গলিতে। তক্ষক আর চামচিকার শব্দ শুনতে শুনতে যখন অপরপ্রান্তে বেরিয়ে আসলাম, সামনে তখন জমিদারবাড়ির পুকুর। ৬টা সিঁড়ি পুকুরে নেমে গেছে। বেশিরভাগই ভাঙা। শান বাঁধানো ছয়টি ঘাট আছে এ পুকুরের চারপাশে, যা দেখতে সত্যিই মনোহর।

বালিয়াটিতে আজও নাকি দুই বেলা রাধা বল্লব পূজো হচ্ছে। ভেতর বাড়িতে পুকুরের সিঁড়িও পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা। পুর্ব পার্শ্বের একটি সিঁড়ি এখন আর নেই। পুকুরে নামার জন্য সাতটা সিঁড়ি ছিল। সব মিলিয়ে ৫টা কুয়ো আছে। সবই ভরাট হয়ে গেছে।

বর্তমানে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি নতুন প্রজন্মের কাছে অতীতকে জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হতে পারে। বইয়ের পাতায় জমিদারি প্রথা সম্পর্কে পড়ার পাশাপাশি একটি বাস্তব স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে সেই ইতিহাস অনুভব করার সুযোগ তৈরি হবে এখানে।

শিক্ষার্থী, গবেষক, ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের জন্য এটি হতে পারে একটি উন্মুক্ত ইতিহাসের পাঠশালা। তবে সেই পাঠশালাকে টিকিয়ে রাখতে হলে স্থাপনাটির যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

এখানে দেশি দর্শনার্থীরা ৩০ টাকা টিকিট দিয়ে ঢুকতে পারবেন। এছাড়া, সার্কভুক্ত দর্শনার্থীকে ১০০ টাকা এবং বিদেশি দর্শনার্থীকে ২০০ টাকা টিকিট কেটে ঢুকতে হবে। রোববার পূর্ণদিবস ও সোমবার অর্ধদিবস বন্ধ থাকে এই প্রাসাদ।

তাই বালিয়াটি জমিদার বাড়িকে শুধু পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। এর প্রতিটি দেয়াল, স্তম্ভ ও কারুকাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি সময়ের গল্প। রাজকীয় অতীতের এই সাক্ষীকে টিকিয়ে রাখতে এখনই প্রয়োজন আরও কার্যকর সংরক্ষণ, সচেতন পর্যটন ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা।

লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।