শতবর্ষী ’কমলা রকেটের‘ নতুন যাত্রা

সরকারের ঐতিহ্য সংরক্ষণ উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ১৫ নভেম্বর জমকালো আয়োজনের মাধ্যমে এটি ঢাকা-বরিশাল রুটে পর্যটন সার্ভিস হিসেবে পুনরায় যাত্রা শুরু করেছে।

কমলা রঙের রকেট স্টিমার
কমলা রঙের রকেট স্টিমার |নয়া দিগন্ত

ইব্রাহীম খলিল

নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে এক শতাব্দী ধরে ভেসে চলা কমলা রঙের জলযান ‘রকেট স্টিমার’। এটি শুধু একটি স্টিমারই নয়, এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বহু প্রজন্মের স্মৃতি বহনকারী।

পদ্মা সেতু চালুর পর যাত্রীর অভাবে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে যার চাকা থেমে গিয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক প্যাডেল স্টিমার ’পিএস মাহসুদ‘ আবারো ফিরছে নদীর বুকে। সরকারের ঐতিহ্য সংরক্ষণ উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ১৫ নভেম্বর জমকালো আয়োজনের মাধ্যমে এটি ঢাকা-বরিশাল রুটে পর্যটন সার্ভিস হিসেবে পুনরায় যাত্রা শুরু করেছে। নস্টালজিয়ার ভেঁপু বাজিয়ে এই জলযানটির প্রত্যাবর্তন দেশের পর্যটন শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ শাসনের হাত ধরে বাংলার নদীপথে স্টিমারের যাত্রা শুরু হয়। ১৮৮৪ সালে বরিশাল-খুলনা রুটে আনুষ্ঠানিকভাবে প্যাডেল স্টিমারের সার্ভিস চালু হয়। তখন এই স্টিমারগুলোই ছিল সবচেয়ে দ্রুতগামী ও বিলাসবহুল নৌযান। কয়লাচালিত বাষ্পীয় ইঞ্জিন এবং দুই পাশে বিশাল প্যাডেল চাকা ঘুরিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে চলার কারণে স্থানীয়রা ভালোবেসে এগুলোকে ’রকেট‘ নামে ডাকতে শুরু করে।

বর্তমানে বিশ্বে মুষ্টিমেয় যে কয়টি প্যাডেল স্টিমার টিকে আছে, তার মধ্যে পাঁচটি বাংলাদেশের গর্ব। সাধারণত পিএস মাহসুদ, পিএস অস্ট্রিচ, পিএস লেপচা ও পিএস টার্ন এই চারটি স্টিমারকেই প্রধানত বাংলাদেশের প্যাডেল স্টিমারের ঐতিহ্য হিসেবে গণ্য করা হয়।

অন্য স্টিমারটি হলো পিএস গাজী। এটি একসময় চলাচল করত, তবে নব্বই দশকে এটি আগুনে পুড়ে যায় এবং বর্তমানে এটি আর সচল নেই। এই স্টিমারগুলো ১৯২৮ সাল থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে কলকাতার বিখ্যাত গার্ডেন রিচ ডকইয়ার্ডে নির্মিত হয়েছিল।

প্যাডেল স্টিমারগুলোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর ইঞ্জিন ও চলন কৌশল। শুরুর দিকে এটি ছিল কয়লাচালিত বাষ্পীয় ইঞ্জিন (স্টিম ইঞ্জিন) নির্ভর। বয়লারে কয়লা পুড়িয়ে যে প্রচণ্ড বাষ্প তৈরি হতো, সেই শক্তি দিয়েই দুই পাশের বিশাল প্যাডেল চাকা ঘুরতো।

আশির দশকের শুরুতে পরিবেশগত কারণে ও সহজলভ্যতার জন্য এই স্টিম ইঞ্জিনকে ডিজেল ইঞ্জিনে রূপান্তর করা হয়। ডিজেল ইঞ্জিনে পরিবর্তিত হলেও এর ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল গিয়ার সিস্টেম অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। এই বিশাল প্যাডেলগুলো যখন নদীর জল কেটে ঘূর্ণন সৃষ্টি করে, সেই দৃশ্য এবং ছন্দময় শব্দই এই স্টিমারের ভ্রমণের প্রধান আকর্ষণ। এর এই ঐতিহাসিক নকশার কারণেই এটি শত বছর ধরে পানিপথে অনন্য।

দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকা পিএস মাহসুদকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পুনরায় চলাচলের উপযোগী করতে ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন) জানিয়েছে, প্রায় তিন কোটি টাকার বেশি খরচ করে এটিকে নতুন রূপে সাজানো হয়েছে।

সংস্কার প্রক্রিয়ায় মূল কাঠামো ও ঐতিহাসিক কমলা রঙের নকশা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে, কিন্তু ইঞ্জিন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে যুক্ত করা হয়েছে অত্যাধুনিক ডিজেল ইঞ্জিন। যুক্ত করা হয়েছে ডিজিটাল নেভিগেশন ব্যবস্থা এবং জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম। নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংযোজন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা সরঞ্জাম, লাইফ বোট এবং ফায়ার সেফটি সিস্টেম সম্পূর্ণ নবায়ন করা হয়েছে। ইঞ্জিনে ব্যবহৃত হয়েছে কম ধোঁয়া নির্গমনকারী প্রযুক্তি, যা নদীপথে দূষণ হ্রাসে সহায়ক হবে।

গত ১৫ নভেম্বরের পর এটি আর শুধু যাত্রী পারাপারের মাধ্যম হিসেবে নয়, চলবে একটি নিয়মিত পর্যটন সার্ভিস হিসেবে। স্টিমারটি এখন ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে চলছে। এটি প্রতি শুক্রবার সকালে ঢাকা সদরঘাট থেকে বরিশালের উদ্দেশে ছেড়ে যায় এবং পরদিন শনিবার বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে ফিরে আসে।

যাত্রীরা ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে পারছেন পদ্মা-মেঘনার বুক চিরে ছুটে চলার অভিজ্ঞতা। কেবিনের জানালা দিয়ে দেখা যায় নদীর ধারের রূপসী বাংলার মনোরম দৃশ্য। বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ পিএস মাহসুদের পাশাপাশি পিএস অস্ট্রিচ, পিএস লেপচা ও পিএস টার্নসহ আরো কয়েকটি পুরোনো স্টিমার সংস্কারের পরিকল্পনা নিয়েছে, যা নদীভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনাকে আরো বিস্তৃত করবে।

প্রায় শতবর্ষী এই জলযানটি একসময় ঢাকা-কলকাতা রুটের প্রাণকেন্দ্র ছিল। কালের সাক্ষী এই স্টিমারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মতো বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব বাংলার নদীপথের রূপ উপভোগ করেছেন। কালজয়ী চলচ্চিত্র ’সারেং বৌ‘তে ব্যবহৃত বিখ্যাত গান ‘ওরে নীল দরিয়া’তেও এই স্টিমারের মনোরম চিত্র ফুটে উঠেছে।