দুই শতাব্দী কি ছুঁতে পারবে পুরান ঢাকার নবাবী আমলের টমটম?

​১৮৩০ সালে পুরান ঢাকায় যখন ঘোড়ার গাড়ির প্রথম প্রচলন শুরু হয়, তখন এটি ছিল আভিজাত্য এবং ব্যবসার প্রতীক।

একটি ঘোড়ার গাড়ির শৌল্পিক সৌন্দর্য
একটি ঘোড়ার গাড়ির শৌল্পিক সৌন্দর্য |নয়া দিগন্ত

ইব্রাহীম খলিল

ঢাকা শহরের নাম বলতেই চোখে ভাসে বড় বড় অট্টালিকা, দ্রুত ছুটে চলা এক মহানগরীর চিত্র। কিন্তু যানজট আর কংক্রিটের এই ভিড়েও পুরান ঢাকার বুকে কান পাতলে শোনা যায় এক ভিন্ন সুর। ঘোড়ার ক্ষুরের সেই চিরচেনা ’টগবগ টগবগ‘ শব্দ। এই শব্দ আমাদের মনে করিয়ে দেয় ঐতিহ্যবাহী টমটম গাড়ি বা ঘোড়ার গাড়ির কথা, যা কালের সীমানা পেরিয়ে আজও ইতিহাস ও বর্তমানের মাঝে এক সেতু রচনা করে চলেছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ​১৮৩০ সালে পুরান ঢাকায় যখন ঘোড়ার গাড়ির প্রথম প্রচলন শুরু হয়, তখন এটি ছিল আভিজাত্য এবং ব্যবসার প্রতীক। জমিদারি বাহন হিসেবে এর কদর যেমন ছিল, তেমনি আর্মেনীয় ব্যবসায়ীরা মালপত্র টানার কাজে এটিকে ব্যবহার করতেন। নবাবী শাসনামলের স্মৃতি বুকে ধারণ করে, এই বাহনটি একসময় ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। সেই স্বর্ণযুগে সদরঘাট-গুলিস্তান রুটে শতাধিক টমটম চলত, যা ছিল পুরান ঢাকার সোনালী অতীত।

আজ সেই জৌলুশ অনেকটাই ম্লান। আধুনিক যানবাহনের আধিক্য, অসহনীয় যানজট এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ঘোড়া লালন-পালন ও রক্ষণাবেক্ষণের আকাশছোঁয়া খরচ। কোচোয়ান ও হেল্পাররা জানান, আগে যেখানে দৈনিক ঘোড়ার পেছনে ৪০০ টাকার মতো খরচ হতো, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০০-১০০০ টাকায়। অন্যদিকে, যাত্রী কমে যাওয়ায় দৈনিক ট্রিপ সংখ্যা ৫-৭টি থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৩-৪টিতে।

প্রতিদিনের চিত্র হলো পুরান ঢাকার বাংলাবাজার মোড় থেকে গুলিস্তান যাওয়ার জন্য যাত্রীদের ডাকছেন কোচোয়ান ও হেল্পাররা। তবে দীর্ঘক্ষণ হাঁক-ডাকের পর যাত্রীদের তেমন সাড়া পাচ্ছেন না তারা। সদরঘাট-গুলিস্তান যাওয়ার ভাড়া ৩০ টাকা। প্রতিটি ঘোড়ার গাড়িতে মোট ১৫টি আসন থাকলেও ৫-৭ জন হলেই গুলিস্তানের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে গাড়িগুলো। এতে করে দিনশেষে খুব কম টাকায় ওঠছে পকেটে। অনেকে আবার যাত্রী না পেয়ে গাড়ির ভেতরেই বিশ্রাম নিচ্ছেন। একই চিত্র গুলিস্তান থেকে সদরঘাটে আসার ক্ষেত্রেও। ঘোড়ার গাড়িতে চড়া যাত্রীদের মধ্যে অধিকাংশই মধ্যবয়সী ও বয়স্ক। তরুণদের উপস্থিতি তেমন লক্ষ্য করা যায়নি। যারা এসব গাড়িতে ওঠেন তারা কেবল যাতায়াতের জন্য নয়, বরং পুরনো ঢাকার প্রতি প্রবল এক আকর্ষণে এত চড়েন।

সদরঘাট-গুলিস্তান রুটে ২২-২৭টি টমটম এখনো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে।

টমটমের কোচোয়ান সিদ্দিক মিয়া বলেন, ‘এখন যাত্রী পেতে লড়াই করতে হয়। আগে সিরিয়াল অনুযায়ী গাড়ি চলতো, এখন যে যখন পারছে যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে। দিনশেষে মালিকের জমার টাকা ঠিকই দিতে হয়, কিন্তু আমরা নামমাত্র মজুরি পাই। এই ২০০-৩০০ টাকায় জীবিকা চালানো কঠিন।‘

এত প্রতিকূলতা তবুও কোনো এক অদৃশ্য মায়া এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে নবাবী আমলের স্মৃতিময় টমটমকে। টমটমের অস্তিত্ব ধরে রাখার শক্তি শুধু এই শহরের মানুষের ভালোবাসা।

আবুল কাশেম নামের পুরান ঢাকার এক বাসিন্দা বলেন, ’একসময় ঘোড়ার গাড়িই ছিল একমাত্র ভরসা। এখন বাস দ্রুত চলে যায়। তবুও আমি মাঝে-মধ্যেই ঘোড়ার গাড়িতে চড়ি। এটা আমাদের ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে।‘

প্রতিদিনের খরচ আর আয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাওয়া কোচোয়ানদের মতে, এই ঐতিহ্যের বাহনটির ভবিষ্যৎ এখন সংকটে। বংশ পরম্পরায় এই পেশাকে ধরে রাখা মানুষগুলো শঙ্কিত, হয়তো অচিরেই তাদের প্রিয় এই টমটম চিরতরে হারিয়ে যাবে।

তাই তাদের সম্মিলিত দাবি, ঘোড়ার পরিচর্যার খরচ কমাতে সরকারি সহায়তা এবং এই সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে প্রণোদনা দেয়া হোক।