​সমুদ্রের ৩৮ মিটার গভীরে দানবীয় চাপ জয়

বিশ্বের সবচেয়ে চওড়া সুড়ঙ্গের প্রকৌশল অলৌকিকতা

​প্রতি বর্গমিটারে ৪০ টন পানির আছাড় আর ভূমিকম্প সামলে সমুদ্রের তলদেশে গড়ে তোলা হয়েছে চীনের ৮-লেনের শেনজেন-ঝংশান সুড়ঙ্গ।

নয়া দিগন্ত ডিজিটাল
চীনের ৮-লেনের শেনজেন-ঝংশান সুড়ঙ্গ
চীনের ৮-লেনের শেনজেন-ঝংশান সুড়ঙ্গ |সংগৃহীত
  • মোহাম্মদ ফাহাদ

​নীল জলরাশির ৩৮ মিটার গভীরে শান্ত হয়ে শুয়ে আছে এক প্রকৌশল বিস্ময়। মাথার ওপর গহীন সমুদ্রের কোটি কোটি লিটার পানি ক্রমাগত তৈরি করছে এক অকল্পনীয় ও পিষে ফেলার মতো চাপ। প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ৪০ টনের এই বিশাল হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ যেখানে যেকোনো সাধারণ কাঠামোকে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে সক্ষম, ঠিক সেখানেই ৮ লেন জুড়ে নিশ্চিন্তে ছুটে চলেছে হাজার হাজার যানবাহন। এটি কোনো বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর দৃশ্য নয়; এটি চীনের পার্ল রিভার এস্টুয়ারির তলদেশে নির্মিত 'শেনজেন-ঝংশান লিংক টানেল'।

​দানবীয় জলচাপ ও প্রসারণের অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ

​প্রকৌশলবিদ্যার ইতিহাসে সমুদ্রের নিচে সুড়ঙ্গ নির্মাণ নতুন কিছু নয়। কিন্তু শেনজেন-ঝংশান সুড়ঙ্গটির চ্যালেঞ্জ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। একে তো এটি বিশ্বের সবচেয়ে চওড়া নিমজ্জিত সুড়ঙ্গ (Immersed Tube Tunnel)—যার ভেতরে দুই পাশে ৪টি করে মোট ৮টি সুবিশাল লেন রয়েছে—তার ওপর এর অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৩৯ মিটার গভীরে।

​টানেল যত বেশি চওড়া হয়, তার ছাদ ও দেওয়ালের ওপর নেমে আসা বাহ্যিক পানির চাপ এবং গঠনগত উত্তেজনা (structural stress) বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। সুড়ঙ্গটির চওড়া অবয়ব জুড়ে প্রতি মুহূর্তে যে পরিমাণ জলচাপ কার্যকর থাকে, তা প্রতিরোধ করতে প্রয়োজন ছিল একদম নতুন যুগের নকশা ও বস্তুগত শক্তিমত্তা।

​চাপ সহ্যক্ষমতার সহজ তুলনা: শেনজেন-ঝংশান বনাম কর্নফুলী টানেল

​সহজ ভাষায় বলতে গেলে, চীনের শেনজেন-ঝংশান সুড়ঙ্গটির প্রতিটি বর্গমিটার এলাকাকে প্রতি মুহূর্তে সমুদ্রের প্রায় ৪০ টন ভারী পানির চাপ সামলাতে হয়।

​তুলনামূলকভাবে, বাংলাদেশের একমাত্র কর্ণফুলী টানেল নদী ও সমুদ্রের মোহনায় পানির তলদেশের মাটিতে আরও গভীরে (প্রায় ৪২.৮ মিটার) অবস্থিত হওয়ায় এর ওপর জলপ্রবাহ ও পলির সম্মিলিত চাপ আরও বেশি। বঙ্গবন্ধু টানেলের রিং কাঠামোটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা ৮ বার (Bar) প্রমিত চাপ অর্থাৎ প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ৮০ টন পর্যন্ত উচ্চ চাপ অনায়াসে সহ্য করতে সক্ষম।

​যে প্রযুক্তিতে মাথা নোয়ায় সমুদ্র: ডাবল-শেল স্টিল-কনক্রিট স্যান্ডউইচ

​দানবীয় এই জলচাপ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুড়ঙ্গটিকে রক্ষা করতে চীনা প্রকৌশলীরা ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত উন্নত ‘ডাবল-শেল স্টিল-কনক্রিট স্যান্ডউইচ স্ট্রাকচার’ (Double-shell Steel-Concrete Composite Structure) প্রযুক্তি।

​ঐতিহ্যবাহী কেবল কনক্রিট বা ইস্পাতের কাঠামোর বদলে এখানে একটি বিশেষ ট্রিপল-লেয়ারের প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল তৈরি করা হয়েছে। এতে ভেতরে ও বাইরে থাকে পুরু ইস্পাতের (Steel) দুটি শক্তিশালী স্তর এবং তাদের ঠিক মাঝখানে উচ্চ-ঘনত্বের স্ব-সংকুচিত কনক্রিট (Self-Consolidating Concrete) ইনজেক্ট করে ঢালাই করা হয়েছে।

​প্রকৌশলগত প্রতিরক্ষার তিন চাবিকাঠি

​ইস্পাত-কনক্রিট স্যান্ডউইচ: ইস্পাতের নমনীয়তা এবং কনক্রিটের সহনশীলতা মিলে এটি এমন এক নজিরবিহীন মজবুতি দেয়, যা অতি উচ্চ চাপেও মচকে যায় না কিন্তু ফেটেও পড়ে না।

​ফ্লেক্সিবল জিডিআই জয়েন্ট: ৩২টি বিশালাকার টিউব ব্লক যুক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বিশেষ নমনীয় 'জিডিআই জয়েন্ট'। যা পানির তীব্র চাপের মধ্যেও সম্পূর্ণ ওয়াটারপ্রুফ থাকে এবং ভূমিকম্পের সময় মৃদু কেঁপে উঠে ভেতরের শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।

​টাইফুন ও ভূকম্পন প্রতিরোধী নকশা: ৮.০ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্প এবং ক্যাটাগরি-৫ মাত্রার টাইফুনের ফলে সৃষ্ট বিশাল সামুদ্রিক ঢেউয়ের প্রভাব সহ্য করার মতো সুনির্দিষ্ট ডাইনামিক ডিজাইন।

​একটি সুবিশাল সুরক্ষাবলয়

​প্রায় ৬.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সাব-সি টানেল অংশটি তৈরিতে ৩২টি বিশালাকার 'স্টিলি-কনক্রিট' টিউব ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে। ডাঙায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করার পর প্রতিটি ব্লক সমুদ্রে ভাসিয়ে এনে জিপিএস এবং বিশেষ সোনার ট্র্যাকিং প্রযুক্তির সাহায্যে ইঞ্চি-বাই-ইঞ্চি হিসাব করে পানির গভীরে বসানো হয়েছে।

​টানেলটির সুবিশাল চওড়া পরিসরে চলাচলের সময় চালকদের যাতে মানসিক চাপ বা ক্লান্তি না আসে, সে জন্য এর আধুনিক ইন্টেরিয়রে ব্যবহার করা হয়েছে স্মার্ট এলইডি ইলুমিনেশন এবং উন্নত অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা।

​শেনজেন-ঝংশান লিঙ্ক কেবল দুটি শহরের দূরত্বকে দুই ঘণ্টা থেকে ৩০ মিনিটে নামিয়ে আনেনি; বরং সমুদ্রের গভীরতম তলদেশে প্রকৃতির নির্মম চাপকে জয় করে প্রকৌশলবিদ্যায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।
লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।