নৌকা চালিয়ে সংসার চালানো দায় বুড়িগঙ্গার মাঝিদের

শুধু সালাম মাঝিই নন, সদরঘাটের বেশ কয়েকজন মাঝি তাদের প্রচণ্ড আর্থিক টানাপোড়েন আর দুর্বিষহ জীবনযাপনের কথা জানিয়েছেন।

বুড়িগঙ্গার পাড়ে রাখা কয়েকটি ডিঙ্গি নৌকা
বুড়িগঙ্গার পাড়ে রাখা কয়েকটি ডিঙ্গি নৌকা |নয়া দিগন্ত

ইব্রাহীম খলিল

পুরান ঢাকার সদরঘাটে বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রায় ৪০ বছর ধরে নৌকা চালিয়ে আসছেন সালাম মাঝি। বয়স সত্তরের কোঠায়। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে থাকেন কেরানীগঞ্জের খেজুরবাগে। পদ্মার করালগ্রাসে ভিটে-মাটি হারিয়ে জীবনের শেষ অবলম্বন হিসেবে হাতে তুলে নিয়েছিলেন বৈঠা। একসময় ভালোভাবে চললেও এখন আর চলছে না সংসার। সারাদিনের আয়ের বেশির ভাগই চলে যায় বাজারের দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতির যাঁতাকলে আর ঘাট মালিকের কাছে। তাই তিন ছেলে-মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে তার জীবন এখন দুর্বিষহ।

সালাম মাঝি বলেন, ‘পদ্মার ভাঙ্গনে সর্বস্বান্ত হয়ে নিজের জীবনের বেঁচে থাকার সম্বল হিসেবে বুড়িগঙ্গার নৌকাকে আপন করে নিয়েছিলাম। আগে কোনোমতে চললেও এখন নৌকার আয় দিয়ে আর সংসার চলছে না। সবাই ব্রিজ দিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যায়। আমাদের আয় কমে গেছে। সারাদিন নৌকা চালিয়ে অবশিষ্ট থাকে ৩০০-৪০০ টাকা। এই স্বল্প আয় দিয়ে পাঁচজনের সংসারে প্রতিদিন খাবার জোটে না। জিনিসপত্রের যে দাম তাতে চলা মুশকিল।‘

শুধু সালাম মাঝিই নন, সদরঘাটের বেশ কয়েকজন মাঝি তাদের প্রচণ্ড আর্থিক টানাপোড়েন আর দুর্বিষহ জীবনযাপনের কথা জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাবুবাজার ব্রিজ থেকে পোস্তগোলা ব্রিজ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘাটে প্রায় এক হাজার নৌকা চলাচল করে। এই নৌকা চালিয়ে জীবনধারণ করে দুই হাজরেরও বেশি লোক। যাত্রীপ্রতি ভাড়া নেয়া হয় ১০ টাকা। তবে ঘাটবিশেষে তা কম-বেশি হয়। নৌকা চালিয়ে একজন মাঝি দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। সেই আয় থেকে দিনে ঘাট ভাড়া চলে যায় ১০০ টাকা। নৌকা ভাড়া দিতে হয় ১০০ টাকা। চা, নাস্তা-বিড়ি ও দুপুরের খাবার মিলিয়ে খরচ ২৫০ টাকা। তাছাড়াও রয়েছে ঊর্ধ্বমুখী বাসা ভাড়া ও সংসার খরচ। এভাবে চলে যায় সারাদিনের আয়।

আফসোস করে শ্যামবাজার ঘাটের মাঝি করিম মিয়া বলেন, ’ঘাটে নৌকা নামালেই ইজারাদারকে ১০০ টাকা দিতে হয়। খ্যাপ হোক বা না হোক।‘

সরেজমিনে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীর দু’পাড়ে সারি সারি নৌকা বাঁধা আর মাঝিরা তাকিয়ে আছে যাত্রীর জন্য। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো যাত্রীর দেখা না পেয়ে হতাশ একজন মাঝি বলেন, ’ওই পাড় থেকে এই পাড়ে আসতে এক ঘণ্টা লেগেছে। কতক্ষণ পর ওই পাড়ে আবার যেতে পারব জানি না।‘

এদিকে, যন্ত্রচালিত নৌকার কারণে আরো বেশি বেকায়দায় পড়েছে মাঝিরা। এতে তাদের যাত্রী আরো কমে গেছে। একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট অবৈধভাবে যন্ত্রচালিত নৌকা নামিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, মাঝিরা নৌকার মালিকদের কাছে অসহায়। কোনো মাঝি চাইলেই নিজে নৌকা কিনতে পারেন না। একজন লোকের ৩০ থেকে ৪০টি পর্যন্ত ভাড়ায় চালিত নৌকা আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন মাঝি বলেন, ‘যন্ত্রচালিত নৌকাগুলো আমাদের নৌকায় ধাক্কা দেয়। এতে যাত্রীদের গায়ে ময়লা পানি পড়ে। প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকি দেয়।’

ঘাটের মাঝিরা জানান, নৌকা চালিয়ে তারা এখন ভালো নেই। পদ্মা সেতু হওয়ার পর লঞ্চঘাটে যাত্রী কমে গেছে। এখন নদীর দুই পাড়ের মার্কেট ও স্থানীয় লোকজনই শুধু আসা যাওয়া করে। শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে যাত্রী আরো কমে যায়।

শরীয়তপুর থেকে আসা মাঝবয়সী খালেক ব্যাপারী বলেন, ‘স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি। সারাদিন বৈঠা চালিয়ে ৩০০-৪০০ টাকা আয় করলেও এতে প্রতিদিন দু’বেলার খাবারও জোটে না।‘

ঢাকা নৌকা মাঝি বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মো: ইমতাজুল হক মিন্টু বলেন, ’মাঝিরা অনেক কষ্টে আছে। তাদের কষ্ট কেউ বুঝে না। সরকার থেকে কিছু পরিমাণ ভাতার ব্যবস্থা করা গেলে হয়তোবা তাদের কষ্ট কিছুটা লাগব করা যেত।‘

ঢাকা নদীবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, সদরঘাটের চলাচল করা সব লঞ্চ তাদের নিয়ন্ত্রাধীন। তবে, ইঞ্জিনচালিত নৌকার কোনো অনুমোদন নেই।‘