মৃত্যুর ৩০ বছর পরেও সালমান শাহকে ঘিরে কেন এত কৌতুহল

ক্যারিয়ারের ওই স্বল্প সময়ের মধ্যেই দর্শকদের মনে ক্ষণজন্মা এই নায়ক এমনভাবে জায়গা করে নেন যে, মৃত্যুর তিন দশক পরও অনেকে তাকে ভুলতে পারেননি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সালমান শাহ
সালমান শাহ |সংগৃহীত

‘আমার জীবনের একটা বড় আফসোসের জায়গা হলো সালমান শাহকে নিজের চোখে দেখতে না পারা। উনি বেঁচে থাকলে অবশ্যই গিয়ে দেখা করতাম। এতটা ভালো লাগে সালমান শাহকে,’ বলছিলেন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা জামান ইষ্টি।

ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা ইষ্টির যখন জন্ম হয়, তার প্রায় অর্ধ যুগ আগে মৃত্যু হয়েছে নব্বই দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ। তাহলে তার প্রতি এই ভালো লাগা কিভাবে জন্ম নিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীর।

ইষ্টি বলেন, ‘আসলে আমার মা-বাবা দু’জনই সালমান শাহের ফ্যান (ভক্ত)। ফলে ছোটবেলায় তাদের কাছ থেকেই সালমান শাহ সম্পর্কে জানতে পারি। অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে তার যে সাফল্য, তারপর হঠাৎ রহস্যজনক মৃত্যু- এগুলো আমাকে পরবর্তীতে আগ্রহী করে তোলে।’

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিছা নূজহাতের অবশ্য নায়ক সালমন শাহকে ভালো লাগে অন্য কারণে।

নূজাহাতের কথায়, ‘উনাকে ভালো লাগে, কারণ উনি বাংলা সিনেমার অন্য নায়ক-নায়িকাদের মতো না। বেশ ব্যতিক্রম এবং উনার সবকিছুই খুবই আইকনিক। অভিনয় বলেন বা ফ্যাশন সেন্স, সবক্ষেত্রেই উনি টু-স্টেপ এহেড (দু’কদম এগিয়ে) ছিলেন অন্যদের চেয়ে। বলা যায়, জেনারেশনের আইকন টাইপের (প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব)। যে কারণে উনার ফ্যাশন, সিনেমা, গান এখনও জনপ্রিয়।’

‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমায় অভিনয় করে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে রাতারাতি তারকা বনে যান সালমান শাহ। এর বছর চারেকের মাথায় চলচ্চিত্রটির শেষ দৃশ্যের মতোই তারও মৃত্যু হলো।

কিন্তু ক্যারিয়ারের ওই স্বল্প সময়ের মধ্যেই দর্শকদের মনে ক্ষণজন্মা এই নায়ক এমনভাবে জায়গা করে নেন যে, মৃত্যুর তিন দশক পরও অনেকে তাকে ভুলতে পারেননি।

সিলেটের হযরত শাহজালালের দরগাহ-সংলগ্ন যে কবরস্থানে তাকে সমাধিস্থ করা হয়েছে, সেখানে এখনো অনেক ভক্তকে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

তেমনই একজন ভক্ত জানান, সালমান শাহের কবর দেখার জন্য তিনি প্রায় সাড়ে তিন শ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি জামালপুর থেকে আসছি। উনাকে অনেক ভালো লাগে। এজন্য মাজারে এসে তার কবর জিয়ারত করলাম।’

মৃত্যুর ৩০ বছর পরও সালমান শাহকে নিয়ে এখনো যে আলোচনা ও কৌতুহল বাংলাদেশের মানুষের দেখা যাচ্ছে, সেটি ‘খুবই বিরল’ বলে জানাচ্ছেন চলচ্চিত্র সমালোচকরা।

‘সালমান শাহের যেমন একটা ক্রেডি ফ্যানডম তৈরি হয়েছে, এটা কিন্তু অন্য নায়কদের ক্ষেত্রে হয়নি। তার ফ্যাশন, অভ্যাস-বদভ্যাস- এগুলোকে দর্শকরা এখনো ধারণ করে তাকে অনুসরণ করছে, এটা আমাদের দেশের বাস্তবতায় খুবই বিরল,’ বলছিলেন চলচ্চিত্র গবেষক, নির্মাতা ও অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন রাজু।

দর্শক, পরিচালক এবং চলচ্চিত্র সমালোচকদের সাথে কথা বলে জানা যাচ্ছে, সালমান শাহের সাবলীল অভিনয়, চাল-চলন এবং পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে তরুণদের মধ্যে এখনো এক ধরনের আগ্রহ আছে। এর বাইরে, মৃত্যু রহস্য ঘিরেও তাকে নিয়ে অনেকের মধ্যে বাড়তি কৌতুহল তৈরি হয়েছে।

স্কুলে কেটে দেয়া নামেই হয়ে ওঠেন বিখ্যাত

সিলেটের হযরত শাহজালালের দরগাহ-সংলগ্ন কবরস্থান থেকে দুই কিলোমিটারের মতো দূরে দাড়িয়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত সালমান শাহ ভবন, যেটি মূলত সালমানের নানাবাড়ি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই বাড়িতেই জন্ম হয়েছিল সালমান শাহের।

আদর করে মা-বাবা তার নাম রাখেন চৌধুরী মোহাম্মদ সালমান শাহরিয়ার, ডাকনাম রাখা হয় ইমন।

বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। ইমনের জন্মের কয়েক বছরের মধ্যেই তার পোস্টিং হয় কুমিল্লায়। পরে সেখানকার একটি স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু হয় ইমনের। কিন্তু স্কুলে ভর্তির সময় তার লম্বা নাম নিয়ে দেখা দেয় বিপত্তি।

শিক্ষকরা জানান, ভর্তি করতে হলে নাম ছোট করতে হবে।

‘তখন স্কুলে সালমানটা বাদ দিয়ে চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার রাখা হয়,’ বলছিলেন সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী।

শিক্ষকদের পরামর্শে ইমনের পরিবার যখন তার নাম থেকে ‘সালমান’ শব্দটি বাদ দিচ্ছিল, তখন তারা ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি যে, বড় হওয়ার পর তাদের ছেলে ঢাকাই চলচ্চিত্রে নাম লেখাবেন এবং স্কুলে ফেলে দেয়া নামেই সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠবেন।

‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তির আগে সিনেমাটির পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তার সালমান নামটা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখেন।

নীলা চৌধুরী বলেন, ‘সোহান তখন বলতেছিল, আন্টি ওর নামটা তো পাল্টাতে হবে। আমি সালমান খান রেখে দিই। আমি বললাম, সালমান তো তার নামের সাথেই আছে... সেটা রাখা যাবে। কিন্তু সালমান খান তো একজন আছে। তুমি বরং সালমান চৌধুরী রাখো।’

কিন্তু পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান সেই প্রস্তারে রাজি না হওয়ায় একপর্যায়ে সালমানের সাথে ‘শাহ’ যুক্ত করা হয়।

নীলা চৌধুরী বলেন, ‘ও যখন রাজি হলো না তখন আমি একটু সময় চেয়ে নিলাম। সেসময় অভিনেতা নাসিরুদ্দীন শাহেরর আমি খুব ভক্ত ছিলাম। আমার আমার ছেলের নামের সাথে শাহরিয়ার আছে। তখন আমি বললাম, শাহরিয়ারের ‘শাহ’ রাখো, ‘রিয়ার’ বাদ দিয়ে দাও। তাহলো হলো- সালমান শাহ।’

চিত্রনায়ক হয়ে ওঠা

ছোটবেলা থেকে একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠেন সালমান শাহ। তার নানা কামরুজ্জামান বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশে’ অভিনেতা করেছিলেন। অভিনয় জগতে পা রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার কথা বিভিন্ন সময় সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন সালমান শাহ।

তবে তার মা নীলা চৌধুরীও একসময় নিয়মিতভাবেই রেডিও এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠানে গান গাইতেন। তার হাত ধরেই গত শতাব্দীর আশির দশকের শুরুর দিকে টিভি পর্দায় অভিষেক হয় সালমান শাহের।

শুরুটা হয়েছিল শিশু শিল্পী হিসেবে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিটিভির একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের গানে মডেল হন সালমান। তার মা সেখানে অভিনয় করেছিলেন।

পরবর্তীতে সালমান শাহ বিটিভির তালিকাভুক্ত শিল্পী হয়ে ওঠেন এবং একাধিক টিভি নাটকে অভিনয় করেন। সেসময় বেশকিছু বিজ্ঞাপনচিত্রেরও মডেল হয়েছিলেন সালমান।

সালমান শাহের ভাষ্যমতে, নাটক ও বিজ্ঞাপন তিনি অভিনয় শুরু করেন শখের বসে। কিন্তু এর মধ্যেই হঠাৎ একদিন সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়ে যান। প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন তৎকালীন সময়ের খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির।

আশির দশকের শেষদিকে তিনি ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাস অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। সেখানে রইস চরিত্রে অভিনয় করছিলেন সালমান শাহ। কিন্তু সিনেমাটির কাজ শেষ হওয়ার আগেই ১৯৮৯ সালে এক দুর্ঘটনায় আলমগীর কবির মারা যান। ফলে চলচ্চিত্রটিও পরবর্তীতে আর আলোর মুখ দেখেনি।

এসব ঘটনা যখন ঘটছে, মুক্তির পর ততদিনে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেয়ে গেছে বলিউডের সিনেমা ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’। সেই সাফল্য দেখে অনুমোদন নিয়ে ছবিটি রিমেক বা পুনঃনির্মাণ করার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেড। বাংলা নাম দেয়া হয় ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’।

সিনেমায় নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য তখন নতুন মুখ খুঁজছিলেন পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান। ১৯৯২ সালে একদিন অনেকটাই আকস্মিকভাবেই তার কাছ থেকে প্রস্তাব পান সালমান শাহ।

১৯৯৩ সালে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন সালমান শাহ বলেন, ‘একদিন দুপুরে উনি ফোন দিলেন। তারপর আমরা দু’জন বসলাম একসাথে এবং কথা বললাম। এর মধ্যে উনি প্রপোজাল দিলেন যে আমি বোম্বের ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তকে’র বাংলা করছি। আপনি যদি এটা করেন, আমি খুব খুশি হবো।’

সালমান শাহ রাজি থাকলেও প্রথমদিকে সম্মতি ছিল না তার বাবা-মায়ের। ছেলের আগ্রহ দেখে পরে তারাও রাজি হন।

১৯৯৩ সালের মার্চে মুক্তির পর ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ঢালিউড বক্স অফিসেও ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি রাতারাতি তারকা বনে যাওয়া সালমান শাহকে। চার বছরের ছোট্ট ক্যারিয়ারে তিনি একে একে অভিনয় করেন ২৭টি চলচ্চিত্রে, যেগুলোর বেশিভাগই ছিল সুপার হিট।

হঠাৎ মৃত্যু

একের পর এক ব্যবসা সফল সিনেমা দ্রুতই সালমান শাহকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। এরপর ১৯৯৬ সালের এক সকালে আকস্মিকভাবেই নিভে যায় সালমান শাহের জীবন প্রদীপ।

তিনি তখন স্ত্রী সামিরা হককে নিয়ে ঢাকার নিউ ইস্কাটন এলাকার একটি ভবনের ১১ তলার ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন। আর তার মা-বাবা এবং ভাই থাকতো সেখান থেকে দুই কিলোমিটারের মতো দূরে ঢাকার গ্রিনরোড এলাকায়।

দিনটি ছিল ৬ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার। ওইদিন সকালে বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ছেলের সাথে দেখা করতে তার ইস্কাটনের বাসায় যান। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরও সালমানের দেখা না পেয়ে ঢাকার গ্রিনরোডের বাসায় ফিরে যান তিনি।

ঘড়ির কাটায় তখন সময় প্রায় বেলা ১১টা। সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী সবেমাত্র নাস্তা করতে বসেছেন। এমন সময় হঠাৎ বেজে ওঠে টেলিফোন। বলা হয়, যত দ্রুত সম্ভব, সালমানের ইস্কাটনের বাসায় চলে যেতে। টেলিফোন রেখেই স্বামীর সাথে দ্রুত সেদিকে রওনা হন নীলা চৌধুরী।

নীলা চৌধুরী বলেন, ‘ইস্কাটন রোডে ওর বাসার সামনে গিয়ে দেখি নিচে প্রচুর লোকের ভিড়। সবাই খালি ওপরের দিকে তাকায় আছে।’

এরপর সেখান থেকে লিফটে করে সালমান শাহের ১১ তলার ফ্ল্যাটে যান মা-বাবা ও ছোট ভাই। শোবার ঘরে ঢুকে তারা দেখেন, সালমান শাহ খাটের ওপর পড়ে আছেন এবং বাড়ির কয়েকজন কর্মচারী তার দুই হাতে তেল মালিশ করছেন।

নীলা চৌধুরী বলেন, ‘আমি তো ভাবছি, ফিট হয়ে গেছে। তখন সে হাফপ্যান্ট পরা ছিল। পায়ের দিকে গিয়ে দেখি, নখগুলো নীল হয়ে গেছে। শরীর কিন্তু ঠান্ডা না। এরপর হাতের নখ এবং ঠোট দেখি। সেটাও প্রায় অর্ধেক নীল। তখন আমি বলছি, আল্লাহ, ফিট হয়ে আছে এতক্ষণ ধরে, মরে যাচ্ছে তো!’

মৃত্যু ঘিরে সন্দেহ

সেদিন দুপুরের আগেই ইস্কাটনের ফ্ল্যাট থেকে সালমান শাহকে প্রথমে পাশ্ববর্তী হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে, তারপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

নীলা চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকা মেডিক্যালে নেয়ার পর ডাক্তার বলে যে উনি তো অনেকক্ষণ আগে মারা গেছে। তখন আমি ইমনের বাবাকে বলছি যে, চলো, আমরা ওকে নিয়ে সিএমএইচে যায়। তখন ঢাকা মেডিক্যালের ডাক্তাররা বললো যে না, আপনি তো লাশ নিতে পারবেন না... ম্যাজিস্ট্রেটের পারমিশন ছাড়া।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে সালমান শাহের লাশ নেয়া হয় তার কর্মস্থল চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বা এফডিসিতে। ভক্ত ও সহকর্মীদের অনেকে শুরুতে মৃত্যুর খবরটি বিশ্বাস করতে পারেননি।

সালমান শাহের একটি চলচ্চিত্রের পরিচালক জাকির হোসেন রাজু বলেন, ‘এ রকম একটা ইয়াং ছেলে, যে তখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, সে মারা যাবে এটা বিশ্বাস করা কঠিন। আমি নিজেই শুরুতে বিশ্বাস করতে পারিনি।’

মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ায় সেদিন প্রিয় নায়ককে শেষবার দেখার জন্য এফডিসিতে সহকর্মীদের পাশাপাশি অসংখ্য ভক্তও ভিড় করেছিলেন।

তার আরেকটি ছবির পরিচালক ড. মতিন রহমান বলেন, ‘খবর পেয়ে আমি দ্রুত গাড়িতে করে চলে আসলাম, কিন্তু ওর মুখটা দেখতে পারিনি। এত ভিড় ছিল।’

এফডিসিতে প্রথম দফা জানাজা শেষে সালমানের স্বজনরা তার লাশ দাফনের জন্য নিয়ে যান সিলেটে। সেখানে আরেক দফা জানাজা পড়ানো হয়, এরপর সালমান শাহকে দাফন করা হয় হযরত শাহজালালের মাজার-সংলগ্ন কবরস্থানে।

সালমান শাহ যখন মারা যান, তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ২৫ বছর। তার মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না পরিবারের সদস্যরা। যদিও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ময়নাতদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছিল, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু তার লাশ দেখার পর সন্দেহ জাগে স্বজনদের মনে।

তার মামা আলমগীর কুমকুম বলেন, ‘বাড়িতে আনার পর আমি এবং আমার ছোট ভাই ওর পুরো বডিটা একবার দেখি এবং সেটার পর আমাদের মনে অনেক সন্দেহের দানা বাঁধে। ওর ফ্ল্যাটে যে ফ্যানে ফাঁস দিছে বলে বলা হয়েছে, সেখানে রশি যেটা ঝুলানো ছিল, সেটা এত বড় এবং মোটা। কিন্তু ওর গলার দাগ ছিল চিকন। আবার শাবনূর ওরে একটা টেবিল ফ্যান দিছিলো, সেটা পাওয়া গেছে বাসার নিচে ডাস্টবিনে। সেটার তার মিলিয়ে দেখছি যে, ওই তার আর (সালমান শাহ) গলার দাগ সমান।’

দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত

সালমান শাহ মারা যাওয়ার পরপরই ঢাকার রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেছিলেন তার বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী। মৃত্যু ঘিরে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় পরবর্তীতে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করার আবেদন করেন তিনি।

সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সালমানের মৃত্যু রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব দেয়া হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডিকে। দাফনের সপ্তাহখানেক পর কবর থেকে সালমানের লাশ তুলে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

সেখানে যে তিন সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড ময়নাতদন্ত করেছিল, সেটির প্রধান ছিলেন ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা: নারগিস বাহার চৌধুরী।

২০২১ সালে তিনি মারা যান। তবে মৃত্যুর বছর নয় আগে আগে জানিয়েছিলেন, দ্বিতীয় ময়নাতদন্তেও তারা আত্মহত্যার আলামত পান।

ডা: নারগিস বাহার চৌধুরী বলেন, ‘লাশটা আমি দেখেছি মরচুয়েরিতে। আমার কাছে মনে হয়েছে যেন সদ্য সে মারা গেছে। এ রকম থাকলে তার মৃত্যুর কারণ যথাযথভাবে নির্ণয় করা যায়। আত্মহত্যার প্রত্যেকটা সাইন (চিহ্ন) সেখানে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ছিল। তার শরীরে আঘাতের কোনো নিশানা ছিল না।’

মৃত্যু রহস্যে নতুন মোড়

দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের মাস দশেকের মাথায় সালমান শাহ মৃত্যু রহস্য নতুন মোড় নেয়। ১৯৯৭ সালের ১৯ জুলাই রেজভী আহম্মেদ নামে ব্যক্তিকে পুলিশে দেয় সালমানের পরিবার। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, থানায় জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে রেজভী আহম্মেদ স্বীকার করেন যে তিনি সালমান শাহ হত্যার সাথে জড়িত।

পরে আদালতে তিনি যে জবাববন্দী দেন, সেখানে সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, সাবেক শাশুড়ি লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ বাহাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, বিউটিশিয়ান রাবেয়া সুলতানা রুবিসহ আরো বেশ কয়েক জনের নাম উঠে আসে।

যদিও পরবর্তীতে রেজভী আহম্মেদ নামের ওই ব্যক্তি সালমান হত্যার সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন।

এ ঘটনার কয়েক মাস পর দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের রিপোর্টসহ মামলার সার্বিক তদন্তকাজ শেষে ১৯৯৭ সালের নভেম্বরে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে সিআইডি। সেখানে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘আত্মহত্যা’র কথাই উল্লেখ করেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।

কিন্তু সালমান শাহের পরিবার সেটি প্রত্যাখ্যান করে নারাজি জানালে বিষয়টি পুনরায় তদন্তে ২০০৩ সালে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রায় ১১ বছর পর ২০১৪ সালে ওই কমিটি একটি রিপোর্ট জমা দেয়। সেখানেও মৃত্যুকে ‘অপমৃত্যু’ উল্লেখ করা হলে মামলার কার্যক্রম তখনকার মতো সেখানেই শেষ হয়ে যায়।

কিন্তু তাতে দমে যায়নি পরিবার। বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমানের মা দ্বিতীয় দফায় নারাজি আবেদন করলে বিষয়টি তদন্তের জন্য ২০১৬ সালে র‍্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাবকে নির্দেশ দেয় আদালত।

এর বছর দুয়েকের মাথায় মধ্যে অন্যতম একজন অভিযুক্ত, বিউটিশিয়ান রাবেয়া সুলতানা রুবি একটি বক্তব্য ঘিরে সালমান শাহের মৃত্যুর রহস্যটি আবারো আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী রুবি ২০১৭ সালে ফেসবুকে একটি ভিডিও বক্তব্যে দাবি করেন, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছিল। ওই হত্যাকাণ্ডের সাথে সালমানের স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন জড়িত বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এ নিয়ে তুমুল আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার একপর্যায়ে রুবি অবশ্য তার আগের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন।

পরে সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআইকে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে পিবিআই। সেখানে বলা হয়, সালমান শাহ আত্মহত্যাই করেছেন। কর্মকর্তারা দাবি করেন, মৃত্যুর আগে সালমান একটি সুইসাইড নোট লিখে গিয়েছিলেন, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।

কিন্তু পিবিআইয়ের এই তদন্ত প্রতিবেদনকেও প্রত্যাখ্যান করেন স্বজনরা।

২৯ বছর পর হত্যা মামলা

সালমানের পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে ঢাকার একটি আদালত মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা গ্রহণ করে সেটি পুনরায় তদন্তের জন্য পুলিশের প্রতি নির্দেশ দেয়।

এরপর গত অক্টোবরে সালমানের মামা আলমগীর কুমকুম ঢাকার রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। সেখানে অভিযুক্ত হিসেবে সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, সাবেক শাশুড়ি লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ বাহাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, বিউটিশিয়ান রাবেয়া সুলতানা রুবি এবং রেজভী আহম্মেদসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়।

অভিযুক্তদের মধ্যে যারা দেশে রয়েছেন, তদন্তকাজ চলাকালে তারা যেন দেশ ছাড়তে না পারেন, সেজন্য তাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গত ৯ আগস্ট অভিনেতা আশরাফুল হক ডন বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

মামলাটি এখন তদন্ত করছে সিআইডি।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো: ছুফি উল্লাহ বলেন, ‘এটি বহুল আলোচিত একটি মামলা। আগেও বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা এটা তদন্ত করে রিপোর্ট দিয়েছে এবং প্রতিবার বাদীপক্ষ থেকে নারাজি জানানো হয়েছে। ৩০ বছর ধরে এভাবেই চলছে। তো আমরা আমাদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে তদন্ত বজায় রেখেছি এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।’

অভিযুক্তরা কী বলছেন?

সালমান শাহের মৃত্যুর জন্য শুরু থেকেই সাবেক স্ত্রী সামিরা হককে দায়ী করে আসছেন নায়কের স্বজনরা। মৃত্যুর ২৯ বছরের মাথায় গতবছর যে হত্যা মামলাটি করা হয়েছে, সেখানেও এক নম্বর আসামি করা হয়েছে সামিরা হককে। বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য জানতে তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে ২০২৪ সালে স্থানীয় একটি গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন সামিরা হক।

তবে তিনি স্বীকার করেছেন, সালমান শাহেরর মৃত্যুর আগে মনোমালিন্য হয়েছিল, যার কেন্দ্রে ছিলেন নায়িকা শাবনূর। মৌসুমীর সাথে জুটিবদ্ধ হয়ে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখলেও পরবর্তীতে সালমান শাহের বেশিভাগ সিনেমায় নায়িকা ছিলেন শাবনূর।

সিনেমার পরিচালকদের ভাষায়, পর্দায় তাদের রসায়নও ছিল চমৎকার। কিন্তু একপর্যায়ে শাবনূরের সাথে প্রেম এবং বিয়ের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে সেটি ঘিরে অশান্তি দেখা দেয় সালমান-সামিরার সংসারে।

সামিরা বলেছিলেন, ‘তার (সালমান শাহ) সাথে আমার কিছু কথা ছিল। সে শাবনূর সাথে ছবি করতে পারবে না। যা যা ছবি ছিল, সেগুলো শেষ করবে। কারণে সেগুলোর টাকা নেয়া হয়ে গেছে। কিন্তু নতুন করে কোনো ছবি করবে না।’

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী নায়িকা শাবনূরের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সময় তিনি লিখেছেন, কাজের সম্পর্কের বাইরে সালমানের সাথে তার অন্য কোনো সম্পর্ক ছিল না।

এদিকে, সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া অভিনেতা ডনও অতীতে বিভিন্ন সময় সালমান শাহ হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, সালমান যেদিন মারা যান, সেদিন তিনি ঢাকার বাইরে ছিলেন।

অন্যদিকে, ২৯ বছর আগে গ্রেফতার হওয়ার পর আদালতের কাছে জবানবন্দী দিয়েছিলেন সালমান শাহ হত্যা মামলার আরেক অভিযুক্ত রেজভী আহম্মেদ। পরে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি বিদেশে চলে যান এবং বিভিন্ন সময় সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, সালমান শাহের মৃত্যুর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

২০২০ সালে স্থানীয় গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তখন আমার বয়স ১৫ বছর। তখন তো আমি নিজেও জানি না, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী জিনিসটা কী! তখন আমাকে যা বলা হয়েছে, আমি তাই করেছি।’

মামলার অন্য অভিযুক্তদের বেশিভাগই বর্তমানে হয় বিদেশে, না হয় আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে তাদেরও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অতীতে বিভিন্ন সময় সালমান শাহ হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছেন।

‘এখনো মিস করি’

সালমান শাহ'র চার বছরের চলচ্চিত্র জীবনে তার কোনো সিনেমাই লোকসানের মুখে পড়েনি। প্রযোজকদের কাছে তখন সালমান মানেই ছিল পয়সা উসুল। ফলে একটার পর একটা নতুন সিনেমায় নাম লেখাতে থাকেন তিনি। সালমান শাহ যখন মারা যায়, তখনো তার হাতে ডজনখানেক সিনেমা ছিল বলে জানা যায়।

এর মধ্যে হাফ ডজন ছবির শ্যুটিং চলমান ছিল। নায়কের হঠাৎ মৃত্যুতে ঝুঁকির মুখে পড়েন সিনেমাগুলোর প্রযোজক ও পরিচালকরা। যেসব সিনেমার অল্প কিছু শ্যুটিং বাকি ছিল, লোকসান ঠেকাতে সেগুলোর পরিচালকরা তখন সালমান শাহের মতো দেখতে কিছু তরুণকে ব্যবহার করে অসমাপ্ত সিনেমার কাজ সম্পন্ন করেন।

তবে যেসব সিনেমাগুলোর বড় অংশের শ্যুটিং বাকি ছিল, তারা পড়ে যান বেকায়দায়। কিছু সিনেমার কাজ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে আবার আগের সবকিছু বাতিল করে নতুন নায়ক দিয়ে শ্যুটিং করাতে বাধ্য হন পরিচালকরা।

চলচ্চিত্র পরিচালক ড. মতিন রহমান বলেন, ‘আমার একটা ছবির অর্ধেক শ্যুটিং বাকি ছিল। সালমান হঠাৎ মারা যাওয়ায় সেটা পুরোটা ফেলে দিতে হয়েছিল। এতে অনেক বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল।’

আরেক চলচ্চিত্র পরিচালক জাকির হোসেন রাজু বলছিলেন, সালমান শাহের আকস্মিক মৃত্যুতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল।

চলচ্চিত্র পরিচালক জাকির হোসেন রাজু বলেন, ‘প্রযোজক, পরিচালক থেকে শুরু করে শিল্পী, কলা-কুশলী- সবাই তখন ভেঙে পড়েছিল। কারণ সালমানের অভাব কাউকে দিয়ে পূরণ করা সম্ভব ছিল না। এমনকি এখনো কোনো ডানপিঠে বা রোমান্টিক চরিত্র লেখার সময় সালমানের কথা মনে পড়ে। এখনো তাকে মিস করি।’

জনপ্রিয় কেন?

মৃত্যুর আগে সালমান শাহের জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ভক্তদের অনেকেই তখন তার পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে হাটা-চলা, চুলের স্টাইল, এমনকি বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিও অনুকরণ করতে শুরু করেন।

মোস্তফা জামান নামের এক সালমান শাহ ভক্ত বলেন, ‘এমনকি আমি এখনো সালমান শাহের মতো ডাক হাতে ঘড়ি পরি এবং তার যেটা বদাভ্যাস ছিল দাঁত দিয়ে নখ কাটা, সেটাও আমার মধ্যে ঢুকে পড়েছে।’

ভক্তদের অনেকেই সালমান শাহের আকস্মিক মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি। মৃত্যুর খবর তরুণ কিছু দর্শকের মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে, প্রিয় নায়কের শোকে তারা আত্মহননের পথ বেছে নেন। কেউ কেউ আবার সিনেমা হলে যাওয়াও বন্ধ করে দেন বলে জানা যায়।

‘সালমান শাহ মারা যাওয়ার পর আমি আর হলে গিয়ে ছবি দেখিনি। এমনি সিনেমা দেখি ইউটিউবে। সেটাও সালমান শাহ’র ছবি,’ বলছিলেন হাবিবুর রহমান নামের এক সালমান শাহ ভক্ত।

বেঁচে থাকা অবস্থায় যারা সালমান শাহকে দেখেছেন, তাদের মধ্যে তো বটেই; এমনকি যাদের জন্ম হয়েছে সালমান শাহের মৃত্যুর পর, তাদের মধ্যেও বাংলা সিনেমার প্রয়াত এই নায়ককে ঘিরে আগ্রহ ও কৌতুহল লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস, ‘আমি আসলে বলবো যে উনি একটা ট্রেন্ড সেটার। ওই সময়ই তার যে ফ্যাশন সেন্স, যে অভিনয় এবং মার্জিত ভাষায় সুন্দর করে কথা বলা, সেটা এখনো সবাই খুব পছন্দ করে।’

আল মুক্তাদির নামে আরেক জেন-জি প্রতিনিধি বলছিলেন যে তার ভালো লাগে সালমান শাহর সাবলীল অভিনয়।

তিনি বলেন, ‘তাকে ভালো লাগার অন্যতম বড় কারণ তার ন্যাচারাল ডায়ালগ ডেলিভারি এবং তার এক্সপ্রেশন। এছাড়া ফ্যাশন সেন্সও আমাকে রীতিমত মুগ্ধ করে।’

কিন্তু মৃত্যুর ৩০ বছরও সালমান শাহকে নিয়ে এত আলোচনা ও কৌতুহলের কারণ কী?

চলচ্চিত্র গবেষক, নির্মাতা ও অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন রাজু বলেন, ‘সালমান শাহের যে ফলোয়িং বা অডিয়েন্স, তাদের একটা বড় অংশই আর্লি টিন, মিড টিন, লেট টিন ও পোস্ট টিন- এরকম বয়সের। তিনি যে ধরনের ছবিগুলো করেছেন, সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই কিন্তু ওই টিনেক টিনেজ রোমান্সের যে ধারা, সেটিকে ধারণ করে।’

‘তো এই জনগোষ্ঠীর কাছে, এখনকার জেন-জি বলি বা নতুন দর্শক গোষ্ঠী, তাদের ভিজ্যুয়াল ওয়াল্ডে সালমান শাহ অটোমেটিক একটা জায়গা পেয়ে যাচ্ছে।’

যে কারণে ৩০ বছর পরেও সালমান শাহের জনপ্রিয়তা রয়েছে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

তবে চলচ্চিত্র পরিচালক ড. মতিন রহমান অবশ্য মনে করেন, সালমান শাহকে ঘিরে এখনো এত কৌতুহলের বড় একটা কারণ তার অস্বাভাবিক মৃত্যু।

তিনি বলেন, ‘যদি স্বাভাবিকভাবে মারা যেত, তাহলে সালমান ৩০ বছর ধরে মানুষের কাছে এত জনপ্রিয় থাকতো না।’

মৃত্যুর তিন দশক পরও সালমান শাহের মৃত্যু এখনো অমীমাংসিত এক রহস্য। ফলে তাকে নিয়ে থামেনি আলোচনা। সালমান ভক্তরা এখনো প্রিয় নায়কের স্মৃতি বাঁচিয়ে রেখেছেন, বিচারের দাবিতে রাজপথেও নামছেন কেউ কেউ।

‘এটা আত্মহত্যা, নাকি হত্যা? এটার জটটা খুলুক আমরা সেটাই চাই,’ বলছিলেন রাহিমা নিশাত নিঝুম নামের এক সালমান শাহ ভক্ত।

যদিও অতীতে বিভিন্ন সময় পুলিশ ও বিচার বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহের মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ বলা হয়েছে। কিন্তু নায়কের ভক্ত ও পরিবারের সদস্যরা সেটি মানেননি।

‘তবে এটা যদি আত্মহত্যা হয়ই, সেক্ষেত্রে সেই আত্মহত্যার নেপথ্যে কাদের দায় আছে- সেই বিষয়টাও যাতে রাষ্ট্র ও প্রশাসন তুলে এনে ব্যবস্থা নেয়। কারণ সালমান শাহের মৃত্যুতে কেবল তার পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং বাংলাদেশের পুরো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে,’ বলছিলেন সালমান শাহ স্মৃতি সংসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মাসুদ রানা নকীব।

সালমান শাহ মারা গেলেও থেমে নেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প। প্রতিবছরই নতুন নতুন সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে; চলচ্চিত্র জগতে যুক্ত হচ্ছেন নতুন প্রজন্মের নায়ক-নায়িকারা। কিন্তু চার বছরের ছোট্ট ক্যারিয়ারে সালমান শাহ যে অবদান রেখে গেছেন, মৃত্যুর ৩০ বছর পরেও সেটি তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে ভক্তদের কাছে।

সূত্র : বাসস