নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সাথে আলোচনার পর চট্টগ্রাম বন্দরে বিএনপিপন্থী শ্রমিকরা আন্দোলন স্থগিত করেছেন। এনসিটি ইস্যুতে টানা ছয় দিন থেকে চলা এই আন্দোলন স্থগিত হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মাঝে আপাতত স্বস্তি ফিরেছে।
জাতীয় নির্বাচন ও পবিত্র রমজান যখন দোরগোড়ায় এমন সময়ে বিএনপিপন্থী শ্রমিকদলের বন্দর অচল কর্মসূচির কারণে দেশের অর্থনীতির পাশাপাশি ভোক্তাদেরও বড় মাশুল গুণতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে নজিরবিহীন এই বন্দর অচল কর্মসূচি ঘিরে কোনো কোনো ব্যবসায়ীকে মন্তব্য করতে শোনা গেছে, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন কর্মসূচির ডাক দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া যখন নিজ বাসায় অবরুদ্ধ ছিলেন, সেসময় এক সপ্তাহ বন্দর অচল করতে পারলে তো সরকারের পতন হতো। কিন্তু সেই সময় বন্দর অচল করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারা করেনি।’
এদিকে টানা ছয় দিনের অচলাবস্থার মাঝে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে শ্রমিকদলের বিক্ষোভের মুখে পড়েন নৌপরিহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। এরপরও গাড়ি থেকে নেমে আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলেন তিনি। পরে দাবি-দাওয়া বিবেচনায় নেয়ার আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা তাদের কর্মসূচি স্থগিত করেন।
এর আগে, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা দেয়ার সরকারি প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তিন দিন আট ঘণ্টা করে এবং পরে লাগাতার কর্মবিরতির ডাক দেয় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নামে শ্রমিকদল। এতে বন্দরে পণ্য লোডিং-আনলোডিং ও জাহাজ চলাচলে স্থবিরতা দেখা দেয়। একদিকে বিপুল সংখ্যক রফতানি পণ্য বোঝাই কনটেইনার নিয়ে সিডিউল জাহাজ বন্দর ত্যাগ করতে পারেনি। অন্যদিকে রমজান সামনে রেখে আমদানিকৃত বিপুল পরিমাণ ভোগ্য পণ্যের খালাস আটকে যায়। ১৯৯৬ সালের পর এমন নজিরবিহীন অচলাবস্থা চট্টগ্রাম বন্দরে আর হয়নি।
রমজানের আগ মুহুর্তে বিএনপিপন্থী শ্রমিকদের এমন কর্মসূচিকে ভালোচোখে দেখছেন না ব্যবসায়ীরা। এই অচলাবস্থার কারণে জাহাজের অপেক্ষমাণ সময়ের জন্য যে বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে তা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ঘাড়েই পড়বে। অনেকে এটিকে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে সরকারের বিরুদ্ধে জনক্ষোভ সৃষ্টির কৌশলও বলছেন।
আন্দোলনকারীদের বাধায় বন্দরের তিনটি প্রধান টার্মিনাল জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়। তবে সৌদি প্রতিষ্ঠান ‘আরএসজিটি চিটাগং’ টার্মিনালে ইতোপূর্বে কাজ হলেও গতকাল টার্মিনালটি জাহাজ শুণ্য ছিল বলে জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের মাঝে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে রফতানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পের অনেক রফতানি পণ্যের সিঙ্গাপুর থেকে মাদারভেসেলের শিপমেন্ট বাতিলের উপক্রম হয়।
ডিপোতে বাড়ছে রফতানি পণ্যের স্তুপ
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার নয়া দিগন্তকে জানান, ১৯টি বেসরকারী ডিপোতে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত রফতানি পণ্যবাহী ১৩ হাজার ১০০ টিইইউএস, আমদানি পণ্যবাহী সাত হাজার ১৯৮ টিইইউএস ও ৫১ হাজার ৩৩৫ টিইইউএস খালি কনটেইনার ছিল। বিকেল থেকে রফতানি কনটেইনার বন্দরে প্রেরণ শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ শিপিং অ্যাজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, উপদেষ্টা মহোদয় ব্যবসায়ীদের সাথে বসেছিলেন। সভায় আন্দোলনের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থার দিনগুলোর পোর্ট ডেমারেজ চার্জ ও শিপিং লাইনের চার্জ মওকুপের বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি যেন আর না হয়। বন্দর সচল হওয়ায় ব্যবসায়ীরা কিছুটা হলেও হ্যাপি বলে তিনি জানান।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘উপদেষ্টা মহোদয়ের সাথে আলোচনার পর শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন। উপদেষ্টা মহোদয় শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নোটডাউন করেছেন এবং তা বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। বন্দরের কার্যক্রম পুরোদমে চালু হয়েছে।’
উল্লেখ্য, আন্দোলনকারীরা গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) থেকে তিন দিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালনের পর মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) থেকে লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করেন। এতে বন্দর কার্যক্রম পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। ফলে শতাধিক জাহাজ বন্দরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকে।
আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আমদানি কনটেইনার বোঝাই ১৮টি জাহাজ বহির্নোঙ্গরে অপেক্ষা করছিল। এর বাইরে ১০টি কনটেইনার জাহাজ জেটিতে আটকা পড়েছে।



