কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই হতে পারে উন্নয়নশীল অর্থনীতির ইঞ্জিন

‘তবে, যথাযথ নীতিমালা ছাড়া এআই দেশগুলোর মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য বাড়াতে পারে। একইসাথে অভ্যন্তরীণ আয়বৈষম্য বৃদ্ধি, বাজারে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা এবং নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’

বিশেষ সংবাদদাতা

মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বৈশ্বিক বাস্তবতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এখনই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারলে যে উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সাধারণত প্রায় এক শতাব্দী সময় লাগতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে তা মাত্র এক দশকেই অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬: দ্য প্রমিজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-প্রতিবেদনে এসব বলা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে এআই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ, দক্ষ মানবসম্পদ, তথ্য-উপাত্ত এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দ্রুত গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তিগত বৈষম্য আরো বাড়তে পারে।

কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার চিত্র
ওয়াশিংটন থেকে বৃহস্পতিবার পাঠানো প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর তুলনায় উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে জেনারেটিভ এআই-এর কারণে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কাছে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি তিন গুণেরও বেশি। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে ১৪.২ শতাংশ কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে থাকলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই হার মাত্র ৪.৫ শতাংশ। অন্যদিকে, উন্নয়নশীল অর্থনীতির ১৬.২ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে এআই-এর মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে, যা উচ্চ আয়ের দেশগুলোর (১৮.৭ শতাংশ) খুব কাছাকাছি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা কর্মীদের প্রতিস্থাপনের মধ্যে নয়; বরং তাদের কাজের সক্ষমতা ও কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার মধ্যে নিহিত।

যা বলছেন বিশ্বব্যাংক প্রধান অর্থনীতিবিদ
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেন, উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি নতুন ‘লাইফলাইন’। এ প্রযুক্তির সুফল পেতে বিশাল ডেটা সেন্টার বা অত্যাধুনিক ভাষা মডেল তৈরির প্রয়োজন নেই। স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী স্বল্প ব্যয়ের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিচারিক সেবা এবং কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। তার ভাষায়, বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেটের মতো আগের প্রযুক্তিগুলোর তুলনায় এআই অনেক দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সুযোগটি কাজে লাগাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রথমবারের মতো উন্নয়নশীল দেশ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন
বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদনটিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক মূল্যায়ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশে মানুষ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকার ইতোমধ্যেই তথ্য বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পূর্বাভাস তৈরি এবং জনসেবা প্রদানে এআই ব্যবহার শুরু করেছে। বিশেষ করে যেখানে প্রশিক্ষিত জনবল, নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার কিংবা সরকারি সক্ষমতা সীমিত, সেখানে এআই গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিকিৎসকদের রোগ নির্ণয়, কৃষকদের ফসল ব্যবস্থাপনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর প্রশাসন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সেবার মান উন্নয়নে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা, তবে ঝুঁকিও কম নয়
বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদনে বলছে, গত তিন দশকের মধ্যে বর্তমানে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে দুর্বল গড় প্রবৃদ্ধির সময় পার করছে। তবে ২০৩০-এর দশকের শেষ দিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন গতি আনতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত হবে না। বর্তমানে সবচেয়ে উন্নত এআই প্রযুক্তি সীমিতসংখ্যক দেশ ও প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বড় অংশের কাছেই প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, উচ্চগতির ইন্টারনেট, কম্পিউটিং সক্ষমতা, তথ্যভাণ্ডার এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি রয়েছে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, যথাযথ নীতিমালা ছাড়া এআই দেশগুলোর মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য বাড়াতে পারে। একইসাথে অভ্যন্তরীণ আয়বৈষম্য বৃদ্ধি, বাজারে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা এবং নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তিন ধাপের রোডম্যাপ
বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তিন ধাপের একটি কৌশলগত রোডম্যাপ প্রস্তাব করেছে। প্রথম ধাপে বিদ্যমান এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে সেগুলোকে স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযোজিত করতে হবে। তৃতীয় ধাপে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জনের পর উন্নত বা ‘ফ্রন্টিয়ার’ এআই প্রযুক্তি উন্নয়নের দিকে এগোতে হবে।

বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২৬-এর পরিচালক গৌরব নায়ার বলেন, এআই এমন একটি সুযোগ তৈরি করেছে যা বহু প্রজন্ম ধরে অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানে সহায়ক হতে পারে। তবে যেসব দেশ এখনই বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, দক্ষ জনবল ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে, তারাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে।

অবকাঠামো ও বিনিয়োগে জোর
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৌলিক অবকাঠামোয় বিনিয়োগ ছাড়া এআই বিপ্লবের সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে সাব-সাহারা আফ্রিকার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সেখানে গ্রামীণ এলাকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যালয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নেই এবং দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বিদ্যালয়ে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগও অনুপস্থিত। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে বিশ্বব্যাংক ‘মিশন-৩০০’ কর্মসূচির আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে সাব-সাহারা আফ্রিকার ৩০ কোটি মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। একইসাথে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে স্থানীয় ভাষাভিত্তিক ডেটা, পর্যাপ্ত কম্পিউটিং সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। সরকারকে বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং সফল উদ্ভাবনের বিস্তারে সহায়ক পরিবেশ তৈরিরও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিতের আহ্বান
প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, সরকারগুলোকে প্রথমে শিল্পখাতের স্বেচ্ছাসেবী মানদণ্ড অনুসরণে উৎসাহ দিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমন্বিত নীতিমালা গড়ে তুলতে হবে। একইসাথে বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করে ক্ষতিকর ব্যবহার প্রতিরোধ করতে হবে। আর সতর্ক করে বলেছে, এআই যদি সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে পক্ষপাত সৃষ্টি করে বা নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, তাহলে জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। তাই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।