বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে, যা বিশ্লেষণভুক্ত মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় চার লাখ ৮৩ হাজার মানুষ জরুরি পর্যায়ের খাদ্য সঙ্কটে রয়েছে।
অন্যদিকে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ সময় তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে এক কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে। এর মধ্যে প্রায় সাত লাখ ৮৭ হাজার মানুষ জরুরি পর্যায়ের খাদ্য সঙ্কটে পড়তে পারেন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়, জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশনের (গেইন) যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)’- এর সর্বশেষ বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আইপিসি হলো খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার তীব্রতা ও ব্যাপ্তি বিশ্লেষণ এবং শ্রেণিবিন্যাসের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি কাঠামো। এর বিশ্লেষণ সরকার ও উন্নয়ন অংশীদারদের মানবিক সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিকল্পনায় একটি অভিন্ন প্রমাণভিত্তিক ভিত্তি প্রদান করে।
সম্প্রতি ঢাকায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও তদারকি ইউনিটের (এফপিএমইউ) নেতৃত্বে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় এই বিশ্লেষণের ফলাফল প্রকাশ ও পর্যালোচনা করা হয়। এতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধি, গবেষক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম, হাওরাঞ্চল, কয়েকটি উপকূলীয় জেলা এবং কক্সবাজার ও ভাসানচরে অবস্থানরত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
কর্মশালায় খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো: আব্দুল বারী বলেন, ‘বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণের সহনশীলতা বৃদ্ধিতে প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণকে নীতি ও বিনিয়োগের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আইপিসির এই বিশ্লেষণ আমাদের সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আরও কার্যকরভাবে সহায়তা করতে সাহায্য করবে।’
খাদ্যসচিব আবু তাহের মো: মাসুদ রানা বলেন, ‘কার্যকর নীতিনির্ধারণে তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি আশা করি, এই আইপিসি প্রতিবেদনের ফলাফল নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী এবং মানবিক সংস্থাগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (সচিব) ড. মোহাম্মদ জকরিয়া বলেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য সরকার, সমাজ, এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী, জাতিসংঘের সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিকূল জলবায়ু, বন্যা, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটাচ্ছে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হলে কোটি মানুষের পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্যে প্রবেশাধিকার আরো সীমিত হয়ে পড়বে।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা জরুরি খাদ্য সহায়তা সম্প্রসারণ, দুর্যোগ-সাড়া সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণ, জীবিকা পুনরুদ্ধারে সহায়তা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুপারিশ করেন।
বাংলাদেশে এফএওর প্রতিনিধি ড. জিয়াওকুন শি বলেন, ‘বারবার বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার সহনশীলতা বাড়ানো এখন অত্যন্ত জরুরি। জরুরি কৃষি কৌশল, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি, টেকসই জীবিকা এবং স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ শুধু তাৎক্ষণিক খাদ্য সঙ্কট মোকাবিলাই নয়, ভবিষ্যৎ সঙ্কট থেকেও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেবে।’
বাংলাদেশে ডব্লিউএফপির প্রতিনিধি ও কান্ট্রি ডিরেক্টর কোকো উশিয়ামা বলেন, ‘এই আইপিসি বিশ্লেষণের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো, এটি সঙ্কট আরো গভীর হওয়ার আগেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে সহায়তা করে। বিশ্লেষণে চিহ্নিত অনেক এলাকাই বর্তমানে ভারী বৃষ্টি ও বন্যার মুখে রয়েছে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেখানে ডব্লিউএফপি আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং সরকারের দুর্যোগ-সাড়া সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা দিচ্ছে। জরুরি সাড়ার পাশাপাশি আইপিসি ভবিষ্যৎ সঙ্কটের পূর্বাভাস, আরো কার্যকরভাবে সহায়তা পৌঁছে দেয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’
কর্মশালায় খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অংশীদার সংস্থাগুলো তাৎক্ষণিক খাদ্য নিরাপত্তা সঙ্কট মোকাবিলা, ভবিষ্যতের দুর্যোগে সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং সবার জন্য টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
সূত্র : ইউএনবি



