নন ইউরিয়া সার আমদানি

হাজার কোটি খরচ বাড়িয়ে ২৩৩ কোটি টাকা সাশ্রয়!

বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সার আমদানীতে দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়ায় সরকারের ২৩৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে দাবি করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক
সচিবালয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলন
সচিবালয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলন |নয়া দিগন্ত

কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথমবারের মতো কৃষি খাত নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। কৃষির সাথে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও উপদেষ্টা।

তিনি বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের গত এক বছরের অর্জন ও সার্বিক অগ্রগতি তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সার আমদানীতে দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়ায় সরকারের ২৩৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে দাবি করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে করে তৃপ্তির ঢেকুড় তুললেও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সার আমদানিতে সরকারের হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ বেড়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ক্ষতিটাকে ঢাকাতেই উল্টা স্তুতি হিসেবে সাশ্রয়ের বিষয়টিকে সামনে আনা হচ্ছে।

সিন্ডিকেট ভেঙে সার আমদানিতে সাশ্রয় করা হয়েছে উল্লেখ করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘বেসরকারি খাতের আমদানির উপর নির্ভরতা কমাচ্ছি। আমরা জিটুজি-তে আমদানি বাড়াচ্ছি। আমরা একটা টেন্ডার করেছিলাম। আগে যেটা নিয়ম ছিল সর্বনিম্ন দরদাতা থেকে কার্যাদেশ দিতাম। আমাদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা ওই দামে সার আমদানি করতাম। তবে এবারে আমরা জিটুজি-তে যে সারগুলো আনি সেটার সাথে আন্তর্জাতিক দামের সামঞ্জস্য রেখে আমরা একটা সারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সেটাকে ধরে আমরা সারের মূল্য নেগোসিয়েশন করেছি। আমরা এই টেন্ডারে ৫ দশমিক ১৫ লাখ টন সার আমদানির কার্যাদেশ দিয়েছি। এই প্রক্রিয়ার কারণে সেই একটা টেন্ডার থেকেই আমরা সরকারের ২৩৩ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছি।’

কৃষি মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি আমদানিকারকদের সূত্রে জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয় প্রতি বছর নন ইউরিয়া সার আমদানির জন্য এপ্রিল-মে মাসে টেন্ডার দিত। গত বছরও এই টেন্ডার দিয়েছিল মে মাসে। কিন্তু এ বছর সেই টেন্ডার দিয়েছে জুনের শেষ সপ্তাহে। ৯ দশমিক ৫ লাখ টনের টেন্ডারের বিপরীতে দুই ধাপে কার্যাদেশ দিয়েছে আগস্টের শেষে এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে। মাঝের দু’মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে নন-ইউরিয়া সারের দাম ব্যাপক হারে বেড়েছে। দেরিতে টেন্ডার দেয়ার কারণে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকারের হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হচ্ছে।

যেমন শুধু চায়নার ডিএপি সারের আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মার্চে চায়নার ডিএপি সারের দাম ছিল টন প্রতি ৬৩০-৬৩৫ মার্কিন ডলার। এটা মে মাসে বেড়ে দাড়ায় টন প্রতি ৬৭০-৬৯০ ডলারে। জুলাইতে এই দাম আরো বেড়ে দাড়ায় টন প্রতি ৭৯৮-৮০১ ডলারে।

কৃষি মন্ত্রণালয় যখন আগস্টে কার্যাদেশ দিয়েছে চায়নার ডিএপি আমদানির, তখন দাম নির্ধারণ করেছে টন প্রতি ৮৪৮ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ শুধুমাত্র ডিএপি সারের ক্ষেত্রেই প্রতি টনে মে মাসের তুলনায় কার্যাদেশ দেয়া পর্যন্ত বাড়তি খরচ বেড়েছে অন্তত ১৭৮ মার্কিন ডলার। যেখানে প্রথম টেন্ডারে কৃষি মন্ত্রণালয় ৩ লাখ ৩৫ হাজার মে টনের কার্যাদেশ প্রদান করেছে এই বাড়তি খরচে।

একইভাবে অন্তর্জাতিক বাজারে এই সময়ে অন্তত ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে টিএসপি ও এমওপি সারের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের গতিবিধি বুঝতে না পারার কারণেই বাড়তি খরচ করে সার আমদানি করতে হচ্ছে। যেখানে সরকারের হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হচ্ছে।

অথচ কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা শুধুমাত্র সিন্ডিকেট ভাঙার দোহায় দিয়েই ২৩৩ কোটি টাকা সাশ্রয়ের উল্টা স্তুতি শুরু করেছে। আবার ৫ দশমিক ১৫ লাখ মে টন নন ইউরিয়া সার আমদানির যে কার্যাদেশ দিয়েছে সেখানে এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রনাধীন প্রতিষ্ঠানকেই ৪০ শতাংশের বেশি কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। আমিনুর রশিদ খান মানুনের বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, দেশ ট্রেডিংসহ যে প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে এত বড় কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে তাও নিয়ম লঙ্ঘন করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ২০১৫-২০১৬ সালে বিসিআইসির ইউরিয়া পরিবহনের সময় তা আত্মসাত করেছিল বলে সংস্থাটির তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের ২৩৩ কোটি টাকার স্তুতি কতটা যৌক্তিক তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে সংবাদ সম্মেলনে কৃষি উপদেষ্টা জানান, গত ফ্যাসিস্ট সরকারের রেখে যাওয়া বকেয়ার ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করেছে অন্তবর্তী সরকার। বর্তমানে সারের কোনো সঙ্কট নেই। সারের দামও বাড়েনি।

তবে মাঠের চিত্র আলাদা। কৃষককে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, সারের সঙ্কট বা কমতি আছে- বিষয়টা ঠিক না। যদি টাকা দিলে সার পাওয়া যায় তাহলে সঙ্কট থাকার কথা নয়। তবে আমাদের ব্যবস্থাপনায় কিছুটা সমস্যা আছে। যেমন আমাদের খুচরা বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে দামের ক্ষেত্রে। মৌসুমে যত সার প্রয়োজন আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত তার সবটাই মজুদ আছে। তারপরও চলমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সার আসছে। সারের কোনো সঙ্কট নেই।

তিনি বলেন, নতুন ডিলার নীতিমালা হয়ে যাচ্ছে। এটা হলে খুচরা বিক্রেতা বলে কিছু থাকবে না। তখন ডিলাররাই সব বিক্রি করবে। ডলারের সঙ্কট দূর করতে আমরা একটা চুক্তি করেছি ২০০ মিলিয়ন ডলারের।

পেট্রোবাংলা সার উৎপাদনে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কথা বলেছে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কৃষি উপদেষ্টা বলেন, পেট্রোবাংলা যদি গ্যাসের দাম বাড়ায়, তারপর যে সার উৎপাদন হবে, সেক্ষেত্রেও দাম বাড়বে না। অন্তত আমি যতদিন আছি স্যারের দাম বাড়বে না।

মাঠ পর্যায়ে সারের সঙ্কট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্টভাবে বললে আমি ওই জায়গায় অফিসারকে ধরব।’

তিনি জানান, সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ-সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯ হালনাগাদ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পাটকলের অব্যবহৃত গুদামকে সার মজুতের জন্য ব্যবহার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

কৃষি উপদেষ্টা বলেন, ‘কৃষিজমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ নিয়ে আমাদের কাজ প্রায় শেষ। অধ্যাদেশটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে হচ্ছে। এই অধ্যাদেশের অধীনের জোনিং করা হবে। কোনো জায়গায় তিন ফসল, কোনো জায়গায় দুই ফসল এবং কোনো

জায়গায় এক ফসল হয়। তিন ও দুই ফসল হয় এমন জায়গায় কোনো অবস্থায় কোনো নির্মাণকাজ করা যাবে না।’

কৃষি উপদেষ্টা বলেন, গত বছরের আগস্ট মাসে দেশের ২৩টি জেলায় ভয়াবহ বন্যায় ফসলের ব্যপক ক্ষতি হয়েছিল। সময়মত বীজ, সার ও প্রণোদনা দেয়ায় কৃষকরা সে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। গত বোরো মৌসুমে ১৫ লাখ টন ধান কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন হয়েছে।