অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আজ বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এই মুহূর্তে খারাপ অবস্থায় নেই। তবে দেশটি বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, যেগুলো মোকাবেলায় ধারাবাহিক সংস্কার, উন্নত সমন্বয় এবং আগামী সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস : অ্যান ইকোনমিক রিফর্ম অ্যাজেন্ডা ফর দ্য ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট’ শীর্ষক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, বহুমুখী দেশীয় ও বৈশ্বিক চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং বড় ধরনের সঙ্কট এড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ‘অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু আমরা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছি...চ্যালেঞ্জগুলো আছে এবং এগুলোকে হালকাভাবে নেয়া যাবে না।’
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ (ডিএফএটি)।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. কে এ এস মুরশিদ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিন্টন পোবকে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআই’র প্রিন্সিপাল ইকোনমিস্ট ড. আশিকুর রহমান। প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম. মাসরুর রিয়াজ। সমাপনী বক্তব্য দেন পিআরআই পরিচালক ড. আহমদ আহসান।
ড. সালেহউদ্দিন বলেন, মহামারি-পরবর্তী অস্থিরতা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি দামের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়িসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ধাক্কার মধ্যেও বাংলাদেশ স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফলে দেশটি একটি কঠিন সময় অতিক্রম করতে পেরেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের চাপ এবং রাজস্ব ঘাটতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়। অনেক দেশই একই ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আসল বিষয় হলো-সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাই।’
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা, রাজস্ব শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার দিকে গুরুত্ব দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করেছি, যাতে একদিকে অর্থনীতি চলমান থাকে, অন্যদিকে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।’
রাজস্ব আহরণকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত সমমানের দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। এত কম রাজস্ব আদায় নিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। এ জন্য কর সংস্কার, করের পরিধি সম্প্রসারণ এবং কর পরিপালন জোরদারের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব অনেক সময় সংস্কার কার্যক্রমকে ধীর করে দেয়।
‘আমরা রিপোর্ট লিখি, সুপারিশ করি, কিন্তু বাস্তবায়নই সবচেয়ে কঠিন কাজ।’
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, নীতিমালা প্রণয়নের চেয়ে প্রতিষ্ঠান সংস্কার করা অনেক বেশি কঠিন। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া ভালো নীতিও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারে না। অর্থবহ সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল ক্ষেত্র। সুশাসনের ঘাটতি, খেলাপি ঋণ এবং জবাবদিহিতার অভাবের কারণে জনআস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এই সমস্যাগুলো বহু বছর ধরে জমেছে। এগুলো সমাধানে সময় এবং রাজনৈতিক সাহস প্রয়োজন।
সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, ‘একসাথে সব কিছু করা সম্ভব নয়। দেশের জন্য কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা নির্ধারণ করে আমাদের এগোতে হবে।’
তিনি জানান, সরকার জনতুষ্টিমূলক সিদ্ধান্ত এড়িয়ে স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছে। নীতিনির্ধারণ কখনোই সহজ নয়।
ড. সালেহউদ্দিন বলেন, সরকারের প্রতি প্রত্যাশা অনেক বেশি, তবে অবাস্তব প্রত্যাশা ক্ষতিকর হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সংস্কারে ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।’
বেসরকারি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, কৃষকদের মতো বেসরকারি খাতও পরিশ্রমী ও সক্ষম, তবে তাদের জন্য প্রণোদনা, অর্থায়নে প্রবেশাধিকার এবং স্থিতিশীল নীতি পরিবেশ দরকার। ‘সরকারকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে সহায়তা করতে হবে’ তিনি বলেন।
তিনি বলেন, দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, রফতানি বৃদ্ধি এবং সামাজিক খাতের উন্নয়নসহ বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ অর্জনগুলো উপেক্ষা করা যাবে না। এগুলো ভবিষ্যৎ অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করেছে।
ভবিষ্যতের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচিত সরকারকে গভীর কাঠামোগত সংস্কার, শাসন শক্তিশালীকরণ, রাজস্ব আহরণ উন্নয়ন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং নীতি সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘পরবর্তী সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। টেকসই প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের জন্য সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।’
ড. সালেহউদ্দিন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। আমাদের আছে সহনশীল মানুষ, পরিশ্রমী জনশক্তি এবং বিপুল সম্ভাবনা। সঠিক নীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।’
দেশের স্বার্থে সকল অংশীজনকে একসাথে চিন্তা করার এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘এটি কোনো একটি সরকার বা গোষ্ঠীর বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের বিষয়।’ বাসস



