অসহায় মানুষের অশ্রু মুছে মুখে হাসি ফোটানোর এক অদম্য সংকল্প নিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘মাস্তুল ফাউন্ডেশন’। ২০১২ সালে একদল তরুণকে সাথে নিয়ে স্বপ্নদ্রষ্টা কাজী রিয়াজ রহমান যে মানবিক যাত্রার বীজ বুনেছিলেন, আজ তা এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়ে লাখো মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের এক অনন্য মেলবন্ধনে মাস্তুল আজ দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে এক পরম আস্থার নাম।
একুশ শতকের স্বপ্নদ্রষ্টা: কাজী রিয়াজ রহমান
একসময় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নিজের টিউশনির টাকা বাঁচিয়ে পথশিশুদের বর্ণমালার আলো দেখানোর যে ক্ষুদ্র উদ্যোগ কাজী রিয়াজ রহমান নিয়েছিলেন, তা আজ এক বৈশ্বিক মডেলে রূপান্তরিত। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ায় ‘সুবিধাবঞ্চিত মানুষের টেকসই উন্নয়নে দাতব্য সংস্থার ভূমিকা’ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন। তার এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা মাস্তুল ফাউন্ডেশনকে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক ও বিজ্ঞানসম্মত সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছে।
"মাস্তুল ফাউন্ডেশন কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি অবহেলিত মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। আমাদের প্রতিটি কাজের মূল লক্ষ্য হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আমরা চাই প্রতিটি এতিম শিশু যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে এবং সমাজের কেউ যেন নিজেকে একা বা অবহেলিত মনে না করে।" — কাজী রিয়াজ রহমান, প্রতিষ্ঠাতা, মাস্তুল ফাউন্ডেশন।

মাস্তুল ফাউন্ডেশনের প্রাপ্তি ও স্বীকৃতি: মাস্তুল ফাউন্ডেশন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অধীনে নিবন্ধিত একটি স্বনামধন্য ও সেবামূলক জাতীয় দাতব্য প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে নিবন্ধিত এবং এনজিও বিষয়ক ব্যুরো থেকে সরকারী নিবন্ধন লাভের পাশাপাশি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) থেকে এসআরও সনদ প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে। এবং বেওয়ারিশ লাশ দাফনের জন্য সরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি লাভ করেছে।
সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বমানবিকতা: মাস্তুল ফাউন্ডেশনের সেবার হাত আজ কেবল মানচিত্রের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বজুড়ে যেখানেই আর্তনাদ, সেখানেই পৌঁছে যাচ্ছে মাস্তুলের স্বেচ্ছাসেবীরা। গাজায় ও সুদানে মানবিক সংকটে শুরু থেকেই মাস্তুল সহযোগিতা করে আসছে। ফিলিস্তিনের গাজায় ও সুদানে যখন মানবিক বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করেছে, তখন মাস্তুল ফাউন্ডেশন সরাসরি গিয়ে অবরুদ্ধ শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবার ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ পৌঁছে দিয়ে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সেবার মূল স্তম্ভ: মাস্তুল ফাউন্ডেশনের অনন্য প্রকল্পসমূহ
মাস্তুল ফাউন্ডেশন তাদের বহুমুখী প্রকল্পের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি স্তরে মানবিক সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। নিম্নে প্রধান কার্যক্রমগুলো তুলে ধরা হলো:
মাস্তুল স্কুল, মাদ্রাসা ও এতিমখানা: আগামীর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কারিগর মাস্তুল ফাউন্ডেশনের এই প্রাণকেন্দ্রটি সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম শিশুদের কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়, বরং একটি নিরাপদ ও মমতাময় শৈশব উপহার দিচ্ছে। এখানে শত শত শিশুকে সম্পূর্ণ পারিবারিক আবহে রেখে মানসম্মত শিক্ষা, পুষ্টিকর খাবার এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়। আধুনিক শিক্ষার সাথে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটিয়ে তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি খেলাধুলা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে কাজ করছে মাস্তুল, যেন তারা অভাবের শিকল ভেঙে একটি স্বনির্ভর ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।
মাস্তুল স্বাবলম্বী প্রজেক্ট (যাকাত ভিত্তিক):
মাস্তুল ফাউন্ডেশন বিশ্বাস করে, সাময়িক সাহায্যের চেয়ে স্থায়ী সমাধানই উত্তম। সেই লক্ষ্যে পবিত্র জাকাতের অর্থের সঠিক ব্যবহারে অভাবী পরিবারগুলোকে রিকশা, সেলাই মেশিন বা ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি দিয়ে স্বাবলম্বী করা হচ্ছে। কেবল উপকরণ নয়, প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। লক্ষ্য হলো—আজ যারা যাকাত নিচ্ছেন, সঠিক সহায়তায় কাল যেন তারা নিজেরাই জাকাত দাতা হিসেবে সম্মানের সাথে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন।
মাস্তুল ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম: প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং শোষণহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে ‘ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ শুরু করেছে মাস্তুল ফাউন্ডেশন। ইসলামিক ফাইন্যান্সের কল্যাণময় আদর্শকে কাজে লাগিয়ে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে এই যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কার্যক্রমটি ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এমআরএ থেকে সাময়িক অনুমোদন লাভ করেছে। এই প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘কর্জ-এ-হাসানা’ বা সুদমুক্ত ঋণ প্রদান, যার মাধ্যমে অসচ্ছল ও পরিশ্রমী মানুষ ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে সম্মানের সাথে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ পাচ্ছেন। মাস্তুল ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য কেবল সাময়িক অর্থ সহায়তা নয়, বরং মানুষকে কর্মক্ষম ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা।
মাস্তুল বৃদ্ধাশ্রম ও শেল্টারহোম: সমাজের অবহেলিত ও পরিবারবিচ্ছিন্ন প্রবীণদের জন্য মাস্তুল গড়ে তুলেছে এক মমতাভরা আবাস। যেখানে উন্নত আবাসন, পুষ্টিকর খাবার এবং নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের আত্মিক প্রশান্তির ব্যবস্থা করা হয়।
মাস্তুল মেহমানখানা: "কেউ অনাহারে থাকবে না"—এই স্লোগান নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে মাস্তুল মেহমানখানা। এখানে প্রতিদিন শত শত অসহায়, পথচারী ও নিম্ন আয়ের মানুষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সম্মানের সাথে উন্নত মানের খাবার গ্রহণ করেন।
ওয়াশ (WASH) ও ইউথ ডেভেলপমেন্ট: নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে দুর্গম এলাকায় কাজ করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে নেতৃত্বের বিকাশমূলক কর্মসূচি পরিচালনা করে মাস্তুল।
দাফনসেবা, আম্বুলেন্স ও অক্সিজেন সেবা কার্যক্রমঃ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত এই প্রকল্পের আওতায় করোনা কালীন সময়ে থেকে আজ পর্যন্ত কয়েক হাজার বেওয়ারিশ মরদেহের সসম্মানে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ মাইনফলক হিসেবে, ঢাকা মেডিকেল কলেজে(ঢামেক)সরকারি অনুমোদনক্রমে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের নিজস্ব ‘মরদেহ গোসলখানা’ স্থাপিত হয়েছে, যা পরিচয়হীন মরদেহের মর্যাদাপূর্ণ শেষ বিদায় নিশ্চিত করছে। এবং অসহায় রোগীদের জন্য সার্বক্ষণিক এম্বুলেন্স সেবা এবং 'হেলথ এইড' প্রকল্পের মাধ্যমে বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়।
মাস্তুল ইসলামিক শেল্টারহোম কমপ্লেক্স
মাস্তুল ফাউন্ডেশন একটি বিশাল মানবিক উদ্যোগ হিসেবে ১০ তলা বিশিষ্ট ‘ইসলামিক শেল্টারহোম কমপ্লেক্স’ নির্মাণ করছে। এটি মূলত অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য একটি স্থায়ী এবং সম্মানজনক আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করবএকই ছাদের নিচে থাকছে একটি আধুনিক মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, স্কুল এবং বৃদ্ধাশ্রম। বিশেষ করে সমাজের নিঃসঙ্গ ও আশ্রয়হীন প্রবীণদের জন্য এখানে নিরাপদ ও আধুনিক বৃদ্ধাশ্রমের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যে কেউ ১ লক্ষ টাকা দিয়ে একটি ‘কনট্রিবিউশন শেয়ার’ গ্রহণ করে এই প্রকল্পের আজীবন সদস্য হতে পারেন। দাতা বা সদস্যরা যদি ভবিষ্যতে কখনও একা হয়ে পড়েন বা আশ্রয়ের প্রয়োজন বোধ করেন, তবে ইনশাআল্লাহ এই কমপ্লেক্সেই তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে।
উলেক্ষ্য যে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আইন অনুযায়ী, মাস্তুল ফাউন্ডেশনকে প্রদত্ত যেকোনো দান, যাকাত বা সাদাকা আয়করমুক্ত, যা দাতাদের জন্য আয়কর রেয়াত হিসেবে গণ্য হবে।



