অস্ট্রেলিয়ায় তামাক নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিনিষেধের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও ‘সতর্কবার্তা’ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রস্তাবিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের বিধানগুলো বাস্তবায়ন করা হলে অস্ট্রেলিয়ার মতো বাংলাদেশেও সরকারের রাজস্ব আদায়ে ধস নামতে পারে। একই সাথে সিগারেটের অবৈধ বাজার দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই তামাক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ভুল পদক্ষেপের ফলাফল থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত বাংলাদেশের। দ্রুত কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেই ঠিক হবে না। বরং অংশীজনের পরামর্শ নিয়ে জাতীয় নির্বাচনের পর সংসদে নতুন আইন পাস করাই হবে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
কী ঘটেছে অস্ট্রেলিয়ায়
তামাকের ওপর উচ্চ হারে কর ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ নীতির ফলে অস্ট্রেলিয়ায় বাজার কাঠামো, ভোক্তার আচরণ ও সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত এক দশক ধরে দেশটিতে তামাকপণ্যে বিশ্বের সর্বোচ্চ আবগারি কর আরোপ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতি সিগারেটে এই কর প্রায় ১.৫ অস্ট্রেলীয় ডলার। এছাড়া ফ্লেভারযুক্ত সিগারেট নিষিদ্ধের পাশাপাশি খুচরা পর্যায়ে ভেপপণ্য বিক্রিতে কার্যত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
এর ফল হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় তামাক খাতের রাজস্বে বড় ধস নেমেছে। দেশটিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তামাকের আবগারি কর থেকে সরকারের আয় ছিল ১৬.৩ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ৭.৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদ ক্রিস রিচার্ডসনের হিসাবে, উচ্চ কর ও কঠোর বিধিনিষেধের ফলে অস্ট্রেলিয়ার তামাক খাতে প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।
দেশটিতে অবৈধ তামাক ও ভেপপণ্যের বাজার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ইলিসিট টোব্যাকো অ্যান্ড ই-সিগারেট কমিশনারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে ব্যবহার হওয়া তামাকপণ্যের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই অবৈধ। ভেপের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৯৫ শতাংশ। ধারণা করা হয়, অপরাধী চক্রগুলো অবৈধ তামাক ও ভেপ ব্যবসা থেকে বছরে ৫.৭ থেকে ৮.৫ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার আয় করছে। এতে প্রতিবছর আবগারি কর ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে ৭.৭ থেকে ১১.৮ বিলিয়ন ডলার।
জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও এসব কঠোর বিধিনিষেধ প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে অস্ট্রেলিয়ায় নন-থেরাপিউটিক ভেপ নিষিদ্ধ করার পর প্রথমবারের মতো দেশটিতে নিকোটিন ব্যবহার বেড়েছে। এক জরিপে দেখা গেছে, দেশটিতে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ধূমপানের হার বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের জন্য যে সতর্কবার্তা
অস্ট্রেলিয়ান বর্ডার ফোর্সের ইলিসিট টোব্যাকো স্ট্রাইক টিমের সাবেক প্রধান রোহান পাইক বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতিগুলো বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ যারা তামাকে কর বাড়ানো ও আরো কঠোর নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবছে তাদের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা হতে পারে। ব্যাপক হারে কর বাড়ানো ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফলে মাত্র ছয় বছরে অস্ট্রেলিয়ায় সরকারের রাজস্ব অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে এবং তামাক বাজারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখন কালোবাজারের দখলে।’
তিনি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ায় ফ্লেভারযুক্ত সিগারেট নিষিদ্ধ করায় সেখানে মানুষ আরা বেশি করে কালোবাজারের পণ্যের দিকে চলে গেছে। ভেপ ও অন্যান্য নিকোটিন পণ্যের ওপর কার্যত নিষেধাজ্ঞার ফলে মানুষ সস্তা ও বেশি ক্ষতিকর অবৈধ সিগারেটের দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে ধূমপানের হার কমানোর যে অগ্রগতি হয়েছিল তা এখন উল্টো দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এমন ভুল করলে সেখানে তা সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।’
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো বেশি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য ও রাজস্ব খাত বিশেষজ্ঞ ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘তামাক রাজস্বের ওপর বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল। কিন্তু এখানে আইন প্রয়োগের সক্ষমতা অনেক কম। যদি নিয়মকানুন বাস্তব সক্ষমতার চেয়ে দ্রুত ও কঠোরভাবে চালু করা হয় এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা না যায়, তাহলে সরকার একই সাথে রাজস্ব, বিশ্বাসযোগ্যতা ও বাজারের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। তাই নিয়মকানুন হতে হবে বাস্তবসম্মত এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য।’
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অংশীজনদের সাথে আলোচনা ছাড়াই ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৪-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। খসড়ায় তামাকজাত পণ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি ভেপ ও নিকোটিন পাউচের মতো তামাকের ক্ষতি কমানোর বিকল্প পণ্যও নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সাথে সিগারেটের খুচরা বিক্রেতাদের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে এতে। এ ছাড়া তামাকপণ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশের চেয়েও বেশি হারে কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের বাস্তবতা-বহির্ভূত কঠোর বিধিনিষেধ তামাকের ব্যবহার কমানোর কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। বরং এসব নীতি অবৈধ সিগারেট ও কালোবাজারকে উৎসাহিত করতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সরকারের রাজস্ব আয়ে। একই সাথে নিম্ন আয়ের লাখ লাখ খুচরা বিক্রেতা, শ্রমিক ও তামাকচাষির জীবিকাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশে একক খাত হিসেবে রাজস্ব আয়ের সবেচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে তামাক। দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ আসে তামাক খাত থেকে। তবে বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্যের ওপর বর্তমানে খুচরা মূল্যের প্রায় ৮৩ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, যা ডব্লিউএইচওর সুপারিশ করা ৭৫ শতাংশের চেয়েও বেশি। কভিড-১৯ অতিমারির সময়টা বাদ দিলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাতে সরকারের রাজস্ব আদায় গড়ে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। কিন্তু নানা কারনে বর্তমানে সেই প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় ৫ শতাংশে নেমেছে।
সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রস্তাবিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। অংশীজনের পরামর্শ নিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পরই জাতীয় সংসদে এটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা উচিত। তাঁদের মতে, জনস্বাস্থ্য, রাজস্ব স্থিতিশীলতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
বিজ্ঞপ্তি



