টিকে গ্রুপের মেগা রিফাইনারি ও জ্বালানি খাতে নতুন দিগন্ত

মিজান ফারাবী

দেশের জ্বালানি খাতে ঘটতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক বিপ্লব। বিদেশ থেকে লাখ লাখ টন পরিশোধিত তেল আমদানির নির্ভরতা কমিয়ে, স্বাবলম্বী হওয়ার পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

চট্টগ্রামের জুলদায় তৈরি হচ্ছে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বেসরকারি জ্বালানি রিফাইনারি। আগামী বছরের মার্চেই এই মেগা প্রকল্প পূর্ণ শক্তিতে উৎপাদনে আসছে।

বর্তমানে দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন, অথচ আমাদের একমাত্র সরকারি রিফাইনারি বছরে যোগান দিতে পারে মাত্র ১৫ লাখ টন। চাহিদার প্রায় ৭৭ শতাংশ পরিশোধিত তেলই চড়া দামে বিদেশ থেকে এনে মেটাতে হয়। কিন্তু টিকে গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যালের হাত ধরে নতুন যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ।

নির্মাণাধীন নতুন কারখানাটি চালু হলে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ১৭ লাখ টন বেড়ে দাঁড়াবে মোট ২২ লাখ টনে। ফলে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৫৭ শতাংশ তেল নিজ দেশেই পরিশোধন করা সম্ভব হবে।

আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রক্রিয়াজাত তেল কেনার বদলে কাঁচামাল বা ক্রুড অয়েল এনে দেশে শোধন করলে বেঁচে যাবে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা।

সুপার পেট্রোকেমিক্যালের শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, তাদের নতুন রিফাইনারি পুরোদমে চালু হলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসির বছরে প্রায় ২০ কোটি মার্কিন ডলার সাশ্রয় হবে।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রধানত অকটেন সরবরাহ করলেও, নতুন প্রকল্প চালুর পর তাদের মূল চালিকাশক্তি হবে দেশজুড়ে সর্বাধিক ব্যবহৃত জ্বালানি 'ডিজেল'। পাশাপাশি ফার্নেস অয়েল, মেরিন ফুয়েলসহ অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যও তৈরি হবে যা দেশীয় শিল্প ও নৌ-যোগাযোগে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

জুলদার এই প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। দৈনিক সক্ষমতা বর্তমানে ১৬,৭০০ ব্যারেল থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৫১,৭০০ ব্যারেলে। শুধু শোধনই নয়, জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে বিশাল স্টোরেজ সক্ষমতাও তৈরি করছে টিকে গ্রুপ।

তাদের বিদ্যমান স্টোরেজের সাথে আরো ১ লাখ ৮৪ হাজার টন যোগ হয়ে মোট তেল সংরক্ষণের ক্ষমতা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩ লাখ টনে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি একা দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৪ শতাংশ পূরণ করতে যাচ্ছে, যা আমাদের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে করবে আরো সুসংহত।

বিশ্ববাজারে অস্থিতিশীলতা ও ডলার সংকটের এই সময়ে বেসরকারি খাতের এ সাহসী বিনিয়োগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি নীতিনির্ধারণী সুবিধা ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতার মেলবন্ধনে তৈরি এই রিফাইনারি বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বিপিসির ওপর চাপ কমাবে বহুলাংশে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশকের একক পথচলা শেষে, সুপার পেট্রোকেমিক্যালের এই সুবিশাল উদ্যোগ দেশের জ্বালানি খাতে এক টেকসই ও সাশ্রয়ী নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে।