মাস্তুল ফাউন্ডেশন ও আল যাকাত সাদাকা ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে যাকাতের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণে এনজিও ও করপোরেটের ভূমিকা কনফারেন্স-২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত ওই কনফারেন্সে যাকাতকে একটি কার্যকর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যবস্থায় রূপান্তরের লক্ষ্যে এনজিও ও করপোরেট খাতের অংশগ্রহণ, অভিজ্ঞতা ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
আয়োজক সূত্র জানায়, দারিদ্র্য দূরীকরণে যাকাতের কাঙ্ক্ষিত প্রভাব পুরোপুরি অর্জিত হচ্ছে না। এ অবস্থায় এনজিও ও করপোরেট খাতের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমের সাথে যাকাত ব্যবস্থাপনাকে সংযুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে এই কনফারেন্সে।
কনফারেন্সের আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতভিত্তিক কার্যকর মডেল, যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, প্রভাব মূল্যায়ন এবং এনজিও ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সাথে যাকাত সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম।
দিনব্যাপী এই কনফারেন্সটি তিনটি সেশনে আয়োজিত হয়। তিনটি সেশনের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক মো: দাউদ মিয়া (এনডিসি), ইসলামিক স্কলার ও সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ ড্যাফোডিল’র পরিচালক শায়খ অধ্যাপক ড. মো: মোখতার আহমাদ। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন দেশ-বিদেশের এনজিও’র কান্ট্রি ডিরেক্টর ও প্রতিনিধিরা, দেশবরেণ্য ইসলামিক স্কলার, সরকারি কর্মকর্তা, করপোরেট লিডার ও সমাজসেবীরা।
আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এই কনফারেন্সের মাধ্যমে যাকাত ব্যবস্থাপনায় এনজিও ও করপোরেট খাতের সম্পৃক্ততা বাড়বে এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে উঠবে।
এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক মো: দাউদ মিয়া বলেন, ‘বিভিন্ন এনজিও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দরিদ্র বিমোচনসহ নানা খাতে কাজ করছে। তবে মাস্তুল ফাউন্ডেশন যাকাত ও সদাকার মাধ্যমে দরিদ্র বিমোচনে বিশেষভাবে কাজ করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিজ্ঞ মুফতিদের সমন্বয়ে গঠিত শরিয়া বোর্ড ও দক্ষ অপারেশন টিমের মাধ্যমে তারা শরিয়াহ মোতাবেক যাকাত সংগ্রহ করে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় প্রকৃত হকদারদের কাছে পৌঁছে দেয়। তাই এনজিও ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ দক্ষতা অনুযায়ী মাস্তুল ফাউন্ডেশনের সাথে অংশীদার হয়ে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে যাকাতভিত্তিক দরিদ্র বিমোচনের প্রভাব আরো বিস্তৃত ও কার্যকর হয়।’
মুসলিম এইড’র এক্টিং কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ আকরামুল হক জানান, মাস্তুল ফাউন্ডেশন ও মুসলিম এইড একটি যৌথ রমজান ইফতার ও কোরবানি কর্মসূচির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা প্রদানের জন্য অংশীদারিত্ব করতে আগ্রহী। এই সহযোগিতার মূল লক্ষ্য হলো সারা দেশে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর মাঝে হাজার হাজার ইফতারের খাবার ও ফুড প্যাক বিতরণ করা।
তিনি আরো জানান, ঈদুল আজহা চলাকালীন এই উদ্যোগটি প্রত্যন্ত অঞ্চল ও এতিমখানাগুলোতে কোরবানির গোশতের নৈতিক বণ্টন নিশ্চিত করবে। স্থানীয় পর্যায়ের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে এই অংশীদারিত্বের লক্ষ্য হলো অভাবী মানুষের জন্য মানবিক প্রভাবকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। মুসলিম এইড ও মাস্তুল একত্রে সুবিধাবঞ্চিতদের সেবা করতে এবং এই পবিত্র মাসগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মাস্তুল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক কাজী রিয়াজ রহমান তার বক্তব্যে বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি কাজ শুধুমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য। মাস্তুল ফাউন্ডেশন প্রতিনিয়ত যাকাত তহবিলের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে অসহায় মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা যদি সবাই একসাথে দলবদ্ধভাবে কাজ করি তাহলেই আমরা একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে পারব, ইনশাআল্লাহ।’
আল যাকাত সাদাকা ফাউন্ডেশন, প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও, মিনারাত ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস ও রেডি গ্লোবাল সলিউশনসহ অনেকেই এ কনফারেন্সের সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিল।
উল্লেখ্য, মাস্তুল ফাউন্ডেশন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত একটি স্বনামধন্য ও সেবামূলক জাতীয় প্রতিষ্ঠান। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মাস্তুল ফাউন্ডেশন দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ ও শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে আসছে। ২০১২ সাল থেকে মাস্তুল ফাউন্ডেশন দেশ ও ২০২৩ সাল থেকে দেশের বাইরে মানবিক সেবার অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
২০২৪ সালে গাজা ও ২০২৫ সালে সুদানের সঙ্কটের সময়ে তারা দ্রুত ও জরুরি সহায়তা হিসেবে খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সামগ্রী পৌঁছে দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। দেশের ভেতরে দারিদ্র্য নিরসনে তাদের সমন্বিত ও টেকসই কার্যক্রম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শিক্ষা, সেলাই প্রশিক্ষণ, কম্পিউটার স্কিলসহ নানামুখী কারিগরি প্রশিক্ষণ ও মাস্তুল ফাউন্ডেশনের অন্যতম সফল প্রকল্প ‘যাকাত স্বাবলম্বী’-এর মাধ্যমে অসংখ্য অসহায় ব্যক্তি ও যুব সমাজের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, যা তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলছে।
রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন বিনামূল্যে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিতদের একবেলার খাবার পৌঁছে দিচ্ছে। এতিম শিশু ও প্রবীণদের জন্য নির্মাণাধীন শেল্টার হোম কমপ্লেক্স প্রকল্পটি ভবিষ্যতের প্রতি মাস্তুলের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
সরকারি নিবন্ধিত ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আইন অনুযায়ী, মাস্তুল ফাউন্ডেশনকে প্রদত্ত যেকোনো দান, যাকাত বা সাদাকা আয়করমুক্ত, যা দাতাদের জন্য আয়কর রেয়াত হিসেবে গণ্য হবে।



