হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বড় পরিসরে ভর্তুকিমূলক খাদ্য কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে লাখো পরিবারকে স্বল্পমূল্যে চাল সরবরাহের পাশাপাশি ওএমএস কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। একইসাথে বাজারদর নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও বহুমুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে বলে সংসদে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা।
রোববার (৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনের অষ্টম দিনে বিভিন্ন লিখিত প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য তুলে ধরেন খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো: আব্দুল বারী ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
নীলফামারী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফীর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৫৫ লাখ পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি করে চাল ১৫ টাকা কেজি দরে দেয়া হচ্ছে। বছরে ছয় মাস—আগস্ট থেকে নভেম্বর এবং মার্চ-এপ্রিল—এই কার্যক্রম চালু থাকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে ১০ লাখ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ মার্চ পর্যন্ত ৭ দশমিক ৯৩ লাখ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ৭৯ দশমিক ২৫ শতাংশ।
তিনি আরো জানান, পুষ্টি ঘাটতি পূরণে ভিটামিন এ, বি-১, বি-১২, বি-৯ (ফলিক এসিড), আয়রন ও জিংক সমৃদ্ধ ‘পুষ্টিচাল’ বিতরণ করা হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৪৮টি উপজেলায় ৫ মাসে ৩ দশমিক ৭ লাখ মেট্রিক টন পুষ্টিচাল সরবরাহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বাজারদর সহনীয় রাখতে ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে ১২টি সিটি করপোরেশন, ১৪টি শ্রমঘন জেলা এবং ৫২টি জেলা সদরের ১ হাজার ৯১টি কেন্দ্রে চাল ৩০ টাকা, খোলা আটা ২৪ টাকা এবং ২ কেজির প্যাকেট আটা ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন ১ হাজার ১৮৫ মেট্রিক টন চাল এবং ১ হাজার ৪৩২ মেট্রিক টন আটা বিক্রি করা হচ্ছে।
এছাড়া চালের ঊর্ধ্বমূল্য নিয়ন্ত্রণে ৪১৮টি উপজেলার ৮৩৬টি কেন্দ্রে প্রতিদিন ৪০৬ মেট্রিক টন চাল ৩০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওএমএস খাতে ৩ লাখ মেট্রিক টন চাল ও ৫ দশমিক ২৫ লাখ মেট্রিক টন গমের বাজেট রয়েছে, যার প্রায় ৭০ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডধারীদের মধ্যেও খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে ৬৭ লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৭টি পরিবারকে মাসে ৩০ টাকা কেজি দরে ৩৩ হাজার ৮৩৩ মেট্রিক টন চাল সরবরাহ করা হচ্ছে।
খাদ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, হতদরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাজারমূল্য সহনীয় রাখতে সরকার এসব কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।
অন্যদিকে, সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর সংসদে জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক ও মূল্য যৌক্তিক রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সক্রিয় রয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে The Control of Essential Commodities Act, 1956 যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং ভোজ্যতেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে নির্ধারণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি উন্মুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে নিয়মিত বাজার অভিযান পরিচালনা, আইন লঙ্ঘনকারীদের জরিমানা এবং সরবরাহ চেইন তদারকি জোরদার করা হয়েছে।
বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজকে (বিআইডিএস) দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া চিনি, ভোজ্যতেল ও খেজুর আমদানিতে শুল্ক হ্রাস, এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ব্যাংকিং জটিলতা নিরসনের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
মন্ত্রী আরো জানান, টিসিবি কার্ডের মাধ্যমে প্রায় এক কোটি নিম্নআয়ের মানুষকে ভর্তুকি মূল্যে চাল, সয়াবিন তেল, চিনি ও মশুর ডাল সরবরাহ করা হচ্ছে। সিলেটে পরীক্ষামূলকভাবে কৃষি মার্কেট চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা সফল হলে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।



