বাণিজ্য উপদেষ্টা

জাপানের সাথে ইপিএ’র আওতায় বাংলাদেশের ৯৯.৯ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাবে

‘এ সিদ্ধান্তের ফলে জাতীয় রাজস্বে প্রভাব খুবই সীমিত হবে, যা বার্ষিক আনুমানিক ২০ কোটি টাকারও কম। কারণ এসব পণ্যের অনেকগুলোর ওপর ইতোমধ্যে শূন্য বা স্বল্প শুল্ক বিদ্যমান, যেমন খাদ্যপণ্য, সুতা ও যন্ত্রপাতি।’

নয়া দিগন্ত অনলাইন
জাপানের সাথে বাংলাদেশের ইপিএ
জাপানের সাথে বাংলাদেশের ইপিএ |সংগৃহীত

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তিকে (ইপিএ) দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ বলে অভিহিত করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

তিনি বলেন, এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৯৯.৯ শতাংশ পণ্য জাপানে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাবে।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, মোট সাত হাজার ৩৮৯টি ট্যারিফ লাইনের মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় সব পণ্যই শূন্য শুল্কে জাপানে রফতানি করতে পারবে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময়ে এ বিস্তৃত বাজার সুবিধা দেশের রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

জাপানের সাথে আলোচনার দ্রুত অগ্রগতির কথা তুলে ধরে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, যেখানে অন্যান্য আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলো একই ধরনের চুক্তি করতে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় নিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ মাত্র এক বছরের মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, বিপরীতে বাংলাদেশ জাপানের এক হাজার ৭০টি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিয়েছে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, এ সিদ্ধান্তের ফলে জাতীয় রাজস্বে প্রভাব খুবই সীমিত হবে, যা বার্ষিক আনুমানিক ২০ কোটি টাকারও কম। কারণ এসব পণ্যের অনেকগুলোর ওপর ইতোমধ্যে শূন্য বা স্বল্প শুল্ক বিদ্যমান, যেমন খাদ্যপণ্য, সুতা ও যন্ত্রপাতি।

অন্যান্য খাতের বিষয়ে তিনি জানান, চুক্তিতে সর্বোচ্চ ১৮ বছর পর্যন্ত রূপান্তরকাল (ট্রানজিশন পিরিয়ড) রাখা হয়েছে, যাতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) কাঠামোর মধ্যে স্থানীয় শিল্পগুলো সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা বাড়ানোর পর্যাপ্ত সময় পায়।

বাণিজ্য উপদেষ্টা এই ইপিএ’কে একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি কেবল পণ্য বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেবা ও বিনিয়োগকেও অন্তর্ভুক্ত করে।

তিনি জানান, জাপান বাংলাদেশের জন্য ১২০টি খাত উন্মুক্ত করেছে, আর বাংলাদেশ জাপানের জন্য ৯২টি খাত উন্মুক্ত করেছে।

এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশী পেশাজীবীদের জন্য একটি বিশাল বাজার তৈরি হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাপানের বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সেখানে নার্স, কেয়ারগিভার, শিল্পশ্রমিক, প্রকৌশলী ও চিকিৎসকদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, জাপানে দক্ষ শ্রমশক্তির চাহিদা পূরণে বাংলাদেশে একাধিক ভাষা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করছে, যাতে শিক্ষার্থী ও কর্মীরা জাপানে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সনদ অর্জন করতে পারেন।

তিনি বলেন, এ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বাণিজ্য উদারীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভোক্তাদেরও উপকারে আসবে। বাজার উন্মুক্তকরণ ও জাপানি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বক্তব্য রাখেন।

উল্লেখ্য, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এক যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে গত শুক্রবার টোকিওতে বাংলাদেশ ও জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে ইপিএ স্বাক্ষর করে। এটি কোনো দেশের সাথে বাংলাদেশের প্রথম ইপিএ, যা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পক্ষে দেশটির পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হোরিই ইওয়াও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

ঢাকা ও টোকিওতে অনুষ্ঠিত সাত দফা আলোচনার ফল হিসেবে চূড়ান্ত এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ইপিএ’র ফলে বাংলাদেশে জাপানি প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে, বিশেষ করে উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি ও লজিস্টিকস খাতে।

জাপানের উন্নত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ যুক্ত হওয়ায় দেশীয় পণ্যের গুণগত মান বাড়বে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরো শক্তিশালী হবে।

এছাড়া, চুক্তিটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠবে, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাসস