এআই-এর নতুন মডেলে কি ধসে পড়বে বিশ্ব ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা দেয়াল?

অ্যানথ্রোপিকের নতুন এআই মডেল ‘ক্লদ মিথোস প্রিভিউ’ বিশ্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাইবার প্রতিরক্ষা বর্মকে অনায়াসেই গুঁড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শীর্ষ আন্তর্জাতিক আর্থিক কর্মকর্তারা।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
অ্যানথ্রোপিক
অ্যানথ্রোপিক |সংগৃহীত

অ্যানথ্রোপিকের নতুন এআই মডেল ‘ক্লদ মিথোস প্রিভিউ’ বিশ্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাইবার প্রতিরক্ষা বর্মকে অনায়াসেই গুঁড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শীর্ষ আন্তর্জাতিক আর্থিক কর্মকর্তারা।

ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সম্মেলনে সমবেত বিশ্ব অর্থনীতির নীতিনির্ধারকরা যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কিংবা আকাশচুম্বী ঋণের বোঝা নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে এক নতুন ডিজিটাল আতঙ্ক হয়ে আবির্ভূত হলো এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস বা ‘এফটি’-এর পাঁচ প্রতিবেদক- মার্টিন আর্নল্ড, স্যাম ফ্লেমিং, ক্লেয়ার জোনস, জশুয়া ফ্র্যাঙ্কলিন ও আকিলা কুইনিওর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ব্যাংকিং খাতের সাইবার নিরাপত্তার প্রতিটি স্তরকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক স্টার্টআপ অ্যানথ্রোপিকের এই উদ্ভাবন।

ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর এবং গ্লোবাল রেগুলেটরদের সংগঠন ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বোর্ড’-এর চেয়ারম্যান অ্যান্ড্রু বেইলি বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, এআই দুনিয়া যে অভাবনীয় গতিতে এগোচ্ছে, এ মডেলটি তারই এক ভয়ংকর স্মারক।

পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ওয়াশিংটনের বৈঠকে এখন যুদ্ধের উত্তাপ ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু দখল করে নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা। এমনকি আইএমএফের ডেপুটি হেড এবং মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের সাবেক চিফ অব স্টাফ ড্যান কাটজ স্পষ্ট জানিয়েছেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির এই বিবর্তন সাইবার নিরাপত্তার জন্য যে বিশাল ঝুঁকি তৈরি করছে, তা আগামী কয়েক মাস আন্তর্জাতিক অ্যাজেন্ডায় সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হতে যাচ্ছে।

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দ এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে ব্লুমবার্গ টিভিকে বলেছেন, অ্যানথ্রোপিকের এই উন্নয়ন একটি দায়িত্বশীল কোম্পানির জন্য বড় সাফল্য হতে পারে, কিন্তু এই প্রযুক্তি যদি ভুল হাতে পড়ে তবে তা হবে চরম বিপর্যয়।

মূলত ‘মিথোস’ মডেলটির সব থেকে বড় ভয়ের জায়গা হলো এর স্বয়ংক্রিয় বা ‘অটোনমাস’ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা। এটি মানুষের তুলনায় কল্পনাতীত দ্রুততায় এবং মাত্রায় অসংখ্য সফটওয়্যার ত্রুটিকে একসাথে জোড়া লাগিয়ে একটি শক্তিশালী সাইবার হামলা চালাতে সক্ষম।

অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে যে, তাদের এই মডেল ইতোমধ্যে বিশ্বের প্রতিটি প্রধান অপারেটিং সিস্টেম এবং ওয়েব ব্রাউজারে হাজার হাজার মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি খুঁজে পেয়েছে।

কোম্পানিটি আরো সতর্ক করেছে যে, এমন উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তি সাধারণের হাতে পৌঁছাতে খুব বেশি দেরি নেই, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতি, জননিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হতে পারে।

এই মুহূর্তে অ্যানথ্রোপিক মাত্র ৪০টি বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে- যার মধ্যে রয়েছে জেপি মরগান চেজ, অ্যাপল ও আমাজন- মডেলটি শেয়ার করেছে যাতে তারা নিজেদের সিস্টেমের ত্রুটিগুলো মেরামত করার সুযোগ পায়।

জেপি মরগানের প্রধান নির্বাহী জেমি ডিমন স্বীকার করেছেন, এই এআই মডেল ব্যাংকিং সিস্টেমের এমন সব দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসছে, যা দ্রুত সমাধান করা অপরিহার্য। এমনকি মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা বা প্রধান জয় পাওয়েলের সাথেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিটের বড় ব্যাংকগুলোর প্রধানদের ডাকা হয়েছিল।

তবে এই ডিজিটাল ঝড়ের মাঝেও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিভাজন স্পষ্ট। যেখানে জেপি মরগান কিংবা মরগান স্ট্যানলির মতো ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর স্বপ্ন দেখছে, সেখানে ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রকদের কণ্ঠে শঙ্কার সুর অনেক বেশি চড়া।

মরগান স্ট্যানলির প্রধান নির্বাহী টেড পিক একে একটি ‘বন্ধু প্রযুক্তি’ হিসেবে দেখলেও ইউরোপীয় ব্যাংকিং অথোরিটির প্রধান ফ্রাঁসোয়া-লুই মিশড এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছেন যে, তারা এখনো এ মডেলটি পরীক্ষা করার সুযোগ পাননি, যার ফলে তারা এক প্রকার অন্ধকারে হাতড়াচ্ছেন।

মিশড জানিয়েছেন যে, তারা সাইবার বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিচ্ছেন ঠিকই, তবে এই নতুন ঝুঁকির মোকাবেলায় তারা একদম শূন্য থেকে শুরু করছেন না। কারণ ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকেই তারা সাইবার যুদ্ধে অভ্যস্ত।

এরই মধ্যে ওপেনএআই তাদের ‘জিপিটি-৫.৪-সাইবার’ মডেলটি নিয়ে হাজির হয়েছে, যা সাইবার যুদ্ধের তীব্রতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি নীতিনির্ধারকদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন- নিয়ম তৈরির সঠিক সময় কোনটি? খুব আগে করলে প্রযুক্তির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে, আর দেরি করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত আর ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার এই সন্ধিক্ষণে একটি সমন্বিত বৈশ্বিক নীতিমালা তৈরি করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, বিশ্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ এখন শুধু প্রথাগত অর্থনৈতিক নীতির ওপর নয়, বরং অদৃশ্য এই এআই ঝড়ের ঝাপটা কত দ্রুত এবং দক্ষতার সাথে সামলানো যায় তার ওপরই নির্ভর করছে।

সূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস