বিশ্বব্যাংক গবেষণা

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসানে বছরে কোষাগার থেকে খরচ ৮৮২ বিলিয়ন টাকা

সংস্থাটির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠানের কারণে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ৮৮২ বিলিয়ন টাকা ব্যয় হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় এক দশমিক সাত শতাংশের সমান।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
বিশ্বব্যাংক
বিশ্বব্যাংক |সংগৃহীত

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর (এসওই) ক্রমবর্ধমান লোকসান দেশের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠানের কারণে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ৮৮২ বিলিয়ন টাকা ব্যয় হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় এক দশমিক সাত শতাংশের সমান।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মদক্ষতা ও আর্থিক ঝুঁকি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। অর্থ বিভাগের সহযোগিতায় বিশ্বব্যাংক এ কর্মশালার আয়োজন করে। গবেষণাটি পরিচালনা করে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)।

গবেষণায় বলা হয়, আয় কমে যাওয়া, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়া এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়ার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থা এখন ‘অসহনীয়’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত লোকসান দাঁড়ায় ৪৪১ বিলিয়ন টাকা। একই সময়ে ভর্তুকি ও উন্নয়ন সহায়তাসহ সরকারের মোট নিট আর্থিক সহায়তা বেড়ে প্রায় ৮৮২ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেই সবচেয়ে বেশি লোকসান হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) একাই ৪৪৪ বিলিয়ন টাকার বেশি লোকসান করেছে। উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে উচ্চ ক্ষমতা ভাড়া পরিশোধ এবং উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম ট্যারিফ নির্ধারণকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাবিত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত, বিতর্কিত বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি এবং করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা খাতটির আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।

বড় লোকসানি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরো রয়েছে বাংলাদেশ তেল গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ। পাশাপাশি সার, চিনি ও পাট খাতের কয়েকটি উৎপাদনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানও ধারাবাহিক লোকসানে রয়েছে।

গবেষণায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় গভীর সুশাসন সঙ্কটের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। খণ্ডিত আইন, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং আর্থিক স্বচ্ছতার অভাবকে দুর্বল পারফরম্যান্সের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদে মুনাফার হার (রিটার্ন অন অ্যাসেটস) ছিল ঋণাত্মক পাঁচ দশমিক দুই শতাংশ। বিপরীতে ভারতের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ইতিবাচক নয় দশমিক সাত শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে প্রায় ১১ দশমিক নয় শতাংশ।

গবেষণায় আরো বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ১০ শতাংশ সম্পদে মুনাফা অর্জন করতে পারে এবং ভর্তুকি নির্ভরতা কমাতে সক্ষম হয়, তাহলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত এক দশমিক দুই ট্রিলিয়ন টাকার বেশি আর্থিক সম্পদ সংগ্রহ করতে পারবে।

সংকট উত্তরণে প্রতিবেদনে বাণিজ্যিকভাবে সক্ষম প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, স্বাধীন ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন, আর্থিক তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং একচেটিয়া খাতে ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়-এমন প্রতিষ্ঠান ধাপে ধাপে বেসরকারিকরণ বা বন্ধ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

কর্মশালায় প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বক্তব্য দেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হাসান খালেদ ফয়সাল ও রাহিমা বেগম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশীদ আলম। বাসস