বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের সংঘাতের প্রেক্ষাপটেও দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। হরমুজ প্রণালীর সম্ভাব্য জটিলতা এড়াতে ইতোমধ্যে বিকল্প রুট ও উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে। ফলে পর্যাপ্ত মজুদ, বহুমুখী আমদানি উৎস এবং সরকারের কঠোর নজরদারির ফলে জ্বালানি খাতে কোনো সঙ্কটের আশঙ্কা নেই।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারাদেশে মোট দুই লাখ ৫৫ হাজার ১৮ টন জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক পরিমাণে রয়েছে ডিজেল, যা এক লাখ ২২ হাজার ৬৬০ টন। জ্বালানি ব্যবহারে যা মোট ব্যবহারের প্রায় ৬৩ শতাংশ। এছাড়া অকটেন, পেট্রোল ও জেট ফুয়েলও পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুদ রয়েছে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) জানিয়েছে, আগামী ২০ এপ্রিল সৌদি আরবের ইয়ানবু কমার্শিয়াল পোর্ট থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল জাহাজে লোড করা হবে। পাশাপাশি ‘এমটি নরডিক পলুকস’ নামের একটি জাহাজে থাকা আরো এক লাখ টন তেল বর্তমানে হরমুজ প্রণালীতে অবস্থান করছে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে দুই জাহাজে মোট দুই লাখ টন ক্রুড অয়েল চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ভারত থেকেও পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানি জোরদার করা হয়েছে। গত ১ এপ্রিল আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে সাত হাজার টন ডিজেল আনা হয়েছে। এর আগে, গত ১১ ও ২৩ মার্চ দুই দফায় পাঁচ হাজার করে ১০ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হয়, যা তিন দফায় আমদানির পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার টন।
এছাড়া, গত ১ এপ্রিল মালয়েশিয়া থেকে ২৭ হাজার ৩০০ টন পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে ‘পিভিটি সোলানা’ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তত্ত্বাবধানে এই আমদানি সম্পন্ন হয়। বিপিসি জানিয়েছে, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সিঙ্গাপুর থেকে আরো দু’টি জাহাজ আসবে। এর মধ্যে ‘ইউয়ান জিং হে’ ৩০ হাজার টন ডিজেল এবং ‘সেন্ট্রাল স্টার’ ২৫ হাজার টন অকটেন বহন করবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে সরকার।
অবৈধ মজুদ ও কৃত্রিম সঙ্কট প্রতিরোধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, ভিজিলেন্স টিম গঠন, ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন এবং অবৈধ মজুদের সঠিক তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণাসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, গত ৩ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত অভিযানে অবৈধভাবে মজুদকৃত তিন লাখ ৭২ হাজার ৩৮৮ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ডিজেলের পরিমাণ বেশি।
বৈশ্বিক সঙ্কটেও ভোক্তার ওপর চাপ কমাতে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে অপরিবর্তিত রেখেছে সরকার। গত ৩১ মার্চ জারি করা প্রজ্ঞাপনে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা এবং পেট্রোল ১১৬ টাকা নির্ধারণ করে পূর্বের মূল্য বহাল রাখা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা এবং ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় সরকারের নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সার্বিক বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (মুখপাত্র) মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, সরকার বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক এবং কিছু অংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উৎস থেকে জ্বালানি কেনা পরিকল্পনা হাতে নিয়ে থাকে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নতুন নতুন উৎস থেকে তেল আমদানির চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের প্রায় সব দেশই এখন বিকল্প উৎস খুঁজছে, আমরাও সেই প্রক্রিয়ায় আছি। যেখানে আমরা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত দামে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখান থেকেই আমদানি করা হচ্ছে।
জ্বালানির ঘাটতি নেই জানিয়ে মনির হোসেন বলেন, ‘আমরা জনগণকে বিনীতভাবে জানাতে চাই যে দেশে বর্তমানে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি ক্রয় করুন। একই সাথে অনুরোধ থাকবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমরাও যেন জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হই।’
সূত্র : বাসস



