ব্যাংক খাতে ‘ডিফল্টার সিন্ডিকেট’ লুটেরারা বাঁচে, ডুবে সাধারণ মানুষ

খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ শতাংশের উপরে

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– ব্যাংকিং খাতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ ব্যাংকের মূল ভিত্তিই হলো আমানতকারীর বিশ্বাস। যদি মানুষ মনে করে যে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু গোষ্ঠীর লুটপাটের শিকার হচ্ছে, তাহলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়বে।

আশরাফুল ইসলাম
খেলাপি ঋণ
খেলাপি ঋণ |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘ দিন ধরেই খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, করপোরেট অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনের সঙ্কটে আক্রান্ত; কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে অনেক অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা এখন এটিকে শুধু ‘খেলাপি ঋণের সমস্যা’ নয়; বরং একটি সুসংগঠিত ‘ডিফল্টার সিন্ডিকেট’ হিসেবে দেখছেন। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর তা পরিশোধ না করেও বহাল তবিয়তে ব্যবসা পরিচালনা করছে। অন্য দিকে সাধারণ আমানতকারী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সৎ গ্রাহকরাই শেষ পর্যন্ত এর মূল্য দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছিল। পরের তিন মাসে নামমাত্র ডাউন পেমেন্ট দিয়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঋণ নবায়ন করে খেলাপি মুক্ত হয়। এর পরেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে পাঁচ লাখ কোটিতে দাঁড়ায়, যা মোট ঋণের ৩০ শতাংশের উপরে। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি। কারণ নানা ধরনের পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঋণকে ‘নিয়মিত’ দেখানো হয়। ফলে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্য আড়ালে থেকে যায়।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই ডিফল্টার সিন্ডিকেট মূলত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, ব্যাংকের কিছু অসাধু পরিচালক, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং প্রভাবিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। বিগত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিতর্কিত কিছু ব্যবসায়ী বিশেষ করে এস আলম, সালমান এফ রহমান, নজরুল ইসলাম মজুমদারসহ একশ্রেণীর ব্যাংক লুটেরাকে নিয়ে অলিগার্ক শ্রেণী তৈরি করেছিল। তারা জনগণের আমানতের অর্থ ঋণের নামে নিয়ে দেশে-বিদেশে পাচার করে। তারা পরস্পরের স্বার্থ রক্ষা করে। ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের সময় যথাযথ যাচাই-বাছাই হয় না, জামানতের মূল্য অতিরঞ্জিত করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে কাগুজে কোম্পানির নামেও ঋণ দেয়া হয়। পরে সেই অর্থ বিদেশে পাচার বা অন্য খাতে সরিয়ে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সঙ্কট হলো ‘নৈতিক ঝুঁকি’ বা মোরাল হ্যাজার্ড। বড় ঋণখেলাপিরা জানেন যে, শেষ পর্যন্ত তারা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সুরক্ষা পেয়ে যাবেন। ফলে ঋণ পরিশোধের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। বরং তারা নিয়মিতভাবে ঋণ পুনঃতফসিল করেন, নতুন ঋণ নেন, আবার পুরনো ঋণ ঢাকতে আরেকটি ব্যাংক ব্যবহার করেন। অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠী একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পুরো ব্যবস্থাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। তারা বলেছেন, ব্যাংক লুটেরাদের ছাড় দেয়ার জন্য সংশোধিত ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮ (ক) ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। অতীতের লুটপপাটের চিত্র আড়াল করে মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থ দিয়ে ব্যাংকে ফিরে আসার ধারা যুক্ত করা হয়েছে।

এর বিপরীতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। একটি ছোট ব্যবসা সামান্য কিস্তি বকেয়া পড়লেই ব্যাংকের চাপ, আইনি নোটিশ, জামানত জব্দ কিংবা ঋণ বন্ধের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা সাধারণ চাকরিজীবীরা ব্যাংকের কাছে সবচেয়ে বেশি জবাবদিহির মধ্যে থাকেন। অর্থাৎ বড় ডিফল্টাররা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বেঁচে যায়, আর ছোট গ্রাহকেরাই ডুবে যায়।

ব্যাংক খাতে এই বৈষম্যমূলক বাস্তবতা শুধু আর্থিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করছে না, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়। তখন নতুন বিনিয়োগে অর্থায়ন কমে যায়। শিল্প খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনেও প্রভাব পড়ে। অন্য দিকে ব্যাংকগুলো তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আমানত ও ঋণের সুদের হারে সমন্বয় আনে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকের ওপরই পড়ে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, গত এক দশকে ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ভয়াবহভাবে বেড়েছে। অনেক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এমন ব্যক্তিদের স্থান দেয়া হয়েছে, যাদের ব্যাংকিং সম্পর্কে পেশাগত জ্ঞান সীমিত; কিন্তু রাজনৈতিক যোগাযোগ শক্তিশালী। ফলে ব্যাংকের স্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীগত স্বার্থ অগ্রাধিকার পেয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে একই পরিবার বা গোষ্ঠীর হাতে একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি দুটোই কমে গেছে।

এ ছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেকসময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনিয়ম শনাক্ত করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় বড় খেলাপিদের জন্য বিশেষ ছাড়, ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ কিংবা ডাউন পেমেন্ট কমানোর সিদ্ধান্তও এসেছে। এতে একটি ভুল বার্তা গেছে, ঋণ না শোধ করলেও শেষ পর্যন্ত পার পাওয়া সম্ভব।

অর্থপাচারও এই সঙ্কটকে আরো গভীর করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। ভুয়া আমদানি ব্যয়, ওভার ইনভয়েসিং, অফশোর কোম্পানি ও বেনামী লেনদেনের মাধ্যমে এই অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করা হয়। অথচ সেই ঋণের দায় থেকে যায় দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে শুধু খেলাপি ঋণ কমানোর ঘোষণা দিলেই হবে না; প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। প্রথমত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বড় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও সম্পদ জব্দের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– ব্যাংকিং খাতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ ব্যাংকের মূল ভিত্তিই হলো আমানতকারীর বিশ্বাস। যদি মানুষ মনে করে যে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু গোষ্ঠীর লুটপাটের শিকার হচ্ছে, তাহলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়বে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রশ্ন একটাই– রাষ্ট্র কি ডিফল্টার সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষা করবে, নাকি সাধারণ আমানতকারী ও সৎ উদ্যোক্তাদের পক্ষে দাঁড়াবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে দেশের আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ।