মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, কথাগুলো বলছি অনেক কষ্টে। আমার এই চার-পাঁচ মাসের মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতা আপনার একটু জানা দরকার। আমি দেখছি, কিছুই পরিবর্তন হয়নি। একইভাবে যারা ঘুষ খেত, তারা ঘুষের ফাইল আটকে দিচ্ছে। ভালো একটা কাজকে আটকে দিচ্ছে একইভাবে। ওরা ভোল পাল্টে চলে আসছে। এখন আরো বড় যোদ্ধা হয়ে গেছে ওরা! কথাগুলো আক্ষেপে বলছি। আক্ষেপ এজন্য যে, আমার বয়স অনেক। আমি তো সত্যিকার অর্থেই এবার পরিবর্তনটা দেখতে চেয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত সেটা আমি দেখছি না। তবে আমাদের মধ্যে আশাবাদ রয়েছে এই কারণে যে আমি পরিবর্তন দেখছি একজন মানুষের মধ্যে- তিনি তারেক রহমান সাহেব।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করছেন, নতুন নতুন নজির স্থাপন করছেন। সেই নজিরকে যদি আমরা সবাই মিলে সামনে নিয়ে যাই, তাহলে আমার মনে হয় যে হয়তোবা পরিবর্তনটা হবে। উই মাস্ট অল গিভ হিম সাপোর্ট। সবাই মিলে তাকে সমর্থন দেয়া দরকার।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ডিএফপি অডিটোরিয়ামে জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, আন্দোলন করেছি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনরুদ্ধারের জন্য, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলো মিলে অনেক সভা করেছি, বড় বড় সমাবেশ করেছি, পেশাজীবী সমাবেশ করেছি- সব জায়গাগুলোতে একটা কথাই তখন মনে হতো এবং উচ্চকণ্ঠে বলতাম, ‘তরুণদের দেখতে পাই না।’ আমি সে কথা খুব জোরে জোরে বলেছি যে ‘কোথায় আমার সেইসব তরুণ ও যুবকেরা যারা পরিবর্তন আনবে?’ তরুণ-যুবক ছাড়া তো পরিবর্তন হয় না। নজরুলের সেই কবিতাও বলতাম, ‘কে আছো জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।’ কিন্তু দেখুন, কী অলৌকিকভাবে এই চব্বিশের জুলাইয়ে সেই তরুণরা রাস্তায় নেমে এলো! নেমে এলো প্রথমে তাদের নিজস্ব দাবিতে, পরে সে দাবি পরিণত হলো পরিবর্তনের দাবিতে। খুব পরিষ্কারভাবে, সেই পথ ধরে হাসিনা পালালো এবং পরিবর্তন ত্বরান্বিত হলো।
“অনেক প্রাণ গেছে। আমাদের সন্তানেরা, আমাদের ছেলেরা প্রাণ দিয়েছে। অনেকেই স্বজন হারিয়েছে। আজকেও এখানে উপস্থিত ভাইয়ের প্রতিমূর্তি দেখে মনে পড়ছে যে ‘আমার ভাইটা চলে গেছে।’ আমি যে ছবিটা দেখলাম, এক মা এখনো ভুলতে পারছে না, তার ছেলে বোধহয় এখনো চলে আসবে, কিন্তু ছেলে তো চলে গেছে। সেদিন পার্লামেন্টে একজন মহিলা এমপি, তিনি তার সন্তানকে হারিয়েছেন, তিনিও কথা বলছেন যে ‘আই লস্ট মাই সান’। অনেক মূল্য দিতে হয়েছে, বহুমূল্য! এখন আমরা যদি এই মূল্য দেয়াটাকে ধারণ করতে না পারি, সেটাকে সামনে রেখে যদি আমরা পরিবর্তনের চেষ্টা না করতে পারি, তাহলে তো এই মায়ের অশ্রুধারা ও রক্তস্রোত এমনি এমনিই হারিয়ে যাবে।”
তিনি বলেন, ‘পরিবর্তন কিন্তু একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাপার এবং চলমান ব্যাপার। পরিবর্তন হতেই হবে। কিন্তু সেটাকে একেবারে অত্যন্ত নিয়মের মধ্য দিয়ে, শিক্ষার মধ্য দিয়ে, একটা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পরিবর্তন করা- এটা ছিল একটা ভিন্ন ব্যাপার। আমাদের দেশে ১৯৫২ সালে, তারও আগের কথা বলি, ১৯৪৭ সালে একটা ভাগ হয়ে গেছে, পার্টিশন হয়ে গেছে। সেটাও কিন্তু হয়েছিল বহু আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে। বহু আন্দোলন হয়েছে, বহু প্রাণ গেছে। আপনারা জানেন, বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছে, বহু আন্দোলন হয়েছে, পরিবর্তন এসেছে, একটা নতুন দেশ তৈরি হয়েছে, ভাগ হয়ে পাকিস্তান ও ভারত হয়েছে। সেই পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারাই কিন্তু একসময় আবার আন্দোলন শুরু করল। আমরা সবাই জানি যে পাকিস্তানিরা আমাদের অঞ্চলের মানুষদের বঞ্চিত করেছে এবং তারা আমাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। ভাসানী, শেরেবাংলা ফজলুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, সোহরাওয়ার্দী- এরা সবাই কিন্তু এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে, আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। দুর্ভাগ্য আমাদের, তখন থেকেই আবার সেই একই গান গাইতে হয়েছে- পরিবর্তন চাই, পরিবর্তন করতে হবে। দুর্ভাগ্য এটা যে আমাদের স্বাধীনতার ৫২ বছর হয়ে গেছে। চীনের স্বাধীনতার সময়ও প্রায় একই কাছাকাছি, পাশের যে সিঙ্গাপুর, তারও প্রায় একই সময়। তারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জীবন-জীবিকার মানে কোথায় চলে গেছে! আর আমরা এখন এখানে পড়ে আছি।
মির্জা ফখরুল বলেন, যখনই কোনো পরিবর্তনের কথা বলতে হয়েছে, তখনই প্রাণ দিতে হয়েছে- বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একদম চব্বিশের ২৪ জুলাই পর্যন্ত। আমরা যারা ক্ষমতায় যাই, নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বলুন আর যেভাবে বলুন, কিছুদিন পরে বোধহয় আমাদের কেমিস্ট্রি কাজ করে। আমার কাছে মনে হয়, একটা রসায়ন কাজ করে যে আমি ক্ষমতায় আছি। আমি ছোট্ট করে বলি, ওই চেয়ারটার আলাদা একটা কেমিস্ট্রি আছে। সেই কেমিস্ট্রিটা আপনাকে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে শুরু করিয়ে দেয়।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা খুব আশাবাদী। সবাই মিলে চেষ্টা করব। চেষ্টা করে আমরা দেশটাকে সত্যিকার অর্থেই একটা পরিবর্তিত দেশ, একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, একটা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, মেধাবীদের বাংলাদেশ, তরুণদের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হব। এটাই হোক আজকে তাদের (জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও হতাহতদের) প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমাদের একমাত্র শপথ।



