গণঅভ্যুত্থান স্মরণ

ফিরে দেখা জুলাই ২০২৪

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে গত এক দশকে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে এমন সম্মিলিত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার ঘটনা ছিল নজিরবিহীন।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

গত বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে সিলেটে কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্র গতি পায়। বিশেষ করে ১৪ জুলাই চীন থেকে ফিরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ আখ্যা দেয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

রাত ১১টার দিকে হঠাৎ সৈয়দ মুজতবা আলী হল থেকে শুরু হয় ‘তুমি কে, আমি কে- রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগান। মাত্র কয়েক জন শিক্ষার্থীর শুরু করা প্রতিবাদ মিছিল ছড়িয়ে পড়ে বঙ্গবন্ধু হল, শাহপরাণ হলসহ অন্যান্য আবাসিক হলে।

সে সময় আন্দোলনকারী শাবির লোক প্রশাসনের শিক্ষার্থী আলতাফুর রহমান তাসনিম জানান, মুজতবা আলী হল থেকে ছাত্রদের মিছিল বের হলে শাহপরাণ হলে অবস্থান নেয়া ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তা প্রতিরোধে নামে। এই সময় স্লোগান দেয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর ওপর চড়াও হয় তারা। খবর পেয়ে ঘটনার ১৫ মিনিট পর প্রধান ফটক থেকে আন্দোলনকারী অন্য শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। তারা ছাত্রীদের হলের সামনে গিয়ে স্লোগান দিলে শতাধিক ছাত্রী মধ্যরাতে হল থেকে বের হয়ে প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেয়। মিছিলে নারী শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি আন্দোলনকারীদের মনোবল আরো দৃঢ় করে তোলে।

একপর্যায়ে ক্যাম্পাসে প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও মিছিলকারীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে গিয়ে সমবেত হয়। এই সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ফের মিছিলে হামলা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ঘটে। এতে আন্দোলনকারী বেশ কয়েক জন আহত হন।

এরপরই আন্দোলনকারীরা ছাত্রলীগের বাধা ভেঙে এগিয়ে যায় এবং ‘ভাই তুমি বেরিয়ে পড়ো, নিজ অধিকার আদায় করো’- এই স্লোগান দিয়ে ছাত্রদের হল থেকে মিছিলে আহ্বান জানাতে থাকে। ছাত্রী হল থেকেও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ দেখে সাহস পায় আন্দোলনকারীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে গত এক দশকে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে এমন সম্মিলিত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার ঘটনা ছিল নজিরবিহীন।

পরদিন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

১৪ জুলাই শাবি ক্যাম্পাস ছাড়াও সিলেট শহরে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়। দুপুরে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির বরাবর স্মারকলিপি দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। স্মারকলিপিতে সরকারি চাকরিতে ৯৫ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত এবং সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ অনগ্রসর ও প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়।

সন্ধ্যার পর সিলেট নগরের চৌহাট্টাস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মশাল মিছিল বের করা হয়। যার ফলে ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক আন্দোলন সারা শহরে ছড়িয়ে যায়।

১৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোটা সংস্কারের এক দফা দাবির সাথে একাত্মতা জানিয়ে বিক্ষোভ করে বুয়েট শিক্ষার্থীরা। দুপুর ২টায় ঢাবি অধিভুক্ত ৭ কলেজসহ আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যে সামনে বিক্ষোভ শুরু করতে থাকে। অন্যদিকে আড়াইটার পর জবির সাধারণ শিক্ষর্থীরা পুলিশি বাধা ভেঙ্গে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে গুলিস্তান জিরো পয়েন্টের জড়ো হয়। এরমধ্যেই ঢাবি ক্যাম্পাসে বহিরাগত ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পরিকল্পিত সশস্ত্র হামলা চালায়। বিশেষ করে বিজয় ৭১ হল, ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ হলের সামনে ছাত্রলীগ ও টোকাই লীগের হামলায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় চারপাশ। বর্বরোচিত এ হামলায় আহত হয় শতাধিক।