যে ৩ কারণে বিদ্যুৎ সঙ্কটে দেশ

বেশ কয়েকটি জেলায় খোঁজ নিয়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অনেকটা একই রকম তথ্য পাওয়া গেছে। সাধারণ গ্রাহকদের দাবি, দিনে রাতে সবসময়ই যাওয়া-আসা করছে বিদ্যুৎ।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
লোডশেডিং-এর কারণে দুর্ভোগ বেড়েছে দেশের সাধারণ মানুষের
লোডশেডিং-এর কারণে দুর্ভোগ বেড়েছে দেশের সাধারণ মানুষের |সংগৃহীত

গ্যাস সঙ্কটের মধ্যেই দেশজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নাজেহাল অবস্থা সাধারণ মানুষের।

‘সকাল, দুপুর কিংবা রাত নেই, সবসময়ই বিদ্যুৎ যাচ্ছে- এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের দেড় ঘণ্টা থাকে না,’ এভাবেই বলছিলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল আহমেদ।

তীব্র গরমে ধারাবাহিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বিপাকে পড়েছেন মাগুরা জেলার বাসিন্দা দেবাশিষ বিশ্বাস।

তিনি জানান, ‘গভীর রাতে ঘুমের মধ্যে বিদ্যুৎ গিয়ে আর আসার খবর থাকে না, বাচ্চাকাচ্চা মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বসে থাকে।’

বেশ কয়েকটি জেলায় খোঁজ নিয়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অনেকটা একই রকম তথ্য পাওয়া গেছে। সাধারণ গ্রাহকদের দাবি, দিনে রাতে সবসময়ই যাওয়া-আসা করছে বিদ্যুৎ।

এদিকে, তীব্র গ্যাস সঙ্কটের পর এবার বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্প খাতেও।

নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্প এলাকায় তীব্র জ্বালানি সঙ্কটের কারণে কারখানা বন্ধ রাখার খবর জানিয়েছেন উদ্যোক্তাদের অনেকে।

নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘গতকাল পর্যন্ত একটু একটু করে জ্বালানি পাচ্ছিলাম, আজ তাও বন্ধ হয়ে গেছে।’

ধারাবাহিক লোডশেডিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেককে প্রতিবাদ জানাতে দেখা গেছে।

এদিকে, দেশের গ্রামাঞ্চলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে গ্রিড, উপকেন্দ্র ও অফিসগুলোতে নিরাপত্তা চেয়ে বুধবার পুলিশ প্রধানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। এছাড়া নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ কিংবা প্রশাসনের কাছে পৃথক আবেদন করেছে গোপালগঞ্জ, নীলফামারীসহ বিভিন্ন জেলার বিদ্যুৎ অফিস।

সব মিলিয়ে তীব্র গ্যাস সঙ্কট এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে দেশজুড়ে সঙ্কট বাড়ছে। যদিও বুধবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে জানান বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

তবে এই পরিস্থিতি কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে সেটি নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন বলেও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

তবে বুধবার সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ বিভাগ সারাদেশে জেলা প্রশাসন মার্কেট ও দোকান-পাট বন্ধের সময় এ নিয়ে আনা-সংক্রান্ত নতুন নির্দেশনাও দিয়েছে।

কেন এই সঙ্কট

দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। কিন্তু খাতা কলমে বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। কিন্তু তারপরও বিদ্যুৎ নিয়ে কেন এই অস্থিরতা?

বর্তমানে তীব্র বিদ্যুৎ সঙ্কট এবং রেকর্ড পরিমাণ লোডশেডিংয়ের পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশই গ্যাসভিত্তিক। কিন্তু সম্প্রতি মহেশখালীতে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় অনেক কম গ্যাস পাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না।

এছাড়া দেশের অন্যতম বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বড়পুকুরিয়ার মতো বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন বেসরকারি কেন্দ্র ও আমদানিকারকদের কাছে সরকারের বড় অঙ্কের বকেয়া বিল জমে যাওয়ার কারণেও এই নিয়ে জটিলতা বেড়েছে।

বাংলাদেশে কম-বেশি লোডশেডিং সব সময়ই রয়েছে। কিন্তু গত মাসের ২৮ জুলাই থেকে লোডশেডিংয়ের মাত্রা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে গত ১০ জুলাই এর পরিমাণ ছাড়িয়েছে অতীতের সব রেকর্ড।

ওই দিন দুপুরে ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। অর্থাৎ সেদিন লোডশেডিং হয়েছিল তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি-এর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ঢাকা জোনে ছয় হাজার ৪৩২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫৮৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।

বাকি সবগুলো বিভাগেই চাহিতার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহের তথ্য পাওয়া গেছে।

এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমার সম্ভাবনা কম বলেই মত জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলমের।

তিনি বলছেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় যে পরিমাণ বেড়েছে, সেটি কমাতে হবে। জ্বালানি সংস্থান কিভাবে বাড়ানো যায় সেই চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া সরকারের হাতে আর কোনো উপায় নেই।’

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় দুই হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও মঙ্গলবার সরবরাহ করা হয়েছে ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট।

ফলে জ্বালানি সঙ্কটে অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এখন বন্ধ করে রাখা হয়েছে।

দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং এবং জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে বেশ চাপের মুখে বর্তমান সরকার। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে, বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতির জন্য দেশের সাধারণ মানুষের কাছে দুঃখও প্রকাশ করেছেন সরকারের বিদ্যুৎমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী।

অবশ্য বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, তারা আশা করছেন বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হবে।

তবে গ্যাস এবং বিদ্যুৎ নিয়ে চলমান সঙ্কট পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরো কতদিন সময় লাগতে পারে, এ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি তিনি।

তিনি বলেন, ‘অ্যাক্সিডেন্ট ইজ অ্যাক্সিডেন্স- যার ফলে এলএনজি টার্মিনাল থেকে আমরা এখনো ফুল ক্যাপাসিটিতে কাজ করতে পারছি না। দেশি উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব না, এটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার।’

শপিংমল ও দোকানপাট রাত ৮টায় বন্ধের নির্দেশ

বাংলাদেশের সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। একইসাথে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ এবং আলোকসজ্জা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বুধবার রাতে বিদ্যুৎ বিভাগ সারাদেশে জেলা প্রশাসনকে এ নির্দেশনা পাঠায়।

এর আগে গত ১১ জুন জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, শপিং মল, মার্কেট ও দোকান রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর ছিল।

সবশেষ নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান ও অনুষ্ঠিতব্য মেলা, বাণিজ্য মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এই সময়সীমা প্রযোজ্য হবে। এসব আয়োজন রাত ৮টার মধ্যেই শেষ করতে হবে।

তবে খাবারের দোকান, হাসপাতাল, ওষুধের দোকানসহ সংশ্লিষ্ট জরুরি সেবাগুলো এ নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে।

সূত্র : বিবিসি