আল জাজিরার প্রতিবেদন

বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা কতটা?

দলটি সংখ্যালঘু ভোটারদের দিকেও নজর দিচ্ছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তারা একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতিতেও তাদের সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির বাজিমাত করছে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে একের পর এক সাম্প্রতিক ভূমিধস সাফল্যও দলটির আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামী প্রথমবারের মতো ক্ষমতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে—এমনটাই মনে করছেন দলের সমর্থকরা। ফরিদপুরের ৪৫ বছর বয়সী ব্যাংকার আবদুর রাজ্জাক বলেন, এবারই প্রথম তিনি বিশ্বাস করছেন, তাঁর সমর্থিত দল সরকার গঠনে নেতৃত্ব দিতে পারে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর এটি দেশের প্রথম নির্বাচন। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করায় নির্বাচনী মাঠ মূলত দ্বিমুখী হয়ে উঠেছে—একদিকে বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রনেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-সহ ইসলামপন্থী দলগুলোর জোট।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো জামায়াতের উত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের এক জরিপে বিএনপির সমর্থন ৩৩ শতাংশ এবং জামায়াতের ২৯ শতাংশ পাওয়া গেছে। দেশীয় কয়েকটি সংস্থার সর্বশেষ জরিপে বিএনপি ও জামায়াতের ব্যবধান আরও কমে এসেছে।

এই অবস্থান জামায়াতের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দলটি নিষিদ্ধ ছিল; শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি বা কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং বহু নেতা-কর্মী নিখোঁজ বা নিহত হন। এসব ঘটনার পেছনে ছিল ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়।

১৯৪১ সালে উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, যা আজও অনেকের ক্ষোভের কারণ। স্বাধীনতার পর দলটি নিষিদ্ধ হলেও ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। পরবর্তী সময়ে বিএনপির সঙ্গে জোট করে সরকারেও অংশ নেয় জামায়াত। তবে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় ফেরার পর দলটি আবার কঠোর দমননীতির মুখে পড়ে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে জামায়াত নতুন করে সংগঠিত হয়। দলটির দাবি, দীর্ঘ দমন-পীড়নের কারণে জনগণের সহানুভূতি এখন তাদের দিকে ঝুঁকছে। জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব বলছে, দুই প্রধান দল—আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—নিয়ে মানুষের দীর্ঘদিনের হতাশা থেকেই নতুন বিকল্পের সন্ধান করছে ভোটাররা।

সমালোচকদের আশঙ্কা, ইসলামপন্থী দল ক্ষমতায় এলে শরিয়াভিত্তিক আইন বা নারীর অধিকার সীমিত করার চেষ্টা হতে পারে। এসব আশঙ্কা নাকচ করে জামায়াত বলছে, তারা সংবিধানের মধ্যেই সংস্কারমূলক রাজনীতি করতে চায় এবং নিজেদের ‘মধ্যপন্থী ইসলামি শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরছে।

দলটি সংখ্যালঘু ভোটারদের দিকেও নজর দিচ্ছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তারা একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতিতেও তাদের সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির বাজিমাত করছে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে একের পর এক সাম্প্রতিক ভূমিধস সাফল্যও দলটির আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত এবার তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে পারে, তবে এককভাবে সরকার গঠন করা এখনও কঠিন। একই সঙ্গে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে, যদিও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, আসন্ন নির্বাচন আদর্শিক লড়াইয়ের চেয়ে শাসনব্যবস্থা ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতির ওপরই বেশি নির্ভর করবে। যে জোট জনগণকে স্থিতিশীলতা ও কার্যকর সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা দিতে পারবে, তারাই এগিয়ে থাকবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।