লালদীঘির জনসমুদ্রে ডা: শফিকুর রহমান

বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসবে: হেরে যাবে চাঁদাবাজ-দুর্নীতিবাজরা

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও সারসঙ্কট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দলীয়করণ বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে এ সমাপনী সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম ব্যুরো

Location :

Chattogram
শনিবার রাতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও  জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান
শনিবার রাতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান |নয়া দিগন্ত

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ সরকারকে সতর্ক করার জন্য। ছয় দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে। তিনি বলেন, অপরাধী, চাঁদাবাজ, লুণ্ঠনকারী ও দুর্নীতিবাজরা হেরে যাবে।

শনিবার রাতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশপ্রেমিক ১১ দলীয় ঐক্যের এটি প্রথম লংমার্চ। আজকের কর্মসূচি সরকারকে সতর্ক করার জন্য হলেও পরবর্তী লংমার্চগুলো এমন নাও হতে পারে। আল্লাহর কসম, ছয় দফার একটি দাবিও ১১ দলের জন্য নয়; সবগুলোই দেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থে।

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনগণের সাথে করা ওয়াদা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমাদের আঙুল সোজা আছে, প্রয়োজনে বাঁকা হবে। আমাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করা হয়েছে। গণভোটের গণরায় অস্বীকার করে জনগণের সাথে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। ৭০ শতাংশ মানুষের দেয়া রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা তা আদায় করেই ছাড়ব।

তিনি বলেন, বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসবে এবং এর সাথে ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণের দাবি আদায়ের আন্দোলনে অপরাধী, চাঁদাবাজ, লুণ্ঠনকারী ও দুর্নীতিবাজরা শেষ পর্যন্ত পরাজিত হবে।

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও সারসঙ্কট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দলীয়করণ বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে এ সমাপনী সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

Ctg-Longmarch-05-09====2

বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আন্দোলন, সংগ্রাম ও স্বাধীনতার সূতিকাগার চট্টগ্রাম থেকেই নতুন এ আন্দোলনের যাত্রা শুরু হলো। আগের সরকার যে পথে হেঁটেছে, বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল, সর্বস্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই দেশ পরিচালনা করবেন। কিন্তু প্রশাসক হিসেবে যাদের বসানো হয়েছে, তারা কি নির্বাচিত প্রতিনিধি?

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে সবাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিএনপি কি তাদের সেই কথা রেখেছে? সঙ্কট তারাই তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, অনির্বাচিত সরকারের সময় দেশের যে সঙ্কট ছিল, বর্তমানেও কি সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে? দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের সঙ্কট রয়েছে। বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিল নিয়ে মানুষের ভোগান্তি রয়েছে। সরকারি দলের লোকজন সন্ত্রাস, চুরি ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের মেয়াদ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, একজন মেয়রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তা অনির্দিষ্টভাবে বহাল রাখা হলে সেটি ফ্যাসিবাদী আচরণ কি না, তা জনগণের কাছে প্রশ্ন।

গুম ও হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড, পিলখানার হত্যাকাণ্ড, ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহতদের মৃত্যু এবং আয়নাঘর প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িতদের বিচার জনগণ চায়। এসব ঘটনার বিচার আদায় করে ছাড়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।

সমাবেশের সভাপতির বক্তব্যে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, বর্তমানে দেশে বাকশালের চেয়েও খারাপ অবস্থা বিরাজ করছে। বিভিন্ন স্থানে অনির্বাচিত প্রশাসকদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণের জন্য বহু মানুষ জীবন দিয়েছেন। ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি সেই স্বপ্ন ও শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, গণভোট কোনো খেলনা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। গণভোটের রায় নিয়ে তামাশা করা হলে মানুষ আবার রাজপথে নামবে। এ আন্দোলন প্রয়োজনে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, ঐতিহাসিক লংমার্চ সফলভাবে চট্টগ্রামে পৌঁছেছে এবং পথে পথে মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গেছে। স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া সমস্যা সমাধানে সরকার ব্যর্থ হলে তা স্বীকার করা উচিত।

তিনি বলেন, গণভোটের গণরায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করলে তা জনগণের সাথে প্রতারণার শামিল। নির্বাচিত এমপিদের কার্যকরভাবে কাজ করতে না দিয়ে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ২০২৪ সালের লংমার্চ ছিল স্বৈরাচারের মসনদ ভাঙার লংমার্চ, আর ২০২৬ সালের লংমার্চ বাংলাদেশ গড়ার লংমার্চ। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, পথে পথে জনতার ঢল প্রমাণ করেছে, জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে কোনো সরকারই টিকে থাকতে পারবে না। যারা নতুন করে ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে, চট্টগ্রাম থেকে শুরু হওয়া এ যাত্রা তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের দেয়া রায়কে অবজ্ঞা করা হয়েছে। জনগণের দাবির প্রতি সম্মান না দেখালে তারা রাজপথে নেমে দাবি আদায় করবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, ছয় দফা দাবি কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করা হবে। দাবি মানা না হলে ছয় দফা এক দফার আন্দোলনে পরিণত হবে। তিনি নেতাকর্মীদের ঢাকায় বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে লংমার্চকে স্বাগত জানিয়েছে। গণভোটের ম্যান্ডেট সরকারের স্বার্থে উপেক্ষা করা হচ্ছে। জনগণের দাবি বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরো জোরদার করা হবে।

বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহার, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ এবং চট্টগ্রাম অঞ্চল পরিচালক মুহাম্মদ শাহজাহানও সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানান।

সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমদ, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহার, জামায়াতের নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি মাওলানা শামসুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী এমপি, চট্টগ্রাম মহানগর আমির নজরুল ইসলাম, অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম এমপি, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ওমর ফারুক, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাফর সাদেক, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী, চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ নুরুল আমীন, চাকসু ভিপি ইব্রাহীম হোসেন রনি ও ’২৪-এর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা খান তালাত মাহমুদ রাফি প্রমুখ।

সমাবেশের ফাঁকে ফাঁকে ঢাকার সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী ও চট্টগ্রামের দেশীয় সংস্কৃতি সংসদ গান ও নাটিকার মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা তুলে ধরে।