নাগরিক শোকসভায় বক্তারা

খালেদা জিয়ার আদর্শই হবে আগামীর চালিকাশক্তি

‘বেগম খালেদা জিয়া যখন ভুয়া মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হন, তখন তার পক্ষে কেউ কথা বলেননি। তার বিচারটি ছিল অদ্ভুত ও জঘন্য। তখন এ বিবৃতি নিয়ে অনেক গণমাধ্যমে গিয়েছি। কিন্তু কেউ তা ছাপাতে সাহস করেননি। সময়ের ব্যবধানে একজন নেত্রীর ঠাঁই হয়েছে মানুষের হৃদয়ে। আরেকজন বিতাড়িত ভূমিতে।’

বিশেষ সংবাদদাতা
জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় পরিবারসহ তারেক রহমান
জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় পরিবারসহ তারেক রহমান |নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে বেগম খালেদা জিয়ার নাম লেখা থাকবে। তার মৃত্যুতে সময় এবং আগামীর মৃত্যু হয়নি, বরং খালেদা জিয়ার আদর্শই হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চালিকাশক্তি।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপির মরহুম চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া স্মরণে নাগরিক শোকসভায় এসব কথা বলেন বিশিষ্টজনেরা। এ আয়োজনে বিএনপি বা বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের কেউ বক্তব্য রাখেননি।

সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শোকসভার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। বেলা ৩টায় শুরু হওয়া শোকসভায় রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, লেখক, গবেষক, ধর্মীয় ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, চিকিৎসক, শিক্ষক এবং পেশাজীবী সংগঠনের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা অংশগ্রহণ করেন। বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার সহধর্মিণী ডা: জোবাইদা রহমান, মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান ও মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান।

শোকসভায় বক্তব্য রাখেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ইসলাম, দৈনিক যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান, সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) নূরুদ্দিন খান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবীর, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ নোয়াবের সভাপতি এ কে আজাদ, অর্থনীতিবিদ ও পাবলিক পলিসি বিশ্লেষক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান, ব্রিটিশ আইনজীবী ও মানবাধিকার নেত্রী আইরিন খান, সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের পক্ষে-বিশপ সুব্রত বি গোমেজ, আইসিসিবির প্রেসিডেন্ট মাহবুবুর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম ফায়েজ, শিক্ষাবিদ ড. তাসনিম আরেফা সিদ্দিকী, কূটনীতিক আনোয়ার হাশিম, গবেষক ও অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. রাশেদ আল তিতুমীর, পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, খালেদা জিয়ার চিকিৎসক দলের প্রধান অধ্যাপক ডা: এফ এম সিদ্দিকী, ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক ও ব্যবসায়ী সিমিন রহমান, বিপিকেএসের সিইও এবং ডিপিআইর প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তার দুলাল, লেখক ও চিন্তক ফাহাম আব্দুস সালাম, ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী প্রমুখ। সভার শুরুতে শোকগাথা পাঠ করেন নাগরিক শোকসভার সমন্বয়ক সালেহ উদ্দিন।

অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল ইসলাম বলেন, বেগম খালেদা জিয়া যখন ভুয়া মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হন, তখন তার পক্ষে কেউ কথা বলেননি। তার বিচারটি ছিল অদ্ভুত ও জঘন্য। তখন এ বিবৃতি নিয়ে অনেক গণমাধ্যমে গিয়েছি। কিন্তু কেউ তা ছাপাতে সাহস করেননি। সময়ের ব্যবধানে একজন নেত্রীর ঠাঁই হয়েছে মানুষের হৃদয়ে। আরেকজন বিতাড়িত ভূমিতে। বেগম খালেদা জিয়া সৎ ও সাহসী ছিলেন। বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, তত দিন তাকে ধারণ করতে হবে।

সিনিয়র সাংবাদিক শফিক রেহমান বলেন, আমরা একটি সঙ্কটকালীন মুহূর্তে আছি। যেকোনোভাবেই হোক ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেন হয়। আমিও সেটা চাই। ভোটকেন্দ্রে সবাই যেতে হবে উৎসবমুখরভাবে। ভোটের পরিবেশ যেন বিঘ্নিত না হয়। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হতে হবে। বেগম খালেদা জিয়ার শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে।

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, আমি স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করি। বেগম খালেদা জিয়ার আমলে তার সাথে একাধিকবার দেখা করেছি। তিনি উৎসাহিত করতেন। গণতন্ত্রে তার অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। বিগত সরকার তাকে নানাভাবে নির্যাতন করেছে। এতকিছু করার পরও ৭ আগস্ট তিনি আমাদের যে বাণী দিয়েছেন তা তার উদারতার পরিচয় বহন করে। তিনি বলেছেন, ধবংস নয়। ভবিষ্যতের ভালোবাসা ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার কথা বলেছেন। খালেদা জিয়ার এই বাণীকে যেন আমরা লালন করি।

খালেদা জিয়ার জানাজার প্রসঙ্গ তুলে নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবীর বলেন, সেদিন বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বিএনপির এক নেতা লাখ লাখ মানুষকে কথা দিয়েছিলেন যে তাদের রাজনীতি খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক আদর্শে পরিচালিত হবে। এ কথা রাখতে বিএনপিকে অনুরোধও করেন তিনি।

নুরুল কবীর বলেন, খালেদা জিয়া কেবল একটি জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী ছিলেন না; তিনি সত্যিকার অর্থেই মানুষ ও দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন, যা দলমত নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষের জানাজায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, মানুষ ও রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার যে গুণটি আমাকে বরাবরই আকৃষ্ট করেছে, তা হলো তার রুচিশীলতা ও পরিমিতিবোধ। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন দীর্ঘ দিন ধরে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শালীনতা ও সংযমের ঘাটতি প্রকট ছিল। তখন আমি লক্ষ করেছি, তিনি নিরন্তর ও বিনা ব্যতিক্রমে একজন রাজনীতিক হিসেবে নিজের ওপর ও তার পরিবারের ওপর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছ থেকে যে আঘাত ও দুর্ভোগ নেমে এসেছে, সেসবের প্রতিক্রিয়ায় তিনি কখনোই প্রকাশ্যে নিজের বেদনা, ক্ষোভ কিংবা নিন্দাসূচক কোনো বক্তব্য উচ্চারণ করেননি।

দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও সংগ্রামের পতাকা আজ তারেক রহমানের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। এটি যেমন গর্বের বিষয়, তেমনি এক গভীর দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জেরও বিষয়। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ও শহীদ জিয়াউর রহমানের সন্তান হওয়া নিঃসন্দেহে গর্বের। কিন্তু একই সাথে এটি একটি ভয়ের ও শঙ্কার বিষয়ও। কারণ বাংলাদেশের মানুষ সবসময় তারেক রহমানকে তার বাবা ও মার সাথে তুলনা করবে। এই তুলনা অত্যন্ত কঠিন যেকোনো মানুষের জন্যই। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে মাত্র দুইজন নেতা-নেত্রী জন্মেছেন, যাদের সমতুল্য হওয়া কঠিন। আর তারা যদি বাবা-মা হন, তাহলে সেই সন্তানদের জন্য দায়িত্ব আরো অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও, তারে বহিবারে দাও শক্তি’। তিনি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলেন, আল্লাহ যেন তারেক রহমানকে এই ঐতিহাসিক পতাকা বহন করার শক্তি ও সামর্থ্য দান করেন।

ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, মানুষ বেগম জিয়াকে অনন্তকাল স্মরণ করবে। কারণ, দেশের জন্য তার ত্যাগ ও নিষ্ঠা অপরিসীম। তিনি এ দেশের মানুষ, গাছ, লতাপাতা ও পানি ভালো ভাসতেন। বলতেন, দেশের বাইরে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই। বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলেও তার আদর্শ চির অমøান হোক। আল্লাহ আমাদের নেত্রীকে বেহেশত দান করুন।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার সময়টাকে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে। এক কঠিন মুহূর্তে রাজনৈতিক উত্থান পর্ব। তখন তিনি ছিলেন আপসহীন। সরকার গঠন। এই সময়ে তার সাফল্য ও ব্যর্থতা আছে। আর ২০০৭ সাল থেকে আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় দিতে হবে তিনি নিরপেক্ষ পদ্ধতিতে নির্বাচনে প্রথম প্রধানমন্ত্রী।

লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট ফাহাম আবদুস সালাম বলেন, বিএনপি ২০ বছর অত্যাচারের পরও জনগণের ভালোবাসায় টিকে রয়েছে। এর মূল কারণ বেগম জিয়ার দৃঢ়চেতা রাজনীতি।

ব্যবসায়ী সিমিন রহমান বলেন, বেগম খালেদা জিয়া মানুষ হিসেবে আপসহীন ছিলেন। দেশের অর্থনীতিতে তার অবদান ছিল। তিনি বলতেন, ব্যবসা করতে হবে নৈতিকতার সাথে। আমার বাবা লতিফুর রহমানের কাছ থেকে শুনেছি, বেগম খালেদা জিয়া সঠিকভাবে ব্যবসা করতে বলেছেন। তার জান্নাত কামনা করছি।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর ঘটেছে, শিল্পায়ন হয়েছে।

সভাপতির বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম খালেদা জিয়া। তিনি সাধারণ রাজনীতিবিদ ছিলেন না। ছিলেন রাজনৈতিক আদর্শ। ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন অসাধারণ দৃঢ়চেতা। কঠিন সময়েও চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ধ্বংস নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমার বিবেচনায় তিনি বিচক্ষণ। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধি দেয়ার দাবি জানাই।

নাগরিক শোক সভায় শ্রোতাদের সারিতে স্ত্রী ও সন্তানসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য রাখেননি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ ছাড়াও বিএনপির কোনো নেতাও বক্তব্য রাখেননি। শোকসভায় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন– বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) ফজলে এলাহী আকবর, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলসহ সিনিয়র নেতারা।

এ ছাড়াও যুগপতের শরিকদের মধ্যে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। শোক সভায় সভায় যোগ দেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ, মনির হায়দার প্রমুখ।