জামায়াত আমির

সকল দেশের সাথে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী কিন্তু কাউকে আমাদের প্রভু হতে দেবো না

‘যাদের ৩৯ জন এমপি প্রার্থী ঋণখেলাপি (ব্যাংক ডাকাত) তারা দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারবে না। অন্তত ওই দলের মুখে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কথা মানায় না। চোর-ডাকাতদের সংসদে নিয়ে চোর-ডাকাত মুক্ত করা যায় না। দুর্নীতিবাজ আর চাঁদাবাজদের দিয়ে দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধ করা যায় না।’

নয়া দিগন্ত অনলাইন

Location :

Dhaka City
ঢাকা-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান
ঢাকা-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান |নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা সকল দেশের সাথে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী কিন্তু কাউকে আমাদের প্রভু হতে দেবো না। কেউ যদি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে চেষ্টা করে তবে তার উপযুক্ত জবাব দেয়া হবে।’

রোববার (২৫ জানুয়ারি) বিকেলে ঢাকা-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় তিনি ১১ দলীয় ঐক্যজোটকে বিজয়ী করে চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ বুঝে নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘যাদের ৩৯ জন এমপি প্রার্থী ঋণখেলাপি (ব্যাংক ডাকাত) তারা দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারবে না। অন্তত ওই দলের মুখে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কথা মানায় না। চোর-ডাকাতদের সংসদে নিয়ে চোর-ডাকাত মুক্ত করা যায় না। দুর্নীতিবাজ আর চাঁদাবাজদের দিয়ে দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধ করা যায় না।’

তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরা জাতিকে পথ দেখাবেন, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবেন কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বিগত ৫৪ বছরে যারা পালাক্রমে দেশ শাসন করেছে তারা ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, তরুণ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নিতে পারেনি। ফলে যুব সমাজের অনেকে বিপদগামী হয়ে উঠেছে। এরাই মূলত চাঁদাবাজি করছে, সন্ত্রাসী করছে, লুটপাট করছে, দখলদারিত্ব করছে। ১১ দলীয় ঐক্যজোট সরকার গঠনের সুযোগ পেলে সামাজিক দায়িত্ব গুলো রাষ্ট্রকর্তৃক পালন করা হবে। আমাদের আগামীর পরিচয় হবে ‘আমিই বাংলাদেশ’। যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, কর্মের অধিকার নিশ্চিত হবে।

তিনি আরও বলেন, ১৯৪৭ সালে আমরা বৃটিশদের হাত থেকে স্বাধীন হয়েছিলাম কিন্তু আমরা স্বাধীনতা ভোগ করতে পারিনি, ১৯৭১ সালে আবার আমরা পাকিস্তানের হাত থেকে স্বাধীন হয়েছে কিন্তু স্বাধীনতা পাইনি। চব্বিশে আমরা আধিপত্যবাদের দোসর ফ্যাসিবাদের হাত থেকে মুক্ত হয়েছি আর কোনো ফ্যাসিবাদ আমরা দেখতে চাই না। জুলাই কারো একার নয়, জীবন দেবো জুলাই দেবো না। জুলাই আন্দোলনে একক কোনো মাস্টারমাইন্ড ছিল না। এদেশের ১৮ কোটি জনগণ জুলাইয়ের মাস্টারমাইন্ড।

জামায়াত আমির বলেন, সমাজকে বদলে দিতে তিনি যুব সমাজকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আগামীর নেতৃত্ব দেবে তরুণ প্রজন্ম। জামায়াতে ইসলামী তরুণ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহন করেছে। ক্ষমতায় গেলে বেকার ভাতা দিয়ে বেকারত্বের মহাসাগর সৃষ্টি না করে যুব সমাজকে দক্ষ উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, যুব সমাজ হবে আগামীর বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি।

দেশের জনগণ এক জালিমকে বিদায়ী করে আরেক জালিমের হাতে দেশ তুলে দিতে চায় না উল্লেখ করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, দেশের জনগণ দীর্ঘ দিন ভোট দিতে পারেনি। বিশেষ করে তরুণ যুব সমাজ জীবনে একটিবারও ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে আর কাউকে জনগণের ভোট নিয়ে ছিনিমিনি করতে দেয়া হবে না। কেউ ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করলে কিংবা ভোট চুরির চেষ্টা করলে তাদের প্রতিহত করতে হবে। জনগণের বিজয় নিশ্চিত করতে জনগনকে সজাগ থাকতে তিনি আহ্বান জানান।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্ণেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল একটি ন্যায় ভিত্তিক সমাজ হবে, অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে, বাংলাদেশের মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকবে। কিন্তু সেই লক্ষ্য আজও পূরণ হয়নি।

তিনি বলেন, দেশবাসী আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শাসন ব্যবস্থা দেখেছে। বিএনপি সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যে কেবলমাত্র তিনিসহ জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ দুর্নীতির দায়ে জেলে যেতে হয়নি। যারা ক্ষমতায় থেকে এক পয়সাও দুর্নীতি করেনি তাদের এবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নিতে হবে। তাহলেই দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠন সম্ভব হবে।

তিনি আরো বলেন, জুলাই আন্দোলন চলাকালীন বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, জুলাই আন্দোলনের সাথে তার দলের কোনো সম্পর্ক নেই! কারণ তারা আজকের পরিস্থিতি চায়নি, তারা চেয়েছে হাসিনা ক্ষমতায় থাকুক। কর্ণেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম দেশবাসীকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করে মোদির সেবাদাস দল ও নেতাদের বয়কট করার আহ্বান জানান।

১১ দলীয় জোট সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান বলেন, বিগত ৫৪ বছর ঢাকা-৬ সংসদীয় এলাকার জনগণ কেবল ট্যাক্স আর ভ্যাট দিয়েই আসছে কিন্তু জনগণ রাষ্ট্রের কাছ থেকে তেমন কিছু পায়নি। চাঁদাবাজদের স্বর্গরাজ্য ঢাকা-৬। এই এলাকা থেকে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস, দুর্নীতিবাজ ও দখলবাজদের নিমূর্ল করে আধুনিক ঢাকা হিসেবে পুরান ঢাকাকে গড়ে তুলতে তিনি আমীরে জামায়াতের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

১১ দলীয় জোট সমর্থিত শাপলা কলি প্রতীকে ঢাকা-৮ আসনে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী নাসিরউদ্দীন পাটেয়ারী বলেন, যখন আমাদের সংস্কার এবং বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে তখন গণতান্ত্রিক পথে আমাদের নতুন যাত্রা শুরু হবে।

তিনি বলেন, যারা নতুন করে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চায়, যারা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে চায়, যারা বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করতে চায় তারাই সংস্কারের বিপক্ষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে চাইবে না। যারা বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে খুনি হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং সেখানে বসে বাংলাদেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে সহযোগিতা করছে তারা কখনো বন্ধু রাষ্ট্র হতে পারে না।

তিনি ঢাকা-৬ আসনের জনসাধারণের উদ্দেশ্যে বলেন, চাঁদাবাজ, দখলবাজ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি থেকে মুক্তি পেতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিবেন। ১১ দলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজ থেকে সকল অপকর্ম নির্মূল হবে।

তিনি বলেন, খোকা পুত্রের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজের বিরুদ্ধে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিতে হবে। জমিদারি প্রথা উপড়ে দিতে হবে।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি মানুষ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এবং ইনসাফের পক্ষে রায় দিবে। সারা বাংলাদেশের মানুষ আর জেগে উঠেছে। তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদেরকেই নির্বাচিত করছে যারা কথা ও কাজে এক। যাদের কথা ও কাজের মিল নেই তাদেরকে শিক্ষার্থীরা যেভাবে বয়কট করেছে জাতীয় নির্বাচনেও জনগণ তাদেরকে সেভাবে বয়কট করবে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা-৬ আসন কমিটির পরিচালক কামরুল আহসান হাসানের সভাপতিত্বে ধুপখোলা মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির আব্দুস সবুর, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা জহিরুল ইসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, এবি পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী নাসির উদ্দিন, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ, জুলাই শহীদ জুনায়েদের বাবা শেখ জামাল হোসেন, জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, ওয়ারী থানা পূর্ব থানা আমির মোতাসিম বিল্লাহ, সূত্রাপুর দক্ষিণ থানা আমির দাইয়্যান সালেহীন প্রমুখ।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দসহ ঢাকা-৬ আসনের সকল থানা ও বিভাগীয় দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।