বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত। জামালপুর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার অংশগ্রহণ করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। বিএনপির অর্থনৈতিক পলিসি, দল পরিচালনায় অর্থের যোগান, দলের প্রাথমিক সদস্য পদ নবায়ন ও দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে। শনিবার (৩ মে) সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অনলাইন প্রতিবেদক অসীম আল ইমরান।
নয়া দিগন্ত : ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ পতনের প্রায় ১০ মাসের বেশি হয়েছে। দেশের রাজনীতি, নির্বাচন কোন দিকে যাচ্ছে?
রশিদুজ্জামান মিল্লাত : সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় যদি হয় তাহলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে তারা চলে যাবে। তাদের চলে যাওয়া উচিত হবে। সব দেখে মনে হচ্ছে, এ বিষয়ে সরকার চেষ্টা করছে, তাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু ফ্যাসিস্টরা নানাভাবে ষড়যন্ত্র লিপ্ত আছে। দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে আজকে একটা বিশৃঙ্গলার করছে, কাল আরেকটা করছে। কখনো একযোগে অপকর্ম করছে। দেশব্যাপী ধর্ষণের যে ঘটনা ঘটছে সেখানেও ফ্যাসিস্টদের মদদ আছে। এগুলো সামলানো সরকারের জন্য কঠিন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঠিকভাবে মজবুত হয়নি। সেনাবাহিনীরও মাত্র ৩০ হাজার ফোর্স রয়েছে মাঠে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ড. ইউনুসের যে সুখ্যাতি রয়েছে তা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য দ্রুত একটা নির্বাচন প্রয়োজন। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, এটা যেন অটুট থাকে।
নয়া দিগন্ত : বলেছেন, ‘যদি শুভবুদ্ধির উদয় হয়’। তাহলে অন্য কিছুর সম্ভাবনা রয়েছে?
রশিদুজ্জামান মিল্লাত : অনেক উপদেষ্টারা অনেকভাবে বক্তব্য দেন। নির্বাচন নিয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে চায় না। কম সংস্কার, বেশি সংস্কার-এই সব বলেন। তাদের বক্তব্যে অনেক গড়মিল দেখা যায়। তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। বুদ্ধি থাকলে গড়-মিলের কথা বলা উচিত না। তারা সারা দেশের পরিস্থিতি তো দেখছে। তারপর পার্শ্ববর্তী একটি দেশের কর্মকাণ্ড দেখছে। শেখ হাসিনাসহ সকল ফ্যাসিস্টরা ভারতে। তাদের লুটপাটের টাকা দেশকে অস্থিতিশীল করতে ব্যবহার করছে। এসব থামাতে হলে রাজনৈতিক সরকার দরকার। মব ঠেকানোর জন্যও রাজনৈতিক সরকার দরকার।
নয়া দিগন্ত : বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলবাজির অভিযোগ উঠছে। এ বিষয়ে কী বলবেন?
রশিদুজ্জামান মিল্লাত : বিএনপি অনেক বড় দল। সবগুলো রাজনৈতিক দল এক জায়গায় করলে বিএনপির সমান হতে পারবে না। এত বড় দল, নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে ফ্যাসিস্ট উৎখাত হওয়ার পর ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট দেশ সরকারবিহীন ছিল। তখন এগুলোর নিয়ন্ত্রণ বিএনপি করেছে। ফ্যাসিস্টরা বিএনপির নেতাকর্মীদের সাথে যে ব্যবহার করেছে তার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তখন কেউ কেউ হয়তো অতি উৎসাহী হয়ে কিছু করার চেষ্টা করেছে। আক্রোশ থেকে করেছে। কেউ ভেবেছে, আমার জমি-বাড়ি ব্যবসা-বাণিজ্য দখল করেছিল, ভাই আত্মীয়-স্বজনকে মেরেছিল। এখন আমিও মারব, আমিও দখল করব। আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল, আমিও নেব। এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবুও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য তাদের চিহ্নিত করে প্রায় ১৭০০ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার ও পদ স্থগিত করা হয়েছে। যারা এ ধরনের কাজ করছে তাদের শাস্তি আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দিয়েছে। তখনকার ঘটনা নিয়ে এখন অন্য দলগুলো সামনে আনার চেষ্টা করছে। বিএনপির সকল নেতাকর্মী এখন আন্ডার কন্ট্রোল। বিএনপির নেতাকর্মী এখন ভয় পাচ্ছে যে কিছু হলে আর দলে থাকতে পারব না। যেহেতু বিএনপির সম্ভাবনা রয়েছে আগামী দিনে সরকার গঠন করার। সবাই সরকারি দলে থাকতে চায়, কেউ বহিষ্কার হতে চায় না। এজন্য এখন নেতাকর্মীরা ভয় পায়। এই সুযোগে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সুবিধাবাদীরা চাঁদাবাজি, দখলবাজি করে বিএনপির নামে দোষ চাপাচ্ছে।
নয়া দিগন্ত : ছাত্রদের নতুন দল নিয়ে মূল্যায়ন কী?
রশিদুজ্জামান মিল্লাত : নতুন দলের প্রতি আমাদের শুভকামনা রয়েছে। আমরা চেয়েছি ছাত্ররা একটা দল গঠন করুক। একটা রাজনৈতিক চর্চায় আসুক, অভিজ্ঞতা অর্জন করুক, প্যারালাল সংগঠন তৈরি হোক। এক দল দিয়ে দেশ চলে না। একটা বিরোধীদল থাকতে হয়, একটা সরকারি দল থাকতে হয়। সরকারের সমালোচনা করার জন্য অবম্যই বিরোধীদল থাকতে হয়। এটা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমরা সব সময় দোয়া করি ছাত্রদের নতুন দল ভালো করুক। কিন্তু প্রথমেই যদি পচে যায়, নষ্ট হয়ে যায়। মেধা-ভিত্তিক রাজনৈতিক না করে টাকা ভিত্তিক রাজনীতিতে চলে যায় তাহলে তাদের দ্বারা আর কিছু আশা করা যায় না। এজন্য আমরা একটু চিন্তিত।
নয়া দিগন্ত : বিএনপি বিশাল একটি দল, দল চালানোর টাকা কোথায় থেকে আসে?
রশিদুজ্জামান মিল্লাত : সদস্যদের জন্য মাসিক চাঁদা রয়েছে। গত ১৭ বছরে চাঁদা সঠিকভাবে কালেকশন করা হয়নি। নতুন করে শুরু করেছি। প্রতি বছর দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার চাঁদা আসার কথা। খরচ বলতে কেন্দ্রে কিছু পোস্টার, লিফলেট করা, বিভিন্ন ধরনের মঞ্চ তৈরি করা। এর পাশাপাশি কিছু স্টাফ রয়েছে, তাদের বেতন দেয়া। এইগুলো এই চাঁদার টাকা দিয়ে হয়ে যায়। তাছাড়া অনেক লোকে ডোনেট করে। বিদেশের কিছু লোকেরা ডোনেট করে। নির্বাচনের সময় অনেকে টাকা দিতে চায়। বড় অনুদান আমরা নিচ্ছি না। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্দেশ দিয়েছে না নিতে। ৫ আগস্টের পর অনেক ব্যবসায়ী গ্রুপ বিএনপিকে এপ্রোচ করেছিল দলীয় ফান্ডে টাকা দেয়ার। তারা বলেন, ‘আপনাদের দলীয় ফান্ডে কিছু টাকা দেয়। দরকার হয় আমাদের বৈধ টাকা থেকে টাকা দেবো, অসুবিধা নাই।’ বিষয়টি আমি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে বলেছিলাম, তিনি নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, টাকা নেয়ার দরকার নাই। স্টাফদের বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচ চালানোর মত টাকা আমাদের অ্যাকাউন্টে রয়েছে। জেলা উপজেলা পর্যায়ে যারা নেতা আছেন তারা দলকে পরিচালনা করে থাকে। সে জন্য খুব একটা টাকার প্রয়োজন হয় না।
নয়া দিগন্ত : আপনি বলেছেন অনুদান হিসেবে বড় অ্যামাউন্ট নিচ্ছেন না। বড় অ্যামাউন্টের পরিমাণ কত?
রশিদুজ্জামান মিল্লাত : তারা দিতে চাচ্ছে। দিতে চাইলে কমপক্ষে দুই-তিন কোটি টাকা দিতে চাইবে।
নয়া দিগন্ত :কেনো নিচ্ছেন না?
রশিদুজ্জামান মিল্লাত : নিলে বিষয়টি অন্যদিকে যেতে পারে। অনেক ভাবতে পারে বিএনপি চাঁদাবাজি করছে। দেখেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে কেউ হয়ত বিভিন্ন লবি করে নমিনেশন নেয়ার চেষ্টা করেছে। কোনো নেতাকে হয়তো টাকা দিয়েছে, হয়তো দেয় নাই। আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ নাই। তারপরও অনেক গুজব ছড়িয়েছিল। এবার এগুলো থেকে সতর্ক থাকছি। আমরা যা করব তা জনপরিসরে স্বচ্ছতার মাধ্যমে করব। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিরিয়াস।
নয়া দিগন্ত : নির্বাচনী ফান্ড গঠনের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?
রশিদুজ্জামান মিল্লাত : নির্বাচনী ফান্ডের জন্য সদস্যপদ নবায়ন করা হচ্ছে। এরপর নতুন সদস্য সংগ্রহ ফর্ম বিতরণ শুরু করব। আর নির্বাচনের সময় কেউ যদি ডোনেট করতে চাই, দলীয় ফান্ডে টাকার ঘাটতি পরে তখন স্থায়ী কমিটির আলোচনার ভিত্তিতে করতে চাই। সেটা স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হবে। প্রত্যেকটা বিষয় স্বচ্ছতার মাধ্যমে হবে।
নয়া দিগন্ত : অনেক রাজনৈতিক দল গণতহবিলের কথা বলছে। বিএনপির জন্য গণতহবিলে কোনো প্রস্তাব দিবেন কি না?
রশিদুজ্জামান মিল্লাত : আমি কখনো রাজি হব না। গণ-ফান্ডিং এর নামে গণ-লুটপাট হয়। এদেশের মানুষ স্বচ্ছতা মেইনটেইন করে চলে না। দিন দিন মানুষ শুদ্ধিকরণের পথে যাবে এটা আমাদের আশা। আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যে ইচ্ছা, বক্তব্য, তার নির্দেশনা তাতে বলা যায় সব কিছু স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই হবে। সে ক্ষেত্রে আমার প্রস্তাব থাকবেই সদস্য ফরম, সদস্য সংগ্রহ। আমাদের কিছু ফান্ড ইতোমধ্যে রয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে সব মিলে নির্বাচনের ব্যয় কত ধরা হবে সেই আলোকে চিন্তা করে নির্বাচনী ফান্ডিংয়ের ব্যাপারে স্থায়ী কমিটির কাছে প্রস্তাব দেবো। মনোনয়ন গত বছর পঞ্চাশ হাজার টাকা ছিল। এবার এটা হয়তো বৃদ্ধি করব। এক লাখ বা দু’ লাখ করা যেতে পারে। এতে একটা ফান্ড রিচ হবে। এ ব্যাপরে এখনো আলোচনা হয় নাই। তবে আমি বাড়ানোর জন্য প্রস্তাব দেবো।



