ইউপি সদস্য থেকে সংসদ সদস্য হওয়ার প্রেক্ষাপট জানালেন জামায়াত এমপি

তিনি রাজনীতি শুরু করেছিলেন একেবারে তৃণমূল থেকে। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক জীবনের যাত্রা শুরু হয়।

সংসদ প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখছেন মোহাম্মদ আব্দুল গফুর
জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখছেন মোহাম্মদ আব্দুল গফুর |সংগৃহীত

ইউনিয়ন পরিষদের একজন সাধারণ সদস্য (মেম্বার) থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার গল্প সংসদে তুলে ধরেছেন কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল গফুর।

এ সময় তিনি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে উল্লেখ করে এটিকে উচ্চাভিলাষী, ঋণনির্ভর এবং বাস্তবায়ন-সংশয়পূর্ণ বলে মন্তব্য করেন।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

বক্তব্যের শুরুতেই নিজের রাজনৈতিক জীবনের উত্থানের কথা তুলে ধরে আব্দুল গফুর বলেন, তিনি রাজনীতি শুরু করেছিলেন একেবারে তৃণমূল থেকে। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক জীবনের যাত্রা শুরু হয়। পরে চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৩ সাল থেকে শুরু হওয়া এই রাজনৈতিক পথচলায় কখনো বিরতি আসেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বাজেটের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘দেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় বাজেট হলেও এতে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। বাজেটটি অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর এবং বিশেষ করে দেশীয় ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।’

সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী তা ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে উল্লেখ করে তিনি এই লক্ষ্য অর্জনকে অত্যন্ত কঠিন বলে মন্তব্য করেন।

শিক্ষাখাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কুষ্টিয়া-২ আসনের এই সংসদ সদস্য বলেন, বাজেটে শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হলেও বরাদ্দের একটি বড় অংশের ব্যয় পরিকল্পনা স্পষ্ট নয়। তিনি অভিযোগ করেন, প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।

নিজ নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার জরাজীর্ণ অবকাঠামোর চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বর্ষাকালে শ্রেণিকক্ষের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, ফলে শিক্ষার্থীদের খাতা-পুস্তক রক্ষায় প্লাস্টিক বা ওয়েল পেপার ব্যবহার করতে হয়। অথচ বাজেটে কতটি নতুন শিক্ষা ভবন নির্মাণ করা হবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা নেই।’

স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে আব্দুল গফুর বলেন, ‘মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেয়া হলেও বাস্তব চাহিদার তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। প্রতিদিন এসব হাসপাতালে ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী ভর্তি থাকেন এবং বহির্বিভাগে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ রোগী সেবা নিতে আসেন।’

বিশেষ করে ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবকাঠামোগত দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের পরিবেশ এমন যে সুস্থ মানুষও সেখানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন।’ স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে অর্থমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে তার নির্বাচনী এলাকার এক দরিদ্র রোগীর দিনের পর দিন বারান্দায় পড়ে থাকার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের দরিদ্র মানুষ সরকারি হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না।’ চিকিৎসা খাতে বিদ্যমান অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

এ সময় পদ্মা নদীর ভাঙনে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও মিরপুর এলাকার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও সংসদে তুলে ধরেন আব্দুল গফুর। তিনি বলেন, ‘গত বছর থেকে ভেড়ামারার চারটি ইউনিয়ন নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।’

এ বিষয়ে তিনি ইতোমধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দিয়েছেন এবং সম্প্রতি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

স্পিকারের অতীত অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বর্তমান স্পিকার পানিসম্পদ মন্ত্রী থাকাকালে এলাকার একটি দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যার সমাধান করেছিলেন। যার ফলে প্রতিবছর সংঘাত, রক্তপাত ও প্রাণহানির ঘটনা থেকে হাজারো মানুষ রক্ষা পেয়েছিল।

বক্তব্যের শেষদিকে তিনি বলেন, ‘এত বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়নের জন্য দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখা বা কার্যকর দিকনির্দেশনা নেই।’