দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের মাটিতে পা রাখলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কার্যত প্রধান তারেক রহমান। এ প্রতীক্ষিত দিনটি শুধু বিএনপির জন্য নয়, সমগ্র রাজনৈতিক মহলে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে রেকর্ড হবে। রাজধানীর তিন শ’ ফিট এলাকায় অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে লাখো মানুষ তারেক রহমানকে উচ্ছ্বাসের সাথে অভ্যর্থনা জানায়। দীর্ঘদিনের নির্বাসন কাটিয়ে দেশের মাটিতে ফিরে আসা তার এ প্রত্যাবর্তন শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রতীক্ষার অবসান ও জনসমুদ্রে উচ্ছ্বাস
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-২০২ ফ্লাইট সিলেট হয়ে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখানে বিএনপির শীর্ষ নেতারা উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। ফ্লাইট অবতরণের পর সরাসরি রাজধানীর পূর্বাচল এলাকায় তিন শ’ ফিটের মঞ্চে উপস্থিত হন তারেক রহমান। গাড়ি দিয়ে তিন শ’ ফিট পর্যন্ত আসার পথে তিনি লাখো মানুষের উল্লাসে হাত নেড়ে সাড়া দেন। মূল মঞ্চে পৌঁছাতে গাড়ির সময় লেগেছে প্রায় তিন ঘণ্টার বেশি। পুরো পথজুড়ে মানুষের উচ্ছ্বাস, লাল-সবুজ পতাকা, স্লোগান– সবই দৃশ্যমান ছিল।
মঞ্চে ওঠে বক্তব্য শুরু করার আগে তারেক রহমান মহান আল্লাহর দরবারে ধন্যবাদ জানিয়ে দেশের মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, ‘প্রিয় বাংলাদেশে ফিরে আসতে পেরে আমি ধন্য। এ জনসমুদ্রে উপস্থিত সবাই এবং সারা দেশের মানুষ আমাদের দেশ গড়ার এ যাত্রায় অংশ নেবেন।’
‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ : দেশের জন্য পরিকল্পনা
তারেক রহমান তার বক্তৃতায় আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ ভাষণের কথা উল্লেখ করেন এবং নিজস্ব পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন- ‘আমি বলতে চাই- আই হ্যাভ আ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি। আজকের এ পরিকল্পনা দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের জন্য, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে আমাদের প্রত্যেক মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

এ পরিকল্পনায় দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বিশেষ করে যুবসমাজ, কৃষক, শ্রমিক, গৃহবধূ, নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ন্যায়বিচার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয়া হবে।
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি
তারেক রহমান স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে লাখো শহীদ স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছিলেন। ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অংশ নিয়েছে। আমাদের দায়িত্ব এ অর্জনকে স্থায়ী করা।’
তিনি শহীদ ওসমান হাদিসহ জুলাই আন্দোলনের সব শহীদের স্মরণ করে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে ২৪-এর আন্দোলনের এক সাহসী প্রজন্মের সদস্য ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে; তিনি শহীদ হয়েছেন। ওসমান হাদি চেয়েছিলেন, এ দেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক। ২৪-এর আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, ওসমান হাদিসহ বিগত স্বৈরাচারের সময় যারা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের রক্তের ঋণ যদি শোধ করতে হয়, তবে আসুন আমরা আমাদের সে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’
তরুণ প্রজন্মকে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বিভিন্ন আধিপত্যবাদী শক্তির দোসররা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ধীর ও শান্ত থাকতে হবে এবং দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে।’
নিরাপদ ও সংহত বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান
তারেক রহমান একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের মানুষ, সমতলের মানুষ, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, হিন্দুসহ সবাইকে নিয়ে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ব, যেখানে নারী, পুরুষ, শিশুÑ সবাই নিরাপদে ঘর থেকে বের হতে পারবে এবং ফিরে আসতে পারবে।’
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, চার কোটির বেশি তরুণ, পাঁচ কোটির মতো শিশু এবং চল্লিশ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছেন। এ সব মানুষের প্রত্যাশা পূরণের জন্য সবইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
শান্তিশৃঙ্খলা ও ন্যায়পরায়ণতা
তারেক রহমান দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর সতর্ক বার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। আমাদের নেতাকর্মী ও তরুণ প্রজন্মকে ধীর ও শান্ত থাকতে হবে। নবী করিম সা:-এর ন্যায়পরায়ণতার আলোকে দেশ পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।’
তিনি মায়ের অসুস্থতার প্রসঙ্গে বলেন, ‘সন্তান হিসেবে আমার মন আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে সে হাসপাতালের ঘরে। কিন্তু যে মানুষটি এ দেশের মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, সে মানুষগুলোকে আমি কোনোভাবেই ফেলে যেতে পারি না। সে জন্যই আজ হাসপাতালে যাওয়ার আগে আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য এখানে দাঁড়িয়েছি।’
সবশেষে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান, ‘শিশু, নারী বা পুরুষ- যে কেউ হোক, সবাই যেন নিরাপদে থাকতে পারে। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’
রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সংবর্ধনা
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) এবং জাহিদ হোসেন।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সহসভাপতি তানিয়া রব, গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নুরুল আমিন ব্যাপারীসহ অনেকে।
এর আগে বেলা পৌনে ১২টায় তারেক রহমান, স্ত্রী ডা: জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমানকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-২০২ ফ্লাইট সিলেট হয়ে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখানে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান দলের শীর্ষ নেতারা। তারেক রহমানের শাশুড়িও এ সময় ফুলের মালা দিয়ে জামাতাকে বরণ করে নেন।
ড. ইউনূসকে ফোন করে ধন্যবাদ
দেশে ফিরেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ফোন করে ধন্যবাদ জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তারেক রহমান তার নিরাপত্তাসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রধান উপদেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
বিএনপি মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে শেয়ার করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, ফোনে তিনি প্রধান উপদেষ্টার খোঁজখবর নেন এবং বলেন, আমি আমার পক্ষ থেকে এবং আমার পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বিশেষ করে আমার নিরাপত্তার জন্য যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
ভিডিওতে দেখা যায়, ফোনালাপের শেষে তিনি প্রধান উপদেষ্টার কাছে দোয়া চান এবং সালাম দিয়ে কথা শেষ করেন।
দেশে প্রত্যাবর্তনের আবেগ
বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে তারেক রহমান জুতো খুলে মাটি ও শিশির ভেজা ঘাসের স্পর্শ নেন। এক টুকরো মাটি হাতে নিয়ে মাতৃভূমির স্পর্শ অনুভব করেন। তার পোষা বিড়াল জেবুকেও দেশে আনা হয়।
ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘দীর্ঘ ছয় হাজার তিন শ’ ১৪ দিন পর বাংলাদেশের আকাশে!’
‘অবশেষে সিলেটে, বাংলাদেশের মাটিতে!’
‘হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন এবং যাকে হীন করেন। কল্যাণ আপনারই হাতে।’
১৯৬ নম্বর বাসায়
তিন শ’ ফিটে নেতাকর্মীদের সাথে সংবর্ধনা বিনিময়ের পর অসুস্থ মাকে দেখতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে যান তারেক রহমান। মা বেগম খালেদা জিয়া মাসখানেকেরও বেশি সময় ধরে সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাসপাতালে বেশ কিছু সময় পার করার পর তিনি গুলশান অ্যাভিনিউতে ১৯৬ নম্বর বাসায় উঠেন।

পরবর্তী কর্মসূচি
বিএনপির স্থায়ী কমিটি সূত্রে জানা যায়, আগামীকাল শুক্রবার জুমার পরে শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত, সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা। এ ছাড়া ভোটার হওয়ার পাশাপাশি শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত এবং পঙ্গু হাসপাতালে জুলাই আন্দোলনের আহতদের সাথে সাক্ষাৎ।
রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন শুধু পারিবারিক ও দলের জন্য নয়, এটি দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নতুন শক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশে থাকা অবস্থায় তিনি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন। দেশে ফেরার পর তা বাস্তবায়নের পথ শুরু করেছেন। বিশেষ করে যুবসমাজকে নেতৃত্ব গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা, শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা, নিরাপদ বাংলাদেশ গঠন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয় প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উঠে এসেছে।
তার প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন সম্ভাবনার সূচনা করেছে। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, যুবসমাজের নেতৃত্ব গ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালীকরণ এ প্রক্রিয়ায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। দেশের স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তার নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



