‘আয়নাঘর’ নিয়ে জাতীয় সংসদে আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান)। দীর্ঘ আট বছর আয়নাঘরে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনায় সংসদকে আবেগাপ্লুত করে তোলেন তিনি।
তবে, অন্তর্ববর্তীকালীন সরকারের সময় গুম প্রতিরোধ আইন নিয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান তুলে ধরে কঠোর সমালোচনা করেছেন আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। একইসাথে ভবিষ্যতে গুম ও বিচারবহির্ভূত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শক্তিশালী আইনি কাঠামোর দাবি উঠে এসেছে।
রোববার (৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনের অষ্টম দিনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম ‘আয়নাঘরের’ ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
ব্যারিস্টার আরমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘গুমের শিকার ভুক্তভোগী, যে প্রধানমন্ত্রী নিজে নির্যাতনের শিকার, তারা কেমন করে এ আইন বাতিলের পরামর্শ দেয়? আমাদের আবেদন, আইনটি যদি পরিশোধিত করতে চায়, তার আগে অনুমোদন দিয়ে আইনে পরিণত করুক, পরে সংশোধিত করা হোক। যদি সেটা না করা হয়, ১২ তারিখ অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে গেলে, ১৩ তারিখ থেকে গুমের সংজ্ঞা থাকবে না।’
মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, ‘আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি একটি অন্ধকার ঘর থেকে ফিরে এসে। যেখানে আমার মতো আরো শত শত লোককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের ফিরে আসার সৌভাগ্য হয়নি। আমি তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমরা সেই অন্ধকার ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম। ধরে নিয়েছিলাম এ অন্ধকার ঘরে আমাদের মৃত্যু হচ্ছে। হয়তো আমাদের হত্যা করবে, এখানেই আমাদের মৃত্যু হবে। বুঝতে পারতাম না বাইরে দিন, নাকি রাত। মনে হতো জীবন্ত কবর দিয়ে দেয়া হচ্ছে। মনে করতাম মৃত্যু হাজারগুণ ভালো।’
তিনি আরো বলেন, ‘একদিন রাতে আমাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করা হচ্ছে। তখন ধরে নিচ্ছি আজকেই আমার মৃত্যু হবে। তখন আমি সূরা ইয়াসিন পড়া শুরু করেছিলাম যাতে মৃত্যুটা সহজ হয়। কিন্তু শুনলাম কিছু বাচ্চা ছেলে জীবন দিয়ে, চোখ-পা হারিয়ে ফ্যাসিবাদকে বিতাড়িত করে আমাদের আবার দুনিয়ার আলো দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।’
ব্যারিস্টার আরমান বলেন, ‘এ সংসদকে বলতে হয় মজলুমদের মিলনমেলা। এমন একজনকেও পাবেন না যারা গত ফ্যাসিস্ট আমলে জুলুমের শিকার হয়নি। গুমের ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে বলছি, আমি স্তম্ভিত হয়েছি। আমাদের সাথে যে জুলুম করা হয়েছিল তা যেন বাংলাদেশের মাটিতে না হয়, সে জন্য গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। বিশেষ কমিটি আইনগুলো বাতিলের সুপারিশ করেছে।’
ওই বক্তব্যের জবাব দিতে ফ্লোর নেন আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘যারা গুম হয়েছেন, তাদের কেউ আমার স্বজন-ভাই-বোন-আত্মীয়-প্রতিবেশী, বাংলাদেশের মানুষ। তাদের কেউ আমার জিয়া পরিবারের সদস্য।’
তিনি বলেন, ‘ওনারা (বিরোধী দল) যেটা নিয়ে হৈ-চৈ করছেন, ওনারা সেটা (আইন) বোধ হয় ভালো করে দেখেননি। মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ যেভাবে করা হয়েছে, সেটা (আইনে) করা হলে গুমের শিকার সদস্যদের প্রতি অবিচার করা হবে। কারণ আমরা একইসাথে আইসিটি অ্যাক্টে গুমের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করেছি। সেখানে বিচার ও তদন্ত হবে। আবার গুম আইনে ভিন্ন একটি তদন্তের কথা বলেছি। সেখানে (আইসিটি অ্যাক্টে) গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্তু গুমের আইনে ১০ বছর পর্যন্ত সাজা রাখা হয়েছে।’
মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘অধ্যাদেশটি রাখা হলে বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষজন অতিরিক্ত হয়রানির শিকার হবেন। যে কারণে আমরা বলেছি, এ দুটি আইন আরো বেশি যুগোপযোগী, জনকল্যাণমুখী ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য পরবর্তী সময়ে অংশীজনের সাথে আলাপ-আলোচনা করে সুনির্দিষ্টভাবে বিল আনবো। যাতে করে অপরাধীরা কোনোভাবে ছাড়া না পায়। কারণ ব্যারিস্টার আরমান আমার ভাই, স্বজন, সহকর্মী। উনি দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে গুমের শিকার হয়েছিলেন, সেভাবে বাংলাদেশের সাত শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছিলেন।’



