আতিকুর রহমান

সিন্ডিকেট করে শ্রমিকের পকেট কাটার অপচেষ্টা করছে কুচক্রী মহল

অবিলম্বে পোশাকশিল্পসহ সব খাতের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় মজুরি বোর্ড ও পেশাভিত্তিক মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে। শ্রমজীবী মানুষ যেন দুবেলা দুমুঠো খাবার খেতে পারে, সেই ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
বক্তব্য প্রদান করছেন অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান
বক্তব্য প্রদান করছেন অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান |ছবি : নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেছেন, শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট করে শ্রমিকের পকেট কাটার অপচেষ্টা করছে কুচক্রী মহল।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুর ১২টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেয়ার চক্রান্ত বন্ধ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটে শিল্পকারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাই রোধ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং সব পেশার শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি অবিলম্বে পুনর্নির্ধারণের দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে আতিকুর রহমান বলেন, দেশের শ্রমিকরা সেখানে গিয়ে কাজ করে দেশের জন্য রেমিট্যান্স আহরণ করবেন। কিন্তু বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে দলীয়করণ ও সিন্ডিকেটের কারণে এই শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের ৩১ মে বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কারণে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১৭ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়া যেতে পারেননি।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে শ্রমবাজারটি পুনরায় খোলার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, সম্ভাবনাময় এই শ্রমবাজার আবারো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ২৪-পরবর্তী জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া সরকার মাত্র ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কাজের সুযোগ দিয়ে আবারো পুরোনো পথে হাঁটছে।

তিনি বলেন, দেশে দুই হাজারেরও বেশি রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে। শ্রমিকরা নিজেদের পছন্দমতো বৈধ এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু মাত্র কয়েকটি এজেন্সিকে সুযোগ দেয়া হলে আবারো সিন্ডিকেট তৈরি হবে। এর ফলে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ভিটেমাটি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করবেন, আর সেই টাকা সিন্ডিকেটের মধ্যস্বত্বভোগী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর পকেটে যাবে।

সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়া যেতে একজন শ্রমিকের ওপর ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ চাপিয়ে দেয়া হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হবেন। নতুন বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ তা হতে দেবে না।

দেশের শিল্পখাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কট চলছে। এর কারণে ইতোমধ্যে তিন শতাধিক কলকারখানা বন্ধ হয়েছে এবং সারাদেশে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বেকার হয়েছেন। বিভিন্ন কোম্পানি থেকে একের পর এক শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে।

সরকার ১৮ মাসে দেশে এক কোটি শ্রমিকের বেকারত্বের সমস্যার সমাধান করার কথা বলেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত ছয় মাসে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। নতুন করে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতির আগে বিদ্যমান চাকরি রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা যে চাকরিতে আছি, যেখানে আছি, সেখানকার গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট নিরসন করে চাকরির নিশ্চয়তা দিন। না হলে চাকরি ছেড়ে বাসায় গিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে অভিশপ্ত জীবনযাপন করতে হবে। শ্রমিকরা কখনো তা চায় না।’

সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপির বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একজন মন্ত্রী বলেছেন, আগামী দুই বছরেও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে না। তাহলে আগামী দুই বছরে বাংলাদেশে আর কোনো কলকারখানা থাকবে না। সঙ্কটের কারণে ইতোমধ্যে উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে এবং বাংলাদেশের অর্ডার প্রতিবেশী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আপনাদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। অবিলম্বে দেশের সকল কলকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ করতে হবে।’

সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার আগে বলা হয়েছিল, তাদের তিনবার ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু গত ছয় মাসে রাষ্ট্র পরিচালনায় সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেনি। বরং প্রতিটি সেক্টরে অনভিজ্ঞতা ও দুর্বলতার প্রকাশ ঘটছে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আতিকুর রহমান বলেন, গত চার-পাঁচ মাসে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে পারছে না। ‘বাজারে যে আগুন লেগেছে, সেই আগুন আপনাদেরই নেভাতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়াবেন—এটা চলতে পারে না। সরকারি কর্মচারীদের পে কমিশন দিলেন, এতে বাজারদর হু হু করে বৃদ্ধি পেল। অথচ শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেন না।’

চা শ্রমিকদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের চা শ্রমিকরা দৈনিক মাত্র ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছেন। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বাংলাদেশের চা-বাগানগুলোতে এখনো দাসপ্রথার মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সেখানে মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এই অবস্থায় সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করবে না। রাজপথে নেমে এলে আপনারা পালানোর রাস্তা পাবেন না।

অবিলম্বে পোশাকশিল্পসহ সব খাতের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় মজুরি বোর্ড ও পেশাভিত্তিক মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে। শ্রমজীবী মানুষ যেন দুবেলা দুমুঠো খাবার খেতে পারে, সেই ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের সামনে সুন্দর সুন্দর ছবক দিলে সাধারণ মানুষ আর তা শুনতে চায় না। বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করুন, বিদ্যুৎ দিন, তেল ও গ্যাসের দাম কমান, মজুরি বোর্ড গঠন করুন। এসব করতে না পারলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আপনাদের আর সময় দেবে না।’

মানববন্ধনে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষসহ বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লস্কর মো: তসলিমের সঞ্চালনায় আরো বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কবির আহমদ, মজিবুর রহমান ভূঁইয়া, সহসাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসাইন, আব্দুস সালাম, এস এম লুৎফর রহমান, মাওলানা মহিবুল্লাহসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।