অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান

জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে তাদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে সরকার

তিনি বলেন, বহু বছর ধরে বিভিন্ন মতাদর্শের শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের মুক্তির কথা বললেও দেশের শ্রমিকদের জীবনমানের মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি।

নিজস্ব প্রতিবেদক
বক্তব্য প্রদান করছেন অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান
বক্তব্য প্রদান করছেন অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান |ছবি : নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে জনগণের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে সরকার।

পাবনায় আয়োজিত ট্রেড ইউনিয়ন ও দায়িত্বশীল সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, স্বাধীনতারও আগে তৎকালীন কেন্দ্রীয় প্রধান উপদেষ্টার সময়ে শ্রমিকের মাঝে কাজ করতে ব্যারিস্টার কুরবান আলীর নেতৃত্বে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। আদর্শিক ও ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক সংগঠন হওয়ায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারের আমলে সংগঠনটিকে নানা বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশেষ করে বিগত সরকারের সময় সভা-সমাবেশে বাধা, মিথ্যা মামলা, গ্রেফতার, রিমান্ড এবং নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এমনকি শ্রমিক ঐক্য ব্যানারে কর্মসূচি পালনেও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারার মধ্যে আবদ্ধ ছিল। শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন সেই ধারা পরিবর্তন ঘটিয়ে ন্যায়, মানবিকতা ও ইসলামী আদর্শভিত্তিক একটি বিকল্প শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে কাজ করছে।

তিনি বলেন, বহু বছর ধরে বিভিন্ন মতাদর্শের শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের মুক্তির কথা বললেও দেশের শ্রমিকদের জীবনমানের মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসের পরও দেশের শ্রমিকরা কি ন্যায্য মজুরি পেয়েছে? তারা কি নিরাপদ কর্মপরিবেশ পেয়েছে? আট ঘণ্টা শ্রমের অধিকার কি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?

তিনি বলেন, আজও অসংখ্য শ্রমিক ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেও ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শ্রমিকরা অধিকার আদায়ে আন্দোলনে নামলে অনেক সময় দমন-পীড়নের মুখোমুখি হন।

তিনি রানা প্লাজা ও তাজরীন ফ্যাশনসের মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে দেশের শ্রমিকরা এখনো নিরাপদ কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত। শ্রমিকের জীবন ও মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে শ্রমজীবী মানুষের জীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। বেতন বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেই সুফল শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু সীমিত সহায়তা বা ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; বরং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় দেশের শ্রমিকরা অতীতে বিভিন্ন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে আত্মত্যাগ দিয়েছে। কিন্তু এখনো শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। এ অবস্থায় শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে সরকারকে আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে। যেখানে আট ঘণ্টার বেশি কাজ নেয়া হয়, সেখানে অতিরিক্ত সময়ের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে রেশনিং ব্যবস্থা চালু, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শ্রমিকবান্ধব নীতি গ্রহণের দাবি জানান।

বক্তব্যের শেষাংশে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের প্রকৃত মুক্তি, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য নৈতিকতা, ইনসাফ এবং ইসলামী মূল্যবোধের সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। তিনি শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে অধিকার আদায়ের আন্দোলন জোরদার করার আহ্বান জানান।

জেলা সহ-সভাপতি মজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি গোলাম রব্বানী এবং কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও অঞ্চল পরিচালক অধ্যাপক আব্দুল মতিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জেলা সাধারণ সম্পাদক বদিউজ্জামান।