বিএনপি কি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে

রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পরিস্থিতি অযথা ঘোলা না করে জাতীয় নির্বাচনের সুস্পষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

মঈন উদ্দিন খান
বিএনপির লোগো
বিএনপির লোগো |সংগৃহীত

খুলনায় বিএনপির তারুণ্যের সমাবেশে দলটির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বেশ ঝাঁঝালো কণ্ঠে অন্তর্বর্তী সরকারের নানা কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নির্বাচন ইস্যুতে সরকারের অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ‘যদি নির্বাচনের দাবিতে কোনো দিন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে ঘেরাও করতে হয়, তা হবে জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।’

সালাহউদ্দিন আহমেদ এও বলেছেন, ‘এই সরকার জনগণের নয়, এনসিপি মার্কা সরকার।’ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হলে সরকারে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করা দুই উপদেষ্টার পদত্যাগও দাবি করেছেন তিনি।

শনিবার সালাহউদ্দিন আহমেদের এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পরিস্থিতি অযথা ঘোলা না করে জাতীয় নির্বাচনের সুস্পষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

বিএনপির অভ্যন্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলটি আসলেই নির্বাচনসহ বেশ কয়েকটি ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের বর্তমান অবস্থানে সন্তুষ্ট নয়। বারবার নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের দাবি দলটির পক্ষ থেকে করা হলেও সেটি নিয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো ‘প্রত্যাশিত উত্তর’ না আসায় নেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। প্রায় প্রতিদিনই নির্বাচন নিয়ে তারা এখন কড়া কড়া কথা বলছেন। দলটি মনে করে, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে আসছে ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন সম্ভব।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘যদি জুন-জুলাই মাসের মধ্যে সংস্কার নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায়, তাহলে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করতে বাধাটা কোথায়?’

তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনে বিএনপির দাবি যৌক্তিক এবং এর বিরুদ্ধে যৌক্তিক কোনো প্রস্তাব বা কোনো বক্তব্য কেউ হাজির করতে পারেনি।’

জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কিছু কর্মকাণ্ডেও বিএনপি ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে রাখাইনে মানবিক করিডোর দেয়ার বিষয়ে সরকারের অবস্থান দলটির কাছে স্পষ্ট নয়। এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার এই সরকারের নেই বলে দলটি মনে করে। এ ছাড়া সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে বিদেশীদের সংশ্লিষ্ট করার যে কথা সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, তাতেও দলটির আপত্তি রয়েছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও দলটি উদ্বিগ্ন। বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের শঙ্কা, সরকার নির্বাচন ফোকাস না করে যেভাবে তাদের কর্মপরিধি বাড়াচ্ছে তাতে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

দলটির প্রত্যাশা, সরকার অচিরেই রোডম্যাপের ব্যাপারটি স্পষ্ট করবে। নইলে যুগপতের মিত্র দলগুলোর সাথে আলোচনা করে রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়ার চিন্তা করবে তারা । দলটি এও মনে করে, সরকারের এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যেখানে নির্বাচনের দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে আবার রাস্তায় নামতে হয়। তেমনটা হলে তা খুবই বিব্রতকর হবে। কারণ এই সরকারের প্রতি যে কোনো ধরনের সহযোগিতার হাত তারাই বাড়িয়ে রেখেছেন।

বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা গতকাল আলাপকালে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নিয়ে তালবাহানা করছে। নির্বাচনের কথা বললেই তারা সংস্কারের ইস্যু সামনে আনে। কিন্তু সংস্কারের প্রক্রিয়াও ধীরগতিতে এগোচ্ছে। একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কোন সংস্কারগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগে করতে চায়, সরকার সেটিও বলছে না। সরকারের মতিগতি দেখে মনে হচ্ছে, তারা থেকে যেতে চায়। সুতরাং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নির্বাচনের দাবিতে আমাদের আবার হয়তো মাঠে নামতে হতে পারে। মনে হচ্ছে, পরিস্থিতি সেদিকেই যাচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, এই সরকার এমনভাবে কাজ করছে যেন তারা একটি নির্বাচিত সরকার। অথচ এটি একটি অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করে ক্ষমতা নির্বাচিত সরকারের কাছে হস্তান্তর করা। কিন্তু মেয়াদের ৯ মাসেও এখনো নির্বাচনের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়নি। তিনি বলেন, নির্বাচন যত বিলম্বিত হচ্ছে, দেশকে তত বেশি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। জাতি এখন এক গভীর শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। দেশ কোথায় যাচ্ছে, কেউ জানে না।

দলটির নেতারা বলছেন, সরকারের মেয়াদের ৯ মাসেও নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা না করাটা একটা ‘রহস্য’। তাই এই ইস্যুতে সরকারকে চাপে রাখতে নতুন কৌশল নিয়ে আগানোর চিন্তা করছেন তারা।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি নির্বাচন ইস্যুতে এখনই এই সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো আন্দোলনে যেতে চায় না। দলটি সামনে আরো কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। এরপর নির্বাচন নিয়ে সরকারের তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ না পেলে, সে ক্ষেত্রে দলীয় অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে। তখন মাঠের কর্মসূচিতেও নামতে পারে দলটি।