জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে যেসব প্রতিশ্রুতি দিলেন তারেক রহমান

এ ভাষণে তিনি তার দল ক্ষমতায় এলে কী কী কর্মপরিল্পনা বাস্তবায়ন করবে তা তুলে ধরেন। সেইসাথে বেশকিছু প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন।

অনলাইন প্রতিবেদক
বিটিভিতে ভাষণ দিচ্ছেন তারেক রহমান
বিটিভিতে ভাষণ দিচ্ছেন তারেক রহমান |সংগৃহীত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

এ ভাষণে তিনি তার দল ক্ষমতায় এলে কী কী কর্মপরিল্পনা বাস্তবায়ন করবে তা তুলে ধরেন। সেইসাথে বেশকিছু প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এ ভাষণ প্রচারিত হয়।

তার ভাষণটি এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো :

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু আলাইকুম।

গণতান্ত্রিক উত্তোরণের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উপনীত বাংলাদেশ। দেশের সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু পতিত পরাজিত বিতাড়িত চক্র জনগণের কাছ থেকে রাষ্ট্রের মালিকানা কেড়ে নিয়েছিল। কেড়ে নিয়েছিল জনগণের সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার। অবশেষে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় হাজারো প্রাণের বিনিময়ে জনগণের কাছে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া এক মাহেন্দ ক্ষণ আমাদের সামনে উপস্থিত। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জনগণের বহুল আকাঙ্ক্ষিত জাতীয় নির্বাচন।

প্রিয় দেশবাসী, রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং সরকারে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই শুভ সময়ে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে আমি আপনাদের সামনে কয়েকটি কথা বলতে চাই। গণতান্ত্রিক আমি জনগণের সামনে এমন একটি শুভ সময় হঠাৎ করেই আসিনি। এর জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের সকল রাজনৈতিক দল এবং গণতান্ত্রিকমী জনগণকে দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী এই ধারাবাহিক আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষকে গুম, খুন, অপহরণ করা হয়েছিল। আয়নাঘর নামক এক বর্বর বন্দীখানা যেন হয়ে উঠেছিল জ্যান্ত মানুষের কবরস্থান। শুধুমাত্র ২০২৪ সালে ছাত্র জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ১৪ শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩০০ মানুষ। বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত দেশে গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন সময়ে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের মাগফেরাত কামনা করছি। যারা আহত হয়েছেন তাদের প্রতি জানাই গভীর সহানুভূতি এবং সহমর্মিতা। তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।

প্রিয় দেশবাসী,

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের আধিপত্যবাদ ও তাবেদার অপশক্তি বিরোধী বাংলাদেশ, ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, শাপলা চত্বরের গণহত্যা কিংবা সর্বশেষ ২০২৪ সালের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ। ইতিহাসের এমন প্রতিটি বাঁকে হাজারো লক্ষ মানুষ অকাতরে জীবন দিয়েছেন। একটি প্রাণের সমাপ্তির মধ্যে দিয়ে একটি পরিবারের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা আসা আকাঙ্ক্ষার ও মৃত্যু ঘটে। এই মানুষগুলো কেন এমন অকাতরে জীবন দিয়েছিলেন? কি ছিল তাদের চাওয়া? কোন কিছু দিয়েই মৃত্যুর প্রতিদান হয় না? তাহলে কি এত প্রাণের বিসর্জন বৃথা হয়ে যাবে? না। অবশ্যই বৃথা যেতে দিতে পারি না আমরা। আমরা যারা এখনো আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছি আমাদের উচিত সকল শহীদদের আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। একটি ন্যায়ভিত্তিক মানবিক নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা দেশ এবং জনগণের জন্য উৎসর্গকৃত সকল প্রাণের প্রতিদান দেবার চেষ্টা করতে পারি।

প্রিয় দেশবাসী,

বাংলাদেশ প্রায় ২০ কোটি মানুষের জনবহুল দেশ। দেশের মোট জনশক্তির অর্ধেকের বেশি নারী। জনসংখ্যার ৪ কোটির বেশি তারুণ্য, পাঁচ কোটির বেশি শিশু, ৪০ লাখের বেশি প্রতিবন্ধী মানুষ, কোটি কোটি শ্রমিক, কৃষক। এই সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত খোদ রাষ্ট্রযন্ত্রই দুর্বল। হয়ে পড়বে। নাগরিকদের দুর্বল রেখে রাষ্ট্র কখনোই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের ডেমোক্রেসি ডেভেলপমেন্ট কিংবা ডিসেন্ট্রালাইজেশন কোন কিছুই টেকসই হবে না। আমি মনে করি জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পূর্ব শর্ত নাগরিকদের সরাসরি ভোটের অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় পরিষদের মেম্বার থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ সদস্য পর্যন্ত প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষমতা অর্জন। প্রতিটি নাগরিকের হারানো রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন একটি বড় সুযোগ।

প্রিয় দেশবাসী,

এই উপলব্ধি এবং বাস্তবতাকে সামনে রেখে দেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিটি সেক্টর এবং প্রতিটি শ্রেণী-পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমরা আমাদের পরিকল্পনা সাজিয়েছি। বর্তমান প্রজম্যের সামাজিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহাল এবং ভবিষ্যৎ প্রজম্যের জন্য একটি নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিএনপির সকল পরিকল্পনা বিশেষ করে দেশের সকল তরুণ-তরুণী বেকার জনগোষ্ঠী এবং নারীদের জন্য দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই এবার বিএনপির প্রথম এবং প্রধান অগ্রধিকার। আমি ইশতেহারে উল্লেখিত কয়েকটি বিষয় খুব সংক্ষিপ্তভাবে আজ আবারও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাই।

প্রিয় দেশবাসী,

বেকার সমস্যা নিরশনের লক্ষ্যে ব্যাংক, বীমা, পুঁজিবাজারসহ দেশের অর্থনৈতিক খাতের সার্বিক সংস্কার, অঞ্চল ভিত্তিক অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং শিল্প ও বাণিজ্যে দেশী বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশে বিদেশে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমার্তা নির্ধারণ করা হয়েছে। এভাবে পর্যায়ক্রমিকভাবে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমার্তা অর্জনের জন্য কয়েকটি সেক্টরকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির উপায় এবং কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসাবে দেশব্যাপী কারিগরি এবং ব্যবহারিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে বেকার জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা হবে। কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় বিনামূল্যে স্কিলস ডেভেলপমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং এবং আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। যাতে করে বেকার যুবক কিংবা তরুণ-তরুণীরা দেশে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির জন্য প্রস্তুত হয়ে সরাসরি কর্মক্ষেত্রে কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারেন। প্রতিটি অঞ্চলভিত্তিক স্থানীয়ভাবে বিখ্যাত এবং ঐতিহ্যবাহী পণ্যের উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। স্থানীয় কুটি শিল্প ও এসএম খাত বিকশিত করার জন্য সহজ এবং স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের পণ্য রপ্তানির লক্ষে বেসরকারি শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সহায়ক উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা আউটসোর্সিং, ডাটা প্রসেসিং, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সেমিকন্ডাক্টরসহ আইটি সেক্টরে নতুন শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এইসব সেক্টরে প্রতিবছর সরাসরি ২ লক্ষ এবং ফ্রিল্যান্সিং ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি ও কন্টেইন ক্রিয়েশন এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আরো ৮ লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরীর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রিয় দেশবাসী,

বিভিন্ন পরিসংখ্যন অনুযায়ী বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৯ লক্ষ রয়েছেন স্নাতক ডিগ্রিধারী উচ্চ শিক্ষিত বেকার। এদের মধ্যে প্রায় ২২ শতাংশ তরুণ তরুণী কোন প্রকার শিক্ষা চাকরি ও প্রশিক্ষণে সম্পৃক্ত নয়। এই বিপুল সংখ্যক বেবকারের অধিকাংশই ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী। ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জনগণের রায় বিএনপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে বিএনপি শিক্ষিত তরুণ তরুণদের জন্য ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ এক বছর কিংবা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক ভাতা প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা মনে করি এই বেকার ভাতা হয়তো একজন শিক্ষিত বেকারকে সে উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জনেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

প্রিয় দেশবাসী,

দেশের অর্ধেক জনশক্তির বেশি নারীশক্তিকে রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতির মূলধারার বাইরে রেখে দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়। দেশে প্রায় চার কোটি পরিবার রয়েছে। যদি আপনারা বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেন তাহলে আমরা এবার প্রথমবারের মতন দেশে প্রতিটি পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরিবারগুলোর নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হবে। তবে প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রান্তিক এবং নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ফ্যামিলি কার্ডে প্রতিমাসে আড়াই হাজার টাকা কিংবা সমমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহযোগিতার পরিমাণ প্রয়োজন এবং বাস্তবতার নিরিখে পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। ফ্যামিলি কার্ডটিকে আমরা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে মনে করি।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া নারী শিক্ষার উন্নয়নে দেশের স্নাতকত্তর পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ চালু করেছিলেন। আপনারা বিএনপিকে আবারো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিলে নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষা গ্রহণের সুবিধা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নীতি নির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ ও ভূমিকা বাড়ানো হবে। নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক খাতে নারী কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত নারী কল্যাণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার পর কল্পনা আমাদের রয়েছে। স্বচ্ছন্দে চলাফেরা নিশ্চিত করতে শুধুমাত্র নারীদের জন্য বিশেষায়িত ইলেকট্রিক পরিবহন চালু করা হবে। কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কর্মস্থলে ডে কেয়ার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করা হবে। এছাড়া বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে হাইজিনিক বাথরুম নির্মাণের পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে। আমাদের সমাজে নারীরা নানাভাবে হয়রানী এবং সহিংসতার শিকার হন। বর্তমান সময় নারীর প্রতি সাইবার বুলিং উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। বুলিংসহ নারীর প্রতি যেকোন ধরনের স্বয়ংসতা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত আমাদের রয়েছে। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত অবশ্যই ইনশাআল্লাহ করা হবে।

প্রিয় দেশবাসী,

সময়ের সাথে সাথে অর্থনীতির নানা খাত বাড়লেও দেশের অর্থনীতি এখনো মূলত কৃষি নির্ভর। বিএনপি বিশ্বাস করে কৃষকের স্বার্থ রক্ষার অর্থ দেশের স্বার্থ রক্ষা। এজন্যই আমরা বলি বাঁচলে কৃষক বাঁচবে দেশ। এই উপলব্ধি থেকেই আমরা কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কৃষকদের জন্য ফার্মাস কার্ড ইস্যুর উদ্যোগ নিয়েছি। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষক একদিকে কৃষি সংক্রান্ত হালনাগাত তথ্য পাবেন। অপরদিকে সরকারের কাছ থেকে পাবেন আর্থিক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা। দেশে কোটি কোটি কৃষক শ্রমিক রয়েছেন। অধিকাংশই কর্মক্ষম। কর্মক্ষম কৃষকদের জন্য একদিকে যেরকম কর্মসংস্থান প্রয়োজন অপরদিকে প্রয়োজন তাদের শ্রমের ন্যায্য মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ। আমরা মনে করি কর্মক্ষময়ী জনশক্তির শ্রমই হতে পারে বাংলাদেশকে পুনরায় স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশে রূপান্তরের চাবিকাঠি। এ কারণেই আমরা বলি করব কাজ, গর্ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। তাই আমরা আমাদের কর্মপরিকল্পনায় কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছি।

প্রিয় দেশবাসী,

আমাদের জনসংখ্যার একটি বিপুল অংশ স্কুল, কলেজ মাদ্রাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জ্ঞান বিজ্ঞান আর তথ্যপ্রযুক্তির এই বিকাশমান বিশ্বে বাংলাদেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী এইসব তরুণ তরুণীরাই বদলে দিবে আগামীর বাংলাদেশ। তবে একাডেমিক শিক্ষার স্তরের সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছার এই যাত্রাপথে লক্ষ শিক্ষার্থী কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ে ড্রপআউট হয়ে যান। নানা বাস্তবতায় ড্রপআউট হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের তালিকায় বিশ্বের যে কয়েকটি দেশ শীর্ষ স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ তার অন্যতম। একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাস্তরের যেকোনো পর্যায়ে ড্রপআউট হওয়ার পর তাদেরকে যেন বেকার জীবন কাটাতে না হয় সেজন্য হাই স্কুল পর্যায় থেকে আমরা শিক্ষা কারিকুলামে কারিগরি এবং ব্যবহারিক অর্থাৎ টেকনিক্যাল এবং ভোকেশনাল শিক্ষাকে আবশ্যকীয় করার প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছি। একই সঙ্গে দেশের জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে বাংলা এবং ইংরেজির পাশাপাশি হাই স্কুল পর্যায় থেকে সিলেবাসে তৃতীয় আরেকটি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা রাখার সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা আমরা গ্রহণ করেছি। আমরা মনে করি একজন ব্যক্তির একাধিক ভাষা জ্ঞান থাকলে বিশ্বের যেকোন দেশেই কর্মসংস্থানের অভাব হবে না। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে একজন শিক্ষার্থী যাতে যোগ্যতম হিসেবে এগিয়ে যেতে পারেন। সেই চিন্তাকে সামনে রেখেই আমরা শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের গবেষণা এবং সুপারিশের ভিত্তিতে শিক্ষা কারিকুলাম পরিমার্জনের পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করেছি। আমরা শিক্ষা কারিকুলাম এমনভাবে ঢেলে সাজানোর প্রস্তুতি নিয়েছি যাতে সকল শিক্ষার্থী শিক্ষাস্তরের প্রতিটি ধাপে একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি একটি বিশেষ কারিগরি ব্যবহারিক শিক্ষার দক্ষতাও অর্জন করতে সক্ষম হন।

প্রিয় দেশবাসী,

আমরা রিজিককে বিশ্বাস করি। এবং সাধারণত আমরা রিজিক বলতে খাওয়া-দাওয়া কিংবা অর্থসম্পদকে বুঝি। তবে ধর্মীয় দৃষ্টিতে রিজিকের একাধিক স্তর রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর হচ্ছে মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য আমরা জনগণের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। জনগণের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে- প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিওর। অর্থাৎ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধী উত্তম। আমরা এই নীতিতে প্রবর্তন করতে চাই। এই লক্ষ্যে আমরা প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা কোর্স সম্পন্ন করিয়ে সারাদেশে ১ লক্ষ হেলথকেয়ারের নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। নিয়োগ পাওয়া হেলথ কেয়ারারদের শতকরা ৮০ ভাগই হবেন নারী সদস্য। প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়োগ পাওয়া হেলথকেয়ারগণ মানুষের দোরগোড়ায় যাবেন এবং তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শ দেবেন। আমরা মনে করি কোন রোগ প্রতিরোধের ব্যাপারে প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক পরামর্শ পেলে অনেক রোগী শুরুতেই নিরাময় করা সম্ভব হয়ে ওঠে।

প্রিয় দেশবাসী,

বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান বিশ্ব আরো এক ধাপ এগিয়ে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। চাইলেও কারো পক্ষে এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব নয়। রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি সবকিছুই এখন তথ্যপ্রযুক্তিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। সুতরাং তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্ব শাসন করার মতন মেধাযোগ্যতা জ্ঞানে বিজ্ঞানে আমাদের তরুণ সমাজ সমৃদ্ধ না হতে পারলে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় নীতি কি হবে? বিএনপি ইতিমধ্যে সেইসব কার্যক্রম চূড়ান্ত করেছে। আইসিটিকে দেশের অন্যতম সেক্টর হিসেবে চিহ্নিত করে ফ্রিল্যান্সিং এবং আউটসোর্সিংসহ তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সহযোগিতা করার নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে বিএনপি।

প্রিয় দেশবাসী,

আপনারা জানেন সকল বাধা উপেক্ষা করে ২০২৩ সালে ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে বিএনপির রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা উপস্থাপন করেছিল। এরপর প্রতিটি দফা কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সেই বিষয়ে দেশে প্রবাসে বসবাসরত সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মাসের পর মাস আলোচনা করে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রক্রিয়া এবং পদ্ধতিও চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে ব্যয়নির্বাহের খাতও যথাযথভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। কারণ আমরা মনে করি দেশ এবং জনগণের স্বার্থে কোন শুভ উদ্যোগ নিলে সমস্যা হওয়ার কোন কারণ নেই। বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রের টাকা দিয়েই বিনামূল্যে নারী শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

প্রিয় দেশবাসী,

আপনারা জানেন ফ্যাসিবাদের শাসন আমলে প্রতিবছর দেশ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার করে দেওয়া হতো। এভাবে দুর্নীতি এবং টাকা পাচার আর অপচয় রোধ করা গেলে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মাস কার্ড কিংবা বেকার ভাতা প্রদানের মতন ইতিবাচক উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের জন্য অর্থের সংকলন অসম্ভব নয়। শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। জনস্বার্থে প্রতিশ্রুতি পূরণের রাজনৈতিক সদিচ্ছা বিএনপির রয়েছে। প্রিয় দেশবাসী, আমাদের সকল ওয়াদা বাস্তবায়নের জন্য আপনাদের দোয়া, সমর্থন, সহযোগিতা এবং ভোট চাই।

প্রিয় দেশবাসী,

জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। জনগণ রাষ্ট্রের মালিক হলে রাষ্ট্রের সুযোগ সুবিধাও ভোগ করা জনগণের অধিকার। কিন্তু ফ্যাসিবাদ আমলে সকল সুযোগ সুবিধা সম্পদ জনগণের পরিবর্তে মাফিয়া সিন্ডিকেটের হাতে কুক্ষিগত ছিল। সুতরাং এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি শুধু রাষ্ট্রের মালিকানায় নয়, জনগণ যাতে ন্যায্যভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ ও সুবিধাও ভোগ করতে পারেন বিএনপি সেটিকেও ইনশাআল্লাহ নিশ্চিত করতে চায়।

প্রিয় দেশবাসী,

সমাজের প্রতিটি শ্রেণী-প্রেশার মানুষের প্রতি লক্ষ্য রেখেই আমরা আমাদের আগামীর বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা সাজিয়েছি। আমাদের এই পরিকল্পনা থেকে সমাজের কোন অংশেই বাদ যায়নি। দেশে প্রতিবন্ধী প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের কল্যাণ নিয়েও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা মনে করি, প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি শুধু পরিবার নয় রাষ্ট্রেরও বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। আমরা সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে চাই। বাংলাদেশে প্রায় ২ লক্ষ মসজিদ রয়েছে। এই মসজিদের কয়েক লক্ষ খতিব ইমাম মোয়াজ্জেম সাহেব রয়েছেন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই মানুষগুলোর সঙ্গে আমাদের রয়েছে ধর্মীয় সামাজিক আত্মিক এবং আধ্যাত্মিক সম্পর্ক। এদের অনেকেই আর্থিকভাবে পিছিয়ে রয়েছেন। জনগণের রায় বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে দেশের ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জেম এবং একইভাবে অন্য সকল ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে আর্থিক সহযোগিতা ইনশাআল্লাহ আমরা নিশ্চিত করতে চাই।

প্রিয় দেশবাসী,

পতিত পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদ অপশক্তি দেশের সকল সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দিয়েছিল। প্রশাসনকে চূড়ান্ত রকমের দলীয়করণ করে ফেলেছিল। প্রশাসন পরিচালনায় বিএনপির নীতি হবে। প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান চলবে সাংবিধানিক নিয়মে। শাসন প্রশাসনকে দলীয়করণ নয়। প্রশাসনে নিয়োগ কিংবা পদোন্নতি হবে মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে। জনপ্রশাসন সঠিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে না পারলে আমাদের কোন উদ্যোগই সুফল মিলবে না। আমরা ইতিমধ্যেই জনগণের সামনে উপস্থাপিত। আমাদের দলীয় ইশতেহারে বলেছি জনগণের রায় বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সরকারি কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের জন্য যথাসময়ে জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা এবং বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রিয় দেশবাসী,

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশীর বসবাস। প্রবাসীরা অনেকেই বাংলাদেশে তাদের প্রিয় পরিবার পরিজন ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। বৈদেশিক আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে গার্মেন্ট সেক্টরের পরই প্রবাসী বাংলাদেশীদের অবদান। কিন্তু দেশে প্রবাসীদের সুযোগ সুবিধা সম্মান এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের দেশে বিদেশে প্রবাসীদের সম্মান সুযোগ সুবিধা সুরক্ষা অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবার আমরা প্রবাসী কার্ড প্রবর্তনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই কার্ডের মাধ্যমে দেশে প্রবাসীদের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং বিমানবন্দরে তাদের হয়রানী বন্ধসহ কয়েকটি সুবিধা বিদ্যমান থাকবে ইনশাআল্লাহ। দক্ষ বাংলাদেশী শ্রমিক বিশ্বের কোন দেশে কাজের নিশ্চয়তা বা অফার পেলে বিদেশে কর্মস্থলে যোগদানের জন্য তাদেরকে যাতে দেশে তাদের জায়গা জমি বিক্রি করতে না হয়। এজন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদেরকে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।

প্রিয় দেশবাসী,

বাংলাদেশের ৯০ ভাগের বেশি মানুষ মুসলমান। মহান আল্লাহর দরবারে আমাদের সকলের একটাই প্রার্থনা- হে আল্লাহ আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দাও। আখিরাতে কল্যাণ দাও। দোজখের আগুন থেকে বাঁচাও। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সংবিধানে সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপরে পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এই কথাটি সন্নিবেশিত করেছিলেন। কিন্তু তাঁবেদার সরকার সংবিধান থেকে এই কথাটি বাদ দিয়েছিল। আল্লাহর রহমতে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জনগণের রায় বিএনপি পুনরায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস- এই কথাটি সংবিধানে পুনরায় সন্নিবেশ করা হবে ইনশাআল্লাহ।

প্রিয় দেশবাসী,

আমাদের এই ধর্মীয় বিশ্বাস এবং মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় সামাজিক রাজনৈতিক আগ্রাসন চালানোর অপচেষ্টা হয়েছিল। অপরদিকে দেশবরেণ্য অনেক আলেম ওলেমা সোচ্চার কণ্ঠে বলেছেন, কেউ কেউ সফ দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মের অপব্যাখ্যা করে বিশ্বাসী মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করারও অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সুতরাং সকল বিশ্বাসীদের প্রতি আহ্বান কেউ যেন বিশ্বাসী মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করতে না পারে সে ব্যাপারে আমাদের সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। বিএনপি এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী। পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ থাকবে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কে কোন ধর্মের? এটি কোন জিজ্ঞাসা ছিল না। ২০২৪ সালের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধেও কে কোন ধর্মের, কার কী ধর্মীয় পরিচয়, এটির কোন জিজ্ঞাসা ছিল না। আমরা মনে করি ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার। প্রতিটি ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রীতি অনুযায়ী যার যার ধর্ম পালন করবেন। এটি একটি আধুনিক সভ্য সমাজের রীতি। সকল নাগরিকের শান্তি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাবার অধিকার সবার।

প্রিয় দেশবাসী,

দেশের গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে এটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিককামী জনগণ তাদের স্বাধীনতা হরণকারী স্বৈরাচার ধর্মীয় চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদ কোনটিকেই পছন্দ করে না। নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সংস্কৃতি বজায় রেখেই যাতে আমরা সকলে মিলেমিশে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে পারি। এ লক্ষ্যেই স্বাধীনতার ঘোষকের যুগান্তকারী রাজনৈতিক দর্শন ছিল বাংলাদেশী জাতীয়তা। বাদ দল মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এই বাংলাদেশ আমাদের সবার আমরা সবাই বাংলাদেশী।

প্রিয় দেশবাসী,

দেশের জনগণের সমর্থনে বিএনপি অতীতে বহুবার রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে দেশকে স্বনির্ভর বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। বাংলাদেশের স্বার্থ এর পক্ষে থাকার কারণেই তাকে শাহাদাত বরণ করতে হয়েছে। আমার মা মনুমা বেগম খালেদা জিয়া যাকে বাংলাদেশের জনগণ অর্থাৎ আপনারাই দেশনেত্রী উপাধি দিয়েছিলেন তিনি কখনোই আপনাদের সম্মানের অমর্যাদা করেননি। জীবনের শেষ বয়সে এসেও তিনি জেল জুলুম বরণ করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে আপস করেননি। সন্তান হিসেবে আমি জানি তার কাছে অনেক প্রস্তাব এসেছিল। তিনি চাইলেই সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে জেল জুলুম এড়িয়ে বিদেশে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু তার হৃদয় জুড়েছিল বাংলাদেশ। দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণের বিশ্বাস ছিল খালেদা জিয়া জালিমের কারাগারে থাকলেও তিনি তাঁবেদার অপশক্তির ভয়ের কারণ। খালেদা জিয়াও জনগণের বিশ্বাস এবং ভালোবাসার মর্যাদা দিয়েছিলেন। তিনি দেশেই থেকেছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত।

প্রিয় দেশবাসী,

ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে আপসীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশে পুনরায় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চেয়েছিলেন। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় গণতান্ত্রিকী জনগণের সামনে খালেদা জিয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণের সেই সময় উপস্থিত। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র ও সরকারের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জনগণের চূড়ান্ত বিজয় দেখে যেতে পারেননি।

প্রিয় দেশবাসী,

সারাদেশের সকল ছাত্র জনতা কৃষক, শ্রমিক, রিক্সাচালক, গার্মেন্টস কর্মী, ফুটপাথের হকার থেকে শুরু করে শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, সরকারি, বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা শিল্প উদ্যোক্তা এবং দেশের সকল মায়েরা, বোনেরা সবার কাছে আমার বিনীত আবেদন আপনারা যারা শহীদ জিয়াকে ভালোবাসেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ভালোবাসেন। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে ভালোবাসেন। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে ধানেরশিষকে বিজয় করুন। ধানের শীষের বিজয়ের অর্থ বাংলাদেশের বিজয়। ধানের শীষের বিজয়ের অর্থ স্বাধীন-সার্বভৌম তাঁবেদারমুক্ত বাংলাদেশ।

প্রিয় দেশবাসী,

শহীদ জিয়া আর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাফল্য যাত্রা অব্যাহত রাখতে আমি আমার দলের নেতাকর্মীদেরকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক সামাজিক অর্থনৈতিক কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘদিন থেকে হাতে কলমে প্রস্তুতি নিয়েছি। ২০০১ সালে যখন আপনাদের সমর্থনে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিল আমি তখন সরকারের অংশ হইনি। তবে বিএনপির একজন কর্মী হিসাবে সারাদেশে প্রতিটি জেলা উপজেলা গ্রাম নগর বন্দরে ঘুরেছি। আপনাদের স্থানীয় সমস্যাগুলো সম্ভাবনাগুলো জানার বোঝার চেষ্টা করেছি। পরিস্থিতির কারণে বিদেশে থাকতে বাধ্য হলেও হৃদয়-মন-সত্তা জুড়েছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জনগণ। আমি তাই বিদেশে অবস্থানকালীন সময়েও দেশের প্রতিটি এলাকায় আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেছি। বিদেশ থেকে দেশে ফিরেও আমি আবারো এই স্বল্প সময় যতটুকু সম্ভব আপনাদের কাছে ছুটে গিয়েছি। আমি আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছি। বিএনপির প্রতি আপনাদের আবেগ এবং ভালোবাসা উপলব্ধি করেছি।

প্রিয় দেশবাসী,

১২ই ফেব্রুয়ারি বিএনপির প্রতি আবারো আপনাদের ভালোবাসা প্রকাশের দিন। অতীতে আপনাদের সমর্থনে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে। দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে সেই সময় কোন কোন ক্ষেত্রে হয়তো আমাদের অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল ত্রুটি হয়েছে। সেজন্য আমি দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অর্জনগুলোকে অবলম্বন করে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনের জন্য আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে আবারো আমি আপনাদের সমর্থন চাই। আমি দেশ এবং জনগণের জন্য আপনার এবং আপনার পরিবারের সদস্যের জন্য যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি প্রতিটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ধানের শীষে আপনাদের সমর্থন এবং আপনাদের ভোট চাই।

প্রিয় দেশবাসী, প্রতিটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের কাছে রাষ্ট্র এবং সরকারকে দায়বদ্ধ রাখার কোনই বিকল্প নেই। রাষ্ট্র পরিচালনায় আপনাদের সমর্থন পেলে দেশের আগামী দিনে সরকার হবে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে যতটা কঠোর হওয়া যায় বিএনপি সরকার ইনশাআল্লাহ ততটাই কঠোর হবে। দেশে পুনরায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ। দেশবাসীর কাছে এটি আমার অঙ্গীকার। বিএনপির অঙ্গীকার। আপনাদের কাছে আমার অঙ্গীকারের কারণ আপনারাই বিএনপির সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। প্রিয় দেশবাসী ফ্যাসিবাদ আমলে ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি তথাকথিত দামি নির্বাচনে আমি আপনাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলাম ৭ই জানুয়ারি সারাদিন পরিবারকে সময় দিন। বর্তমানে ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে এবার দেশবাসীর প্রতি আমার আহ্বান। আপনাদের প্রতি আমার বিনীত আবেদন, ১২ই ফেব্রুয়ারি সারাদিন ধানের শীষে ভোট দিন। তারুণ্যের প্রথম ভোট ধানের শীষের জন্য হোক।

প্রিয় দেশবাসী,

গণতন্ত্রকামী প্রিয় ভাই ও বোনেরা ১২ই ফেব্রুয়ারি আপনারা ধানের শীষের প্রার্থীদের দায়িত্ব নিন। ১৩ তারিখ থেকে আপনাদের নির্বাচিত এমপিরা আপনাদের দায়িত্ব নেবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আপনাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে কিনা সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমি নেব ইনশাআল্লাহ। ১২ই ফেব্রুয়ারি যদি আপনাদের সমর্থন পাই তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপির মূল মন্ত্র থাকবে মহানবীর সা: মহান আদর্শ ন্যায়পরায়ণতা। ১২ই ফেব্রুয়ারি জনগণের বাংলাদেশে জনগণ এর অধিকার প্রতিষ্ঠার এই দিনে আমি আল্লাহর দরবারে ধানের শীষের বিজয় কামনা করে আমার বক্তব্য শেষ করছি। ১২ই ফেব্রুয়ারি সারাদিন ধানের শীষে ভোট দিন।

আল্লাহ হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দাবাদ।