স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা, নিরপেক্ষতা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সম্প্রতি ইসি সচিবালয়ে বিতর্কিত ও রাজনৈতিকভাবে পদায়নকৃত অতিরিক্ত সচিব সামসুল আলমের নিয়োগ বাতিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অযোগ্য ঘোষণার নীতিগত সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে দলটি। এ ছাড়া নির্বাচন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধি-নিষেধ তৈরিতে রাজনৈতিক চাপ ও নির্দেশনার সামনে নির্বাচন কমিশনের নতিস্বীকারের অভিযোগ এনে সংস্থাটিকে কড়া বার্তা দিয়েছে দলটি।
বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনের সভাকক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সাথে বৈঠক শেষে এই সব তথ্য জানান দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ সময় বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ এবং নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
জামায়াতের প্রতিনিধি দলে ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, সিনিয়র আইনজীবী ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দীন সরকার এবং সিনিয়র আইনজীবী ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির। বৈঠকে জামায়াতের প্রতিনিধি দল মোট নয়টি প্রস্তাব সম্বলিত একটি চিঠি হস্তান্তর করেন।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন সংবিধান প্রদত্ত বিপুল ক্ষমতার মালিক হলেও তারা সেই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার সঠিকভাবে এক্সারসাইজ বা প্রয়োগ করতে পারছে না। ইসির সাম্প্রতিক বেশকিছু পদক্ষেপের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কমিশনের অঙ্গভঙ্গি ও কাজের ধারায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তারা মারাত্মক রাজনৈতিক চাপে রয়েছে। চাপের মুখে পড়েই স্বাধীন সিদ্ধান্তের বদলে আজ্ঞাবহ ভূমিকা পালন করছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির সরোয়ার আলমের গেজেট ও শপথের দ্রুততার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, আদালতের আদেশের কপি বা বিচারপতির সিগনেচার করা নির্দেশ হাতে আসার আগেই রাজনৈতিক প্রভাবে মাত্র দুই-চার ঘণ্টার মধ্যে তড়িঘড়ি করে গেজেট জারি ও শপথের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা কমিশনের চরম অস্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক চাপের মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রমাণ দেয়।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব সামসুল আলম একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সাবেক সিনিয়র নেতা এবং বিগত সংসদ নির্বাচনে সরাসরি আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত কমিটির সদস্য ছিলেন। তাকে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পদে থাকা এমন ব্যক্তিকে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া আগামী যেকোনো নির্বাচনকে একপেশে ও পক্ষপাতমূলক করার সুনির্দিষ্ট চক্রান্ত। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে প্রভাবিত করতেই সরকারের পক্ষ থেকে এই অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়া হয়েছে। বৈঠকের আলোচনায় ইসি কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় আগে না জানার অক্ষমতা প্রকাশ করেন সিইসি। জামায়াত প্রতিনিধি দল সাফ জানিয়ে দেয় যে, একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশন ইচ্ছা করলেই এই বিতর্কিত রাজনৈতিক নিয়োগ গ্রহণে অসম্মতি জানাতে বা বাতিল করতে পারত।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ইসির নিরপেক্ষতা ও জনকল্যাণমুখী ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা অপর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি হলো এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা সংক্রান্ত সুপারিশ। এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একে চরম বৈষম্যমূলক ও সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দেন তিনি।
জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান বা শিক্ষকরা যদি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অযোগ্য না হন তবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে তারা কেন প্রার্থী হতে পারবেন না। দীর্ঘদিনের সুসংগঠিত লোকাল গভর্নমেন্ট নির্বাচনের সংস্কৃতি ভেঙে কোনো স্টেকহোল্ডার বা রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ ছাড়াই কেন ইসি এমন শিক্ষকবিরোধী নীতি তৈরি করে সরকারের বিচার-বিবেচনার জন্য পাঠাল, তা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। কমিশন অবশ্য বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ইসি বৈঠকে এটি পুনর্মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়েছে।
জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানের সূচি ও তারিখ ঘোষণা নিয়ে কমিশনের ভূমিকায় আমরা অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ। নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত, সময়সূচি বা দিনক্ষণ নির্ধারণের একমাত্র আইনগত এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। কমিশন নিজের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন না করায় প্রতিদিন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী একেক রকম তারিখ বা মাস ঘোষণা করছেন। সরকারের এমপি-মন্ত্রীদের এই বেআইনি হস্তক্ষেপ বন্ধ করে ইসির নিজস্ব ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করার তাগিদ দেয়া হয়।
তিনি বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ হওয়া কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা পদ-পদবীধারীদের ব্যক্তি পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়া বন্ধ করা ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় সুবিধাজনক রাজনৈতিক পদে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রার্থিতার অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছি। নির্বাচনে এমপি-মন্ত্রীদের সরাসরি প্রভাব বিস্তার বন্ধে কঠোর বিধিনিষেধ জারির আনুষ্ঠানিক দাবি জানান জামায়াত প্রতিনিধিরা।
রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যান্য সাম্প্রতিক বিষয়ের অবতারণা করে জামায়াত সেক্রেটারি সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কৃত এক সংসদ সদস্যের পদ থাকা না থাকার ইস্যুটিকে পুরোপুরি সাংবিধানিক জটিলতা বলে উল্লেখ করেন এবং এ সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর ছেড়ে দেন। তিনি জানান, ব্যক্তির কোনো অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে, যা চূড়ান্ত।
একইসাথে যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের পারিবারিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার বাড়িতে হামলা ও পরিবারকে হেনস্তা করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করে গণমাধ্যমকে প্রকৃত সত্য উন্মোচনের আহ্বান জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার।



