‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের ভিত্তিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার প্রকাশ করেছে বিএনপি। ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। তবে ৪৪ পৃষ্ঠার বিস্তৃত এই ইশতেহারে পাঁচটি ভাগে ৫১টি দফা নানা পয়েন্টে উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে বিএনপি দলের ঘোষিত ৩১ দফা ও স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। সুশাসন নিশ্চিতে দুর্নীতি দমন, ন্যায়পাল নিয়োগ ও পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনার অঙ্গীকার করেছে। আইনের শাসন বাস্তবায়নে দলটি ফ্যাসিস্ট আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সুনিশ্চিতের কথা বলেছে। বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনে দলটি স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফ, বেকারভাতা প্রদান, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ, ই-হেলথ কার্ড চালু, প্রতিরক্ষা খাতে ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন নীতি প্রণয়ন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান, ৫ বছরে ১ কোটি জনশক্তি বিদেশে প্রেরণের অঙ্গীকার করেছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করে দলটি বলেছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে বিএনপি ও নির্বাচনী জোটের নেতারা ছাড়াও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার বিশিষ্ট জনেরা উপস্থিত ছিলেন।
৯ প্রধান প্রতিশ্রুতি : ইশতেহারে বিএনপি অর্থনীতি, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পরিবেশসহ বিভিন্ন খাতে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেছে। এগুলো হলো–
১. ফ্যামিলি কার্ড : প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। পর্যায়ক্রমে সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো হবে।
২. কৃষক কার্ড : কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ‘কৃষক কার্ডে’র মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষিবীমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও এ সুবিধা পাবেন।
৩. স্বাস্থ্য খাতে বড় নিয়োগ : দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
৪. কর্মমুখী শিক্ষা : প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রাধিকার, বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি, প্রযুক্তি সহায়তা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিড-ডে মিল’ চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
৫. তরুণদের কর্মসংস্থান : কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্সে সংযুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা।
৬. ক্রীড়া উন্নয়ন : ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সুবিধা বাড়ানো হবে।
৭. পরিবেশ সুরক্ষা : দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নেয়া হবে।
৮. ধর্মীয় সম্প্রীতি : সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি।
৯. ডিজিটাল অর্থনীতি : আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ।
বিএনপি বলেছে, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই দলটির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা-এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে বিএনপি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রতিটি নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে-সবার আগে বাংলাদেশ।
‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বিএনপি ক্ষমতায় এলে জুলাই সনদের মূল প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করবে।
তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফায় শুরুতে জুলাই সনদের বিষয়টি ছিল না। কিন্তু দেশের দলমত নির্বিশেষে সবাই ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি চায় না। আমরাও চাই না। তাই আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করব। জুলাই সনদের অধিকাংশ বিষয়বস্তু আমাদের ৩১ দফার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’
কল্যাণমুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ-নামক ৫১-দফা ইশতেহারে দেশ পরিচালনা ও জনগণের জীবন মান উন্নয়নের জন্য নানা প্রতিশ্রুতি রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা করার লক্ষ রাখা হয়েছে। এতে রাজনৈতিক সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, শিক্ষা-স্বাস্থ্য আধুনিকীকরণ এবং দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিস্তৃত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়; বরং ‘রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি রূপরেখা’।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন এলাকায় তাদের নামে রাস্তা, সেতু ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘যারা আন্দোলনে জীবন দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ যেন ইতিহাসে হারিয়ে না যায়– সেই উদ্যোগ আমরা নেবো।’
দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের আদর্শের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘৪৭ বছর আগে যে আদর্শ নিয়ে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আজও আমরা সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হইনি।’
‘নতুন সামাজিক চুক্তি’র অঙ্গীকার : বিএনপি বলছে, এই ইশতেহার শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়; বরং এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। দলটির ভাষ্য- তারা প্রতিশোধের রাজনীতিতে নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাসী।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই আমাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা– এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।’
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থান : অর্থনীতিকে ইশতেহারের কেন্দ্রীয় অক্ষ হিসেবে ধরা হয়েছে। দলটি বলছে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, শিল্পায়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে। বিশেষভাবে যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের ঘোষণা রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে কয়েক মিলিয়ন নতুন চাকরি সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) সম্প্রসারণ, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনভিত্তিক উদ্যোগে প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে
দলটির মতে, শুধুমাত্র সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি খাত ও উদ্যোক্তাদের শক্তিশালী করলেই টেকসই কর্মসংস্থান সম্ভব। সে লক্ষ্যে কর-নীতিতে সংস্কার, ব্যবসায়িক লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং শিল্পাঞ্চলভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি : গ্রামীণ বাংলাদেশকে অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে বিএনপি কৃষকবান্ধব বেশ কয়েকটি উদ্যোগের কথা বলেছে। ‘ফার্মার কার্ড’ চালুর মাধ্যমে সার, বীজ, সেচসুবিধা ও কৃষিঋণ সহজলভ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকদের ঋণ বোঝা কমাতে স্বল্পসুদে বা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ঋণমওকুফের কথাও উল্লেখ আছে।
দলটির দাবি, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক যান্ত্রিকীকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পায়
এ ছাড়া মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে ‘গ্রামীণ কর্মসংস্থানের বিকল্প শক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করে নতুন বিনিয়োগ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিবার ও সামাজিক সুরক্ষা : ইশতেহারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে সামাজিক সুরক্ষা। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারকে নিয়মিত খাদ্য বা নগদ সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। লক্ষ্য হলো– মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় যাতে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো ন্যূনতম জীবনমান বজায় রাখতে পারে।
বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও অসহায় জনগোষ্ঠীর ভাতা বৃদ্ধি ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিতরণের কথাও বলা হয়েছে, যাতে দুর্নীতি কমে এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা সুবিধা পান।
শিক্ষা : দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তর : শিক্ষাকে মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরে বিএনপি কারিকুলাম আধুনিকীকরণ ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। মাধ্যমিক স্তর থেকে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ডিজিটাল ল্যাব, ট্যাব বা ডিভাইস বিতরণ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়াতে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং উচ্চশিক্ষায় গবেষণাভিত্তিক অনুদান বাড়ানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
দলটির মতে– শুধু ডিগ্রি নয়, দক্ষতা অর্জনই হবে ভবিষ্যৎ শিক্ষার লক্ষ্য।
স্বাস্থ্য : সবার জন্য সেবা : স্বাস্থ্য খাতেও কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। জেলা ও উপজেলাপর্যায়ে হাসপাতালের মানোন্নয়ন, চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি, ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতি দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ করে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবাকে অগ্রাধিকার দেয়ার ঘোষণা রয়েছে। দলটির দাবি, স্বাস্থ্যসেবা নাগরিকের মৌলিক অধিকার– এটি বাণিজ্যিক খাতে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না
শাসন ও গণতান্ত্রিক সংস্কার : বিএনপির ইশতেহারের সবচেয়ে রাজনৈতিক অংশটি হলো শাসন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
নির্বাচনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কার্যক্রম এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। দলটি বলছে, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ এবং সরকারি সেবায় ডিজিটাল স্বচ্ছতা আনার পরিকল্পনাও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত।
নারী ও তরুণদের অগ্রাধিকার : নারীর ক্ষমতায়নকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তা, কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ঋণ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর প্রস্তাব রয়েছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
অন্য দিকে তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবনভিত্তিক কার্যক্রমে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে তারা সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত হতে পারে
পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন : পরিবেশ সুরক্ষায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, নদী ও জলাশয় সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের ঘোষণা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় উপকূলীয় অঞ্চল সুরক্ষা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত। দলটির মতে, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সহায়তা : ইশতেহারে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, খতিব-ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা প্রদান এবং নৈতিক-সামাজিক শিক্ষার প্রসারের কথা বলা হয়েছে। একই সাথে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
সবমিলিয়ে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার একটি সমন্বিত উন্নয়ন-দর্শন তুলে ধরেছে- যেখানে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সামাজিক ন্যায়কে একসাথে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। দলটির দাবি, এটি কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং ‘জনকল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার রূপরেখা’।
বাস্তবতা বনাম প্রতিশ্রুতি : বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির ইশতেহারে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও শাসন সংস্কারের ওপর যে জোর দেয়া হয়েছে, তা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো, আর্থিক সংস্থান ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।
বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ ও স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের জন্য বড় বাজেট প্রয়োজন হবে। ফলে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও কর ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।
রাজনৈতিক তাৎপর্য : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়ে বিএনপি মূলত সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনের চেতনার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে চেয়েছে। একই সাথে সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও শাসন সংস্কারের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সাধারণ ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্কটকে প্রাধান্য দিয়েছে বিএনপি। এখন দেখার বিষয়– এই প্রতিশ্রুতিগুলো ভোটারদের কতটা আস্থায় নিতে পারে এবং নির্বাচনে তার প্রতিফলন কী হয়।



