তৃণমূলের রাজনীতি থেকে ধাপে ধাপে উঠে এসেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছাত্রজীবনে ছিলেন ছাত্রনেতা, কর্মজীবনে অর্থনীতির শিক্ষক। পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম এবার দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) তাকে বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন।
৭৮ বছর বয়সী মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও এগিয়েছেন তিনি।
২০১৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মির্জা ফখরুল। এর আগে ২০১১ সালের ২০ মার্চ থেকে দীর্ঘ পাঁচ বছর দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাকে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত করা হয়।

ছাত্রজীবন থেকেই তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ার সময় তিনি বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন। তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সভাপতি ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেয়ার পর মির্জা ফখরুল অধ্যাপনা পেশায় যোগদান করেন। ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতার পর তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকালে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন।
১৯৮৮ সালে মির্জা ফখরুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। ৯০-এর দশকের শুরুতে এরশাদ বিরোধী দেশব্যাপী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল প্রথমে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পরবর্তী সময়ে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন।
দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসার আগে তিনি বিএনপির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহ-সভাপতি ছিলেন। পরে দীর্ঘদিন সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ এলাকা ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ এবং বগুড়া-৬ আসন থেকে জয়লাভ করেন তিনি। তবে, দেশজুড়ে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন ও সংকটময় সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম দলের অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্বে আসেন। এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালে বিএনপি তীব্র দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ২০১৮ সাল থেকে প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন।
পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। অন্যদিকে, ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে চলে যান এবং সেখান থেকেই দল পরিচালনা করতে থাকেন।
এমন এক পরিস্থিতিতে মির্জা ফখরুল ইসলামই দেশে থেকে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রম ও আন্দোলনের মূল কাণ্ডারী হয়ে ওঠেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে তিনবার কারাবরণ করেন তিনি।
২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। সেই থেকে টানা এই দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষকতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতৃত্ব অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত তিনি বিএনপির মহাসচিব হন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ী এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন পেশায় আইনজীবী ছিলেন। তিনি পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের দুইবারের সদস্য এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য ছিলেন। এরশাদ সরকারের আমলে তিনি মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। তার মা মির্জা ফাতেমা আমিন।
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। তবে তার রাজনীতির শেকড় গড়ে উঠেছিল ছাত্রজীবনেই। বামপন্থী ছাত্র রাজনীতি দিয়ে শুরু করে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) মাধ্যমে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পরে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির পথ পেরিয়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।
বিএনপি মহাসচিব হিসেবে দলের নীতি-নির্ধারণ ও সার্বিক কার্যক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। কঠিন সময়ে বিএনপিকে সুসংগঠিত রাখা এবং দলের রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার প্রশংসা করেছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ১৩তম জাতীয় সংসদে তার আসনটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঠিক পাশেই। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতে, দলের চরম সংকটে দীর্ঘদিনের ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবেই তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে সম্মানিত করা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম পারিবারিক জীবনকেন্দ্রিক এক ব্যক্তিত্ব। স্ত্রী রাহাত আরা বেগম এবং দুই কন্যা মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে তার পরিবার। তার স্ত্রী বেসরকারি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বর্তমানে তিনি অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। তার বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এবং সিডনিতে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। ছোট মেয়ে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
ছাত্রনেতা ও শিক্ষক থেকে শুরু করে তৃণমূলের রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। রাষ্ট্রপতি পদে তার এই মনোনয়ন দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে।
সূত্র : বাসস


