বাংলাদেশ জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদের ভাইরাস, চাঁদাবাজির ভাইরাস, দুর্নীতির ভাইরাস, দলীয় শাসনের ভাইরাস—এই সকল ভাইরাস মুক্ত করার জন্য আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য হয়ে উঠেছে। সেই বিপ্লবের জন্য আপনারা কি প্রস্তুত? মানুষের জীবন, ইজ্জত এবং সম্পদ, দেশের সীমানার জন্য আরেকবার কি জীবন দিতে প্রস্তুত আছেন? বন্ধুরা, এই বয়সে আমি এবং আমরা পিছিয়ে থাকব না। সম্মুখ সারিতে থাকব। তবুও বাংলাদেশের দিকে কাউকে লাল চোখ দিয়ে তাকাতে দেব না।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেল ৫টায় রাজধানীর বিজয়নগর পানির ট্যাংকি মোড়ে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা মহানগরী আয়োজিত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট এই জাতিকে আল্লাহ তাআলা আমাদের ছাত্র, শ্রমিক, যুব, জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মাত্র দুইটি বছর আগে মুক্তি দিয়েছিলেন। সেই সময়ে যে দলটি আমাদের মতোই মজলুম ছিল, নির্যাতিত ছিল, আজকে তারা ক্ষমতায় আছে। আরো দুঃখজনক এই দলটি নিজেদের হাতে নিজেদের কর্মীদেরই খুন করেছে। যাদের নিজেদের কর্মীদের সম্পর্কে নিজেদেরই কোনো দায় এবং দরদ থাকে না, ২০ কোটি মানুষের জন্য কি তাদের দায় এবং দরদ থাকবে। লজ্জার বিষয়! ফ্যাসিবাদের থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বলে ঠিক ফ্যাসিবাদের রাজপথ ধরেই তারা এখন হাঁটা শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিভিন্ন ব্যাংকে অযাচিত হস্তক্ষেপ, বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজগুলো দলীয় অনুগত লোকদের দিয়ে দখল করা, জেলায় জেলায় প্রশাসক বসিয়ে দেয়া, এমনকি খেলার মাঠটা পর্যন্ত তারা দলমুক্ত রাখতে পারলেন না। এইভাবে তারা আবার কার্যত একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসনের দিকেই আগাচ্ছেন। বাংলাদেশ কিন্তু বারবার বিপ্লবের সাক্ষী। পরিষ্কার বলে দিচ্ছি—হয় আপনারা বিচার নিশ্চিত করুন, না হয় আপনারা যাওয়ার রাস্তা খুঁজে বের করুন।
বিএনপির একজন সিনিয়র নেতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ঘোষণা করে দিয়েছেন—নির্মূল করবেন। অতীতে যারা নির্মূল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারা নিজেরাই আজকে নির্মূল হয়ে গেছে। নির্মূল নির্মূল বেশি করবেন না। কোনো কালো হাত বাড়ালে সেই হাত গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত এই দেশকে পাহারা দেবে, ইনশাআল্লাহ। কারো বাবার সাধ্য নাই এ দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব নিয়ে টানাটানি করার। মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে আপনাদেরকে আগামী সেই বিপ্লবের দাওয়াত আজকে দিয়ে রাখলাম। সংসদে যতদিন পর্যন্ত কথা বলার পরিবেশ থাকবে, জাতির স্বার্থে যতদিন পর্যন্ত থাকার দরকার হবে, তার বাইরে আমরা এক সেকেন্ডও থাকব না। যেদিন সংসদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে, যেদিন মনে হবে এই সংসদে আর কথা বলে লাভ নেই, সেদিন সেই সংসদে খোদা হাফেজ বলে আমরা বেরিয়ে আসব। প্রস্তুত থাকুন সেই বিপ্লবের জন্য। অন্যায়ের সাথে কোনো আপস নয়। নতুন পুরাতন কোনো ফ্যাসিবাদ মানি না। পুরাতনও পরিত্যাজ্য, নতুনও ঘৃণিত।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চীপ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, আজকে ১১ দলীয় ঐক্যের আহ্বানে আজকের এই সমাবেশে আমরা জড়ো হয়েছি বিচারের দাবিতে। এটা আমাদের জন্য দুঃখজনক, আমাদের জন্য হতাশার, যে গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায়ও আমাদেরকে বিচারের দাবিতে আজও রাজপথে হাজির হতে হচ্ছে। আওয়ামী লীগ বিগত ১৬-১৭ বছরে অসংখ্য বোমা, খুন, গণহত্যা চালিয়েছে এ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর, বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপরে। তার ফলশ্রুতিতে গণঅভ্যুত্থানের মুখে পড়ে শেখ হাসিনাকে পালিয়ে যেতে হয়েছিল দিল্লিতে। এই সরকার, নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পরে গত চার মাসে আইসিটিতে নতুন কোনো রায় আমরা এখন পর্যন্ত দেখিনি। কোনো নতুন কোনো তদন্তের রিপোর্ট এখন পর্যন্ত দাখিল হয় নাই।
তিনি বলেন, এটা স্পষ্টত যে চিফ প্রসিকিউটরকে বসানো হয়েছে, তিনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। অবিলম্বে তাকে পদত্যাগ করতে হবে এবং নতুন যোগ্য দায়িত্ববান ব্যক্তিকে বসাতে হবে যিনি আন্তর্জাতিক ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার নিষ্পন্ন করবেন এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার সকল ব্যবস্থা নিশ্চিত করবেন। গণহত্যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে, আর সংস্কার বাস্তবায়ন না করার ফলে বিএনপি জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়িছে। এই দুই শক্তির বিরুদ্ধে আমাদেরকে এখন সমানভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে সংস্কার, বিচার এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আমরা আজ ২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী দিবসে দাঁড়িয়ে আছি—যে দিনে বিশ্বাসঘাতকতা ও গাদ্দারির মাধ্যমে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল লর্ড ক্লাইভের দল। আজ এই ঐতিহাসিক দিনে আমরা বলতে চাই, রক্ত দিয়ে আমরা জুলাই বিপ্লব ঘটিয়েছি। সেই রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদকে বিতাড়িত করেছি, জীবন দিয়েও আমরা বাংলার মাটিকে মুক্ত রাখবো- এটাই আমাদের শপথ।
তিনি বলেন, আমরা আমাদের জুলাই বিপ্লবসহ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের সহযোদ্ধা বিএনপির নেতৃবৃন্দের কাছে আহ্বান জানাই—নতুন বাংলাদেশের যাত্রায় শহীদদের প্রতি আমাদের কমিটমেন্ট থাকতে হবে। বিগত দিনের প্রতিটি গুম, খুন ও হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে। আমরা বিচার করব ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডির। আমরা বিচার করব আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে নিয়ে সংঘটিত ঘটনাবলির। শাপলা চত্বরে সংগঠিত গণহত্যারও বিচার হবে।
তিনি আরো বলেন, ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে। যদি বিএনপি এসব হত্যার বিচার নিশ্চিত না করে, ভবিষ্যতে তাদেরও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
তিনি বলেন, শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার পর হত্যাকারীরা ভারতে আশ্রয় পেয়েছে। আমরা ভারত সরকারকে আহ্বান জানাই—এই হত্যাকারীদের বাংলাদেশে হস্তান্তর করতে হবে। যদি তা না করা হয়, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টি উত্থাপন করবে।
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, যেই বিএনপির ১০০ দিনে দেশে ৯৫২টি মানুষ খুন হয় সেই বিএনপির কাছে বিচার দাবি করে কি লাভ আছে? যে বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে দিবালোকে আওয়ামী কায়দায় পল্টনে ২৮ অক্টোবর মানুষ হত্যা করে নৃত্য করেছিল, তার আদলে বিটফুটের সোহাগের লাশের ওপর নৃত্য করেছে, সেই বিএনপির কাছে কি বিচার আশা করা যায়?



