খালেদা জিয়া : গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের ঐক্যের প্রতীক

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় একাধিকবার জায়গা পাওয়া এই জনগণের নেত্রী আজ শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

অনলাইন প্রতিবেদক
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া |ফাইল ছবি

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, তিনবারের জনগণের তুমুল সমর্থিত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এখন জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী নেত্রীদের একজন তিনি। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের গণতন্ত্র ও ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হওয়া এক বিস্মরণীয় ইতিহাসের নাম। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় একাধিকবার জায়গা পাওয়া এই জনগণের নেত্রী আজ শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে জন্ম নেয়া খালেদা জিয়ার ডাকনাম ছিল ‘পুতুল’। তিন বোন ও দু’ ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করার পরই তিনি ‘খালেদা জিয়া’ নামে পরিচিতি পান।

স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতেও তিনি ছিলেন দৃঢ়চিত্ত। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা থেকে শুরু করে বিজয়ের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি থাকা—সবই তাকে আরো বলিষ্ঠ করে তোলে।

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ কারাগারে যাওয়ার ঘটনা তুলে ধরে লেখক বীর মক্তিযোদ্ধা ইমরানুল হক চাকলাদার তার ‘মাদার অফ ডেমোক্রেসি’ বইয়ে লিখেছেন-দুপুর ১২টার দিকে বিএনপি নেত্রী আদালতের উদ্দেশে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ ছাড়েন যখন, তখন আত্মীয়দের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। খালেদা জিয়া তাদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘কান্নার কিছু নেই। আমি ভালো থাকব। তোমরা অপেক্ষা কর। আমি ফিরে আসব। মন খারাপ কর না। শক্ত থাক।’ এমন বক্তব্যে বেগম খালেদা জিয়ার ভেতরে দৃঢ় মনোবল আরেকবার পরিস্ফুটিত হয়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান হত্যার পর দলের নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়াকে আহ্বান জানান বিএনপির নেতৃত্ব দেয়ার জন্য। তিনি ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। পরের বছরই সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বেই বিএনপি একটি গণমানুষের দল হিসেবে পূর্ণতা পায়।

১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে জনগণের কাছে আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন বেগম খালেদা জিয়া। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তার ভূমিকা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায়।

১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি সংসদীয় আসন থেকে এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনটি আসনে ১৮টি আসনে বেগম খালেদা জিয়া একাই জিতেছিলেন। ফোর্বস ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাবান নারীর তালিকায় তিনি ছিলেন ২০০৪ সালে ১৪তম, ২০০৫ সালে ২৯তম, ২০০৬ সালে ৩৩তম। তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে মোট পাঁচবার গ্রেফতার হতে হয়। প্রথমবার ১৯৮৩ সালে, এরপর ১৯৮৪ ও ১৯৮৭, ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত সরকারের সময়ে এবং ২০১৮ সালে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে।

২০০৭ সালে তিনি এক বছরের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় কারাগারে পাঠানো হলে প্রায় দু’ বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়া হয়।

কারাগারে থাকার সময় থেকেই তার শারীরিক অবস্থা অবনতির দিকে যায়। কিডনি, লিভার, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিসসহ জটিল রোগে ভুগছিলেন তিনি। ২০২১ সালে তিনি করোনায় আক্রান্ত হন এবং ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তাকে সিসিইউতে ভর্তি করা হয়।

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান এবং ১১৭ দিন পর ৬ মে দেশে ফেরেন তিনি। এরপর থেকেই দেশী-বিদেশী চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছিল। গত ২৩ নভেম্বর অসুস্থ হয়ে পড়লে রাতেই রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় খালেদা জিয়াকে। তার বর্তমান শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশ-বিদেশের কোটি মানুষ।

শনিবার (২৯ নভেম্বর) বিকেলে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়া ‘সঙ্কটাপন্ন’ অবস্থাতেই আছেন, দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে চিকিৎসা চলছে।

নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ওলামা দলের আয়োজন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য দোয়া মাহফিলে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত যে অবনতি হচ্ছে, সেজন্য তার ওপরে বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যায়-জুলুম দায়ী। আজকে কিন্তু মানুষ বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষরা ঘরে ঘরে বসে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া করছে। চোখে না দেখলে, বিশ্বাস হয় না মানুষ তাকে কিভাবে ভালোবাসে! যিনি গণতন্ত্রের সাধক এবং সারা বাংলাদেশের মানুষ যাকে আপসহীন নেত্রী হিসেবে কোনো অন্যায় নীতির সাথে তিনি কোনদিন আপস করেন নাই। এমন একজন এবং মহান আল্লাহ তালা তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে আমাদের কাছে আবার ফিরিয়ে আনবেন এই প্রত্যাশা রাখছি।’

শনিবার বিকেলে মুন্সিগঞ্জ-১ (সিরাজদিখান-শ্রীনগর) আসনের সনাতনী সমোবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, যে মানুষটি গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার নিয়ে ৪০ বছর সংগ্রাম করেছেন, যে মানুষটি জীবনে অন্যায়ের কোনদিন আপস করেননি সে মানুষটি হাসিমুখে কারাগারকে বরণ করেছেন সে আজ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা করছে। হাসিমুখে কারাগারে গেলেও অসুস্থ অবস্থায় কারাগার থেকে বের হলেন তিনি। যথাসময়ে উন্নত চিকিৎসা হলে আজ খালেদা জিয়ার এ অবস্থা হতো না। খালেদা জাতির বটবৃক্ষ। যার ছায়ায় আমরা স্বস্তি পাই। আজকে তার যদি কিছু হয়ে যায় দেশ সঙ্কটে পড়বে। ভোটের আনন্দ মুছে যাবে।

শনিবার (২৯ নভেম্বর) বেলা ১১টায় হাটহাজারী বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা নিরাপদে হরিলুট করার জন্য খালেদা জিয়াকে পথের কাঁটা মনে করেছিল। এজন্য তাকে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে যত ধরনের চক্রান্ত সব করেছে। খালেদা জিয়া হেঁটে হেঁটে জেলে গেলেন আর ফিরে আসলেন হুইল চেয়ারে। দিনের পর দিন হাসপাতালে কাটাতে হচ্ছে। তিনি আজ মৃত্যুর সন্নিকটে। শেখ হাসিনার কারণে তিনি মৃত্যুশয্যায়। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের হুমকি, হাসিনার ষড়যন্ত্র ও রক্তচক্ষু দেখেও দেশ ও দেশের জনগণকে ছেড়ে যাননি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। কারাগারে নির্যাতন ও খাবারে বিষ প্রয়োগ করেও তাকে দেশের মানুষের থেকে আলাদা করা যায়নি।

শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) রাতে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে বাংলাদেশ জামায়াতের ইসলামীর ডা: শফিকুর রহমান লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির সংবাদে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তার সার্বিক শারীরিক অবস্থার ব্যাপারে আমরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছি। মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে আন্তরিক আরজ— আল্লাহ তা’য়ালা যেন তাকে দ্রুত পূর্ণ সুস্থতা দান করেন, সকল কষ্ট সহজ করে দেন এবং তার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করে দেন। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে রোগব্যাধি ও বিপদাপদ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।’

এর আগে, বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসও খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসার সব প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সমন্বয় নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাই সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীর কাছে তার দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া কামনা করেছেন এবং জানিয়েছেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সময়ে বেগম খালেদা জিয়া জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা।

এছাড়া ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করেছেন।