সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণসংক্রান্ত নতুন নীতিমালার বিভিন্ন বিধানকে অস্পষ্ট, স্ববিরোধী ও বাস্তবতাবিবর্জিত আখ্যা দিয়ে এর আওতায় নতুন ডিলার নিয়োগের কার্যক্রম স্থগিতের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)।
সংগঠনটির দাবি, নীতিমালার অস্পষ্টতা দূর না করে নতুন ডিলার নিয়োগ করা হলে সার বিতরণ ব্যবস্থায় প্রশাসনিক জটিলতা, বৈষম্য ও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে গত ১ সেপ্টেম্বর লিখিত আবেদন করেছেন বিএফএ চেয়ারম্যান মো: মোশারফ হোসেন। আবেদনে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৬’ এবং গত ২৭ আগস্ট জারি করা ‘রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে সার ডিলার নিয়োগ’ শীর্ষক পরিপত্রের কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত রেখে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে বিষয়গুলো স্পষ্ট করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিএফএ বলেছে, ২৭ আগস্টের পরিপত্রে বিদ্যমান ডিলারের পাশাপাশি প্রতি ইউনিয়নে একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ‘বিদ্যমান ডিলার’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। বর্তমানে বিভিন্ন ইউনিয়নে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ডিলারের পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) এক বা একাধিক ডিলার রয়েছেন। ফলে নতুন করে একজন ডিলার নিয়োগ করা হলে কোনো কোনো ইউনিয়নে ডিলারের সংখ্যা তিন, চার বা তারও বেশি হতে পারে।
সংগঠনটির মতে, এতে প্রতি ইউনিয়নে প্রকৃতপক্ষে কতজন ডিলার থাকবেন তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ডিলার নিয়োগের কারণে ব্যবসায়িক সক্ষমতার তুলনায় ডিলারের সংখ্যা বেড়ে গেলে অনেক ডিলারের কার্যক্রম অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে সার বিতরণ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিসিআইসি-বিএডিসি ডিলার নিয়ে প্রশ্ন
বিএফএ নতুন নীতিমালায় বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারদের একই শ্রেণির ‘সার ডিলার’ হিসেবে বিবেচনার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, দুই ধরনের ডিলারের নিয়োগের ধরন, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা জামানত, অবকাঠামো ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, বিসিআইসি ডিলাররা ১৯৯৫ সাল থেকে দুই লাখ টাকা নিরাপত্তা জামানত দিয়ে প্রায় তিন দশক ধরে সরকারি ব্যবস্থার আওতায় সার বিতরণ করে আসছেন। ১৯৯৪ সালের সার সরবরাহ সংকট ও কৃষক অসন্তোষের পর ১৯৯৫ সালে সার বিপণন ব্যবস্থাকে সুসংগঠিত করতে সারাদেশে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ ডিলার নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেছে বিএফএ।
সংগঠনটির মতে, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ বিবেচনায় নিয়ে ডিলার ইউনিট নির্ধারণ করতে হবে। কৃষকের কাছে সময়মতো পর্যাপ্ত সার এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার সরবরাহ নিশ্চিত করাই ডিলার ব্যবস্থা সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
ডিলার-খুচরা বিক্রেতার দায় নির্ধারণের দাবি
নীতিমালায় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতার সীমারেখা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে বিএফএ। সংগঠনটির বক্তব্য, খুচরা বিক্রেতারা উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির অনুমোদন নিয়ে কাজ করেন। তাই তাদের নিজস্ব অনিয়ম বা প্রশাসনিক দায়ের জন্য ডিলারকে কতটুকু দায়ী করা হবে, তা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তা না হলে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে বিরোধ এবং প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছে সংগঠনটি।
একই পরিবারের সদস্যদের ডিলারশিপেও স্পষ্টতা চায় বিএফএ
নীতিমালার ৩.১১ ধারায় একই পরিবারের এক সদস্য ডিলার বা সার বিক্রয় প্রতিনিধি হলে অন্য সদস্যের ডিলারশিপ বা বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে আবেদন ও নিয়োগের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিএফএ। সংগঠনটির মতে, পরিবারের সদস্যদের পৃথক আইনগত ও অর্থনৈতিক সত্তা, স্বতন্ত্র ব্যবসা, বিনিয়োগ, আর্থিক সক্ষমতা ও যোগ্যতা থাকলে শুধু পারিবারিক সম্পর্কের কারণে একজনকে অযোগ্য ঘোষণা করা কতটা যৌক্তিক, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একইসাথে ‘পরিবার’ বলতে কাদের বোঝানো হবে, সেটিও নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে তারা।
ডিলারের সংখ্যা নিয়ে নীতিমালা-পরিপত্রে অসামঞ্জস্য
নীতিমালার ৭.২ ধারায় প্রতিটি ডিলার ইউনিটের বিপরীতে যোগ্যতম একজন ডিলার নির্বাচনের বিধান রয়েছে। অন্যদিকে ২৭ আগস্টের পরিপত্রে বিদ্যমান ডিলারের পাশাপাশি নতুন ডিলার নিয়োগের কথা বলা হয়েছে।
এ দুই বিধানের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই দাবি করে বিএফএ জানতে চেয়েছে, শেষ পর্যন্ত একটি ইউনিয়নে মোট কতজন ডিলার সার বিতরণ করবেন। বিদ্যমান বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারদের সংখ্যা কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা চেয়েছে সংগঠনটি।
কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের কমিটিতে বিএফএ চায় প্রতিনিধিত্ব
সার ডিলার ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় কমিটি এবং জেলা ও উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিতে বিএফএর প্রতিনিধিত্ব রাখার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিএফএর দাবি, দেশের সার ব্যবসায়ী ও ডিলারদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হিসেবে নীতিমালা বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে তাদের প্রতিনিধি থাকা উচিত। একইভাবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মনিটরিং কমিটিতেও আগের মতো বিএফএর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
‘জরুরি প্রয়োজন’ হলেও হঠাৎ পরিবর্তনে অস্থিরতার আশঙ্কা
গত ২৭ আগস্টের পরিপত্রে স্বল্প সময়ের মধ্যে আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও নতুন ডিলার নিয়োগের যে প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিএফএ। সংগঠনটির বক্তব্য, ডিলারের সংখ্যা, বিদ্যমান ডিলারের সংজ্ঞা এবং বিসিআইসি-বিএডিসি ডিলারদের অবস্থানসহ মৌলিক বিষয়গুলো স্পষ্ট না করেই নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নিলে পরে প্রশাসনিক ও বাস্তব জটিলতা তৈরি হতে পারে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে সার সরবরাহ ও বিতরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিঘ্নের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সার সংকট, চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতি, সার পেতে কৃষকদের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এ অবস্থায় দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সার বিতরণ নেটওয়ার্কে আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় আরো অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছে বিএফএ।



