বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় বেগম খালেদা জিয়ার অবদান স্মরণ করে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে দেশের ব্যবসায়ী মহল।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলে দেশের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়াকে ‘পথিকৃৎ নেতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন তারা।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশসহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়। এ আয়োজনে অংশ নেয়- ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই), ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই), চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই), ফরেন ইনভেস্টরস’ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই), বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি), বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)।
এছাড়া রয়েছে- বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ), লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলএফএমইএবি), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি), বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ), বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ) এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ড. আবদুল মঈন খান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
মির্জা ফখরুল বেগম খালেদা জিয়াকে জাতির অবিসংবাদিত ও আপসহীন নেত্রী হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘বেগম জিয়া গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তার জীবন উৎসর্গ করেছেন।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী মুহূর্তগুলো স্মরণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও খালেদা জিয়া জাতির জন্য আশার বার্তা দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘তার (খালেদা জিয়া) নির্দেশনা ছিল স্পষ্ট- প্রতিশোধ বা বিদ্বেষ নয়, নতুন বাংলাদেশকে ঐক্য ও ভালোবাসার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। এই বার্তাটি ওই সময়ে দেশকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’
মির্জা ফখরুল জনগণকে শোককে শক্তিতে রূপান্তর করা, অব্যাহত ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আলোকে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমাদের ফের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। গণতান্ত্রিক ভবিষ্যত নিশ্চিতে বেগম খালেদার স্বপ্ন পূরণ করাই তার স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শনের একমাত্র উপায়।’
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশের আধুনিক অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক কাঠামো গঠনে বেগম জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা তুলে ধরেন।
তিনি সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে গণতন্ত্রের ‘মশালবাহক’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি জনগণের মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য জিয়াউর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গিকে এগিয়ে নিয়েছিলেন।
আমীর খসরু আরো উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি কৌশলের ওপর। এটি জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন এবং খালেদা জিয়া দৃঢ়ভাবে তা অব্যাহত রেখেছিলেন।’
সভায় আইসিসিবি সভাপতি মাহবুবুর রহমান স্বাগত বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তার প্রধানমন্ত্রীত্বকাল (১৯৯১-১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬) নারীর নেতৃত্বের প্রতিবন্ধকতা ভাঙা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার জন্য উল্লেখযোগ্য।’
বেগম জিয়ার শাসনামলে দারিদ্র্য হ্রাস ও মানব উন্নয়নে মনোনিবেশের বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। আইসিসিবি সভাপতি জানান, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। এর মধ্যে অন্যতম হল ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঐতিহাসিক কাফকো সার প্রকল্প। এই প্রকল্পে জাপান, ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ডসের মতো আন্তর্জাতিক অংশীদাররা যুক্ত ছিলেন।
বেগম জিয়ার কারান্তরীণ থাকা ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য জটিলতাসহ তার ত্যাগ ও সংগ্রামের কথাও তুলে ধরেন মাহবুবুর রহমান। তিনি আরো বলেন, ‘এই চ্যালেঞ্জগুলো সত্ত্বেও তিনি জনসেবার সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।’
দেশের সমৃদ্ধির প্রতি নিজের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে খালেদা জিয়ার বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে আইসিসিবি সভাপতিও বলেন, ‘বাংলাদেশের বাইরে তার কোনো ঘর নেই।’
এফবিসিসিআইর প্রশাসক আবদুর রহিম খান বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারকে সম্মান জানান।
তিনি বলেন, ‘মরহুম নেত্রী জাতির বৃহত্তর স্বার্থ ও গণতন্ত্রের জন্য সব শ্রেণি-পেশাকে একবিন্দুতে নিয়ে এসেছিলেন, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাকে অনুপ্রাণিত করেছিল।’
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া দায়িত্ব গ্রহণের সময় অর্থনীতি স্থবির ছিল এবং অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে তিনি অসাধারণ দূরদর্শিতার মাধ্যমে উন্মুক্ত বাজারনীতি, বেসরকারি খাত-নির্ভর উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তাবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছিলেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘বেগম জিয়া ভ্যাট আইন প্রণয়ন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন এবং বেসরকারিকরণ বোর্ড ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন প্রতিষ্ঠাসহ ঐতিহাসিক সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাত এবং পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করেছিলেন।’
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি. রহমান, বিএবি সভাপতি আবদুল হাই সরকার, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিসিআই সভাপতি আনোয়ারুউল আলম চৌধুরী (পারভেজ), বিআইএ সভাপতি সাঈদ আহমেদ, বিজিএমইএ সভাপতি ইনামুল হক খান, বিএসআইএ সভাপতি এম এ জব্বার ও বিসিএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।
সূত্র : বাসস



